2:56 pm , October 14, 2022
ইউএনও’র দাবী দুর্ঘটনা ॥ জেলা প্রশাসকের তদন্ত কমিটি গঠন
নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ বাবুগঞ্জে নির্দেশ অমান্য করায় মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানে ব্যবহৃত ট্রলার পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তবে বিষয়টি দুর্ঘটনা বলে দাবী করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত ফাতিমা। বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে বাবুগঞ্জ খেয়াঘাট এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। এদিকে ঘটনা তদন্তে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন জেলা প্রশাসক।
বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত ফাতিমা বলেন, আমরা আনোয়ারের ট্রলার ভাড়া করেছি, তার ট্রলার আমরা পুড়িয়ে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। অভিযানে জব্দ হওয়া কারেন্ট জাল পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছি, ট্রলার নয়।
ট্রলারটিতে আগুন লাগার বিষয়টি দুর্ঘটনা বলে দাবি করে ইউএনও বলেন, সেটি নেভানোর জন্য আমি চেষ্টা করেছি। ফায়ার সার্ভিস এসেছিলো, তারা আগুন ধরানো কারেন্ট জালে পানি দিচ্ছিলো, সে সময় তাদের বারন করেছি কারেন্ট জালে যাতে পানি দেয়া না হয়। কেননা সেটি জব্দের পর পোড়ানো হচ্ছিলো।
নুসরাত ফাতিমা বলেন, কারেন্ট জাল পোড়ানোর নির্দেশের বিষয়টি অন্যভাবে রিপ্রেজেন্ট করা হচ্ছে। আমি যে ট্রলার ভাড়া করেছি অর্থাৎ রাষ্ট্রপক্ষ যেটি ভাড়া করেছে, সেটি পুড়িয়ে ফেলে আমারও কোনো লাভ নেই, রাষ্ট্রেরও কোনো লাভ নেই। একটি মহল মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান বাধাগ্রস্ত করতে অপ-প্রচার করছে। যার ট্রলারটি পুড়ে গেছে সে গত ৫/৬দিন যাবৎ রাত দিন আমাদের সাথে কাজ করছে। ক্ষতিপূরণের জন্য তার পাশে দাঁড়াবো আমরা।
ট্রলারের মাঝি ও মালিক আনোয়ার হোসেন বলেন, আমার ট্রলার ভাড়া করে নিছিলেন ইউএনও ম্যাডাম আমারে ভালো না লাগলে ছাইড়া দেবে, আমার ট্রলার পোড়ানোর তো দরকার ছিলো না। আমি এখন পথে বইসা গেছি’।
আনোয়ার বলেন, গত ১৪ বছর ধরে বিভিন্ন অভিযানের সময় অভিযানিক দলের লোকজন পরিবহন করছি। বৃহস্পতিবার অভিযান শেষে তীরে ভীড়তে নিষেধ করার বিষয়টি জানানোর জন্য মৎস্য কর্মকর্তা ফোন করেছিলো। কিন্তু ইঞ্জিনের শব্দে ফোন কল শুনতে না পাওয়ায় কল রিসিভ করিনি। আমার ট্রলার ঘাটে ভেড়ার পর মৎস্য কর্মকর্তা ও ইউএনও এসে আমাকে একটি বাঁশ দিয়ে আঘাত করেন। তখন আমি ট্রলার থেকে চলে যাই। পরে ইউএনও আমার ট্রলারে আগুন দিয়েছে। ট্রলারটি ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মান করেছিলাম।
অভিযানে উপস্থিত থাকা বাবুগঞ্জ থানার উপ পরিদর্শক হান্নান মিয়া বলেন, ট্রলার কেন পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সেটা ইউএনও মহোদয় ভালো বলতে পারবেন। অভিযান শেষে ট্রলার নিয়ে আমরা বাবুগঞ্জ খেয়া ঘাটে আসি। এরপর ট্রলার থেকে জাল এনে পুড়িয়ে ফেলা হয়। তারপর জব্দ হওয়া মাছ নিয়ে উপরে উঠি। যখন জাল পোড়ানো হচ্ছিলো তখন ট্রলার মাঝি আনোয়ারকে ইউএনও মহোদয় জিজ্ঞাসা করেন ‘আনোয়ার তোমার ট্রলারে ছোট মাছ কেন, বড় মাছ কই’। তখন আনোয়ার বলছে ‘আমার ট্রলারে বড় মাছ পাওয়া যায়নি’। এরপর আনোয়ারের ট্রলারের ডালার নিচে একটা ভাঙা বৈঠা হাতে নেয় ইউএনও মহোদয়। পরে আনোয়ারকে ডাকাডাকি করেও আর পাওয়া যায়নি। জাল পোড়ানো শেষে উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউএনও মহোদয় উপরে উঠে এসে তিনটি এতিম খানায় জব্দকৃত ইলিশ বিতরণ করেন।
হান্নান বলেন, ইলিশ বিতরণ শেষে ইউএনও মহোদয়ের উপস্থিতিতে তার দুইজন আনসার সদস্য আনোয়ারের ট্রলারে ওঠে। ট্রলারে থাকা ডিজেল ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।
বাবুগঞ্জ থানার ওসি মাহবুবুর রহমান বলেন, আমি ছিলাম না। আমি শোনা কথা বলতে পারবো। পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকে যেটুকু জেনেছি তা হলো, অভিযানের পর আনোয়ারকে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করা হয়, তখন সে ভয়ে পালিয়ে যায়। পরে ইউএনও সাহেবের সাথে থাকা দেহরক্ষী আনসার সদস্যদের দিয়ে ডিজেলের মাধ্যমে ট্রলারটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। কি কারনে ট্রলারটিতে আগুন দেয়া হয়েছে সে বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলতে পারবেন।
উপজেলা চেয়ারম্যান কাজী ইমদাদুল হক দুলাল বলেন, একটি স্প্রীডবোট ও দুইটি ট্রলার নিয়ে অভিযান করেন তারা। অভিযান শেষে ফেরার সময় ইউএনও তার নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত ট্রলার তীরে ভেড়াতে নিষেধ করেন। কিন্তু ওই ট্রলার তীরে ভেড়ায়। এতে ইউএনও ক্ষুব্ধ হলে ট্রলার চালক পালিয়ে যায়। তিনি চলে আসার পর ঘটনা ঘটেছে জানিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান বলেন, অভিযানে যাওয়া এ ট্রলারটি তীরে ভেড়ার পর মাছ ও জাল সরিয়ে ফেলে। আজকেও সেই কাজ করেছে। এতে বদনাম হয়। তