3:05 pm , October 19, 2022
গাছ কাটা নিয়ে বরিশাল সওজ ও বন বিভাগের বিরোধ
হেলাল উদ্দিন ॥ বরিশাল সড়ক ও জনপথ বিভাগে কার্য সহকারী পদে কর্মরত তিনি। দাপ্তরিক নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কর্মস্থলে রাস্তার পাশে সড়ক বিভাগের মালিকানাধীন কিছু গাছ দেখভাল ও রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্ব অর্পিত হয় তার উপর। অফিসের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সেই দায়িত্ব নিয়মিত পালন করে আসছিলেন কার্য সহকারী আবুল হোসেন হাওলাদার। কিন্তু কে জানত এই দায়িত্ব পালনই তার জীবন কে দুর্বিষহ করে তুলবে। তার প্রহরায় থাকা গাছ কেটে ফেলায় বন বিভাগের দায়ের করা মামলায় ১ নং আসামী হতে হয়েছে এই সরকারি এই কর্মচারীকে। দীর্ঘ ৪ বছর মামলার ঘানি টানার পর আদালতের রায়ে নির্দোষ প্রমানিত হন তিনি। কিন্তু এই ৪ টি বছরের প্রতিটি দিন তাকে কাটাতে হয়েছে অসহ্য মানসিক যন্ত্রনা নিয়ে। অপমান আর সামাজিক লজ্জাবোধ সব সময় তাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। কারন মামলায় অভিযোগে বলা হয়েছিলো ‘বন বিভাগের গাছ চুরি করে পাচারের চেষ্টা করেছিলেন তিনি। যে কারনে ৪ টি বছর নিজেকে অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালে রেখেছিলেন । অথচ ঘটনার সময় সড়ক বিভাগের পক্ষ থেকে বন বিভাগকে বার বার অনুরোধ করা হয়েছিলো গাছের মালিকানা দাবীর পক্ষে উপযুক্ত প্রমানাদী উপস্থাপন করার জন্য। কিন্তু অনেকটা স্বেচ্ছাচারিতার আশ্রয় নিয়ে ওই কার্য সহকারীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করে দেয় বন বিভাগ। ২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারী বরিশাল সামাজিক বন বিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্দেশে ঝালকাঠি চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি দায়ের করা হয়। বন বিভাগের সৃজিত বাগান থেকে অবৈধ ভাবে গাছ চুরি করিয়া পাচারের চেষ্টা করার অভিযোগে করা মামলার বাদী হয় ঝালকাঠির সহকারী বন কর্মকর্তা জিয়াউল ইসলাম।
দীর্ঘ ৪ বছর মামলা চালিয়েও জিয়াউল ইসলাম আদালতে প্রমান করতে পারেনি কর্তনকৃত গাছ তাদের ছিলো। অথচ শতভাগ নিশ্চিত হয়েও নিয়মনীতি অনুসরন করে সড়ক বিভাগ যখন গাছ কর্তন প্রক্রিয়া শুরু করেছিলো তখন বন বিভাগের পক্ষে জিয়াউল ইসলাম বন বিভাগের দাবী করে সড়ক বিভাগকে রীতিমত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন এবং গাছ কর্তন বন্ধ করে দেন। সংশ্লিষ্টরা জানায়, ওই সময়ে উভয় দপ্তর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলে সুরাহা হয়ে যেত। মামলা করারও প্রয়োজন হত না। আর বিনা অপরাধে কার্যসহকারীর ৪ টি বছর মামলার ঘানি টানতে হতো না। তারা আরো বলেন, শুধুু মামলার ঘানি টানা বা আদালতে হাজিরা দেওয়াই না এই ৪ বছরে জীবনের সব কিছু বিসর্জন দিতে হয়েছে নিরাপরাধ মানুষটিকে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে গাছগুলো সড়ক বিভাগের নিশ্চিত হয়েও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করার জন্য প্রথম কৌশল হিসাবে গাছ কাটা বন্ধ করে দেন জিয়াউল ইসলাম। এই কাজে বন কর্মকর্তার পদবীটি তার শক্তি হিসাবে কাজ করেছে। সড়ক বিভাগের ওই কার্য সহকারী একজন ধার্মিক। বন কর্মকর্তা জিয়াউলের ধারনা ছিলো মামলাসহ ভয়ভীতি প্রদর্শন করলে খুব সহজে ওই কার্যসহকারীকে দমানো যাবে বা গাছগুলো নিতে তাকে বাধা প্রদান করবে না। কিন্তু কোন কিছুই দায়িত্বশীলতা থেকে পিছু হটাতে পারেনি আবুল হোসেনকে। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি মিটিয়ে ফেলার জন্য আবুল হোসেনের কাছে বড় অংকের টাকা দাবী করেছিলো জিয়াউল ইসলাম। কিন্তু এই প্রস্তাবেও রাজি না হওয়ায় উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে মামলা ঠুকে দেন জিয়াউল।
দাপ্তরিক সমর্থন পাবার জন্য কর্তনকৃত ওই গাছগুলো বন বিভাগের বলেই উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে শতভাগ নিশ্চয়তা দিতেন জিয়াউল। যে কারনে বন বিভাগ কর্তৃপক্ষ মামলা দায়েরের পক্ষে মত দেন এবং জিয়াউলকেই মামলা পরিচালনা ও তদারকি করার দায়িত্ব প্রদান করা করে। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে বিরোধপূর্ন বা কর্তনকৃত ওই গাছগুলো প্রকৃতপক্ষেই বন বিভাগের কিনা সে বিষয়টি মামলা দায়েরের পূর্বে আমলে নেয়নি বরিশাল বন বিভাগ কর্র্তৃপক্ষ। জানা গেছে জিয়াউল বাকপটু বয়ানে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিজ নিয়ন্ত্রনে রাখতেন। যার বড় প্রমান সরকারী চাকুরি করেও এক টানা ২৫ বছর ধরে ঝালকাঠি বন বিভাগেই কর্মরত আছেন তিনি। শুধু তাই নয়, এটাই তার নিজ জেলা এবং ঝালকাঠিতে ৫ তলা ভবন তৈরী করে বসবাস করছেন তিনি। স্থানীয়রা বলছেন বন বিভাগের ইতিহাসে এমন কর্মকর্তা দ্বিতীয়জন খুঁজে পাওয়া যাবে না যে এক স্থানেই চাকুরি করে জীবন পার করছেন।
বরিশাল সড়ক বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা ২০১৮ সালের ১০ জানুয়ারী স্বাক্ষরিত এক পত্রে তিনি উল্লেখ করেন ১৯৯৯ সালের ২৫ জুলাই সওজ অধিগ্রহনকৃত জমিতে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী সামাজিক বনায়নের জন্য অস্থায়ীভাবে ইজারা প্রদান করা হয়। অত্র দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তাদের সরেজমিন তদন্ত ও পর্যবেক্ষন পরবর্তী প্রতিবেদনের পর সরকারী কাজের স্বার্থে উক্ত গাছ কর্তন পূর্বক অপসারণ করার নির্দেশ প্রদান করা হয়।
এর দুইদিন আগে বরিশাল সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবরে সড়ক উপ বিভাগ-২ এর উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী দুলাল কুমার প্রামানিক এর প্রেরিত একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় ইজারাদার মোসাম্মৎ মোর্শেদা বেগম সড়ক এর জায়গায় ইজারা চুক্তির মাধ্যমে বৃক্ষ রোপন করেন। উক্ত স্থানে ঝালকাঠি জেলা পরিষদ কর্তৃক একটি জেলা সীমানা গেট ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি সম্বলিত একটি ভাষ্কর্য নির্মান কাজ চলছে। উক্ত কাজের মধ্যে রোপিত ২০ টি গাছ অপসারণ করা একান্ত প্রয়োজন। তিনি ওই পত্রে আরো উল্লেখ করেন উক্ত স্থানে বন বিভাগ কর্র্তৃক কোন গাছ রোপিত নাই। সরেজমিনে গিয়ে বিষয়টির প্রথম তদন্ত করা বরিশাল সওজের উপ সহকারী প্রকৌশলী মোঃ বেল্লাল হোসেন ২ জানুয়ারী বাস্তব চিত্র তুলে ধরে উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী দুলাল কুমার প্রামানিক বরাবরে একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রেরন করেন। তার প্রতিবেদনেও রোপিত গাছের সাথে বন বিভাগের কোন সম্পৃক্তা পাওয়া যায়নি। ওই একই মাসে বরিশাল সওজের উপ সহকারী প্রকৌশলী মোঃ বেল্লাল হোসেন স্বাক্ষরিত অপর একটি চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে সকল নিয়ম মেনে ইজারাদার উক্ত স্থান থেকে ৪০ হাজার টাকার গাছ বিক্রি করেন। বিক্রয়কৃত অর্থ সমান অর্থ্যাৎ ২০ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত ঝালকাঠি জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট প্রথম আদালত এর বিচারক এইচ এম ইমরানুর রহমান ৪ জনের সাক্ষির মধ্যে ৩ জনের সাক্ষ্য গ্রহন শেষে ২০২২ সালের ১০ এপ্রিল রায় ঘোষনা করেন। মামলায় আসামী পক্ষের আইনজীবী ছিলেন এ্যাড. ফয়সাল খান।
পুরো বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশাল সড়ক বিভাগের উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী লিটন আহমেদ খান বলেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কার্যসহকারী আবুল হোসেন হাওলাদার মামলার শিকার হয়েছেন এবং ৪ বছর অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে তাকে। যেহেতু মামলায় জিতেছি, এখন বন বিভাগের বিরুদ্ধে মানহানী ও হয়রানীর অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করবো।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঝালকাঠি জেলা সহকারী বন কর্মকর্তা জিয়াউল ইসলাম বলেন, মামলায় জয় পরাজয় হতে পারে পারে। তাই বলে জিতে গেলে বাদীকে দোষারোপ করতে হবে এটা ঠিক না। আমি নই বন বিভাগ মামলা পরিচালনা করেছে।
জানতে চাইলে সামাজিক বন বিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বর্তমানে চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপ বন সংরক্ষক আবুল কালাম বলেন, বন বিভাগের পক্ষে কোন কর্মকর্তা নয় সরকার মামলা পরিচালনা করে। মামলায় হেরে গিয়ে থাকলে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। আমার মনে হয় সেটা করা উচিৎ।
এ বিষয়ে বরিশাল সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জি এম রফিক আহমেদ এর ফোনে একাধিক বার কল করেও পাওয়া যায়নি। তবে বরিশাল উপকূলীয় বন অঞ্চলের বন সংরক্ষক মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ খান বলেন, মামলার বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না। তবে একজন বন কর্মকর্তা কিভাবে নিজ জেলায় ২৫ বছর একই কর্মস্থলে তাকে তা খতিয়ে দেখা হবে।
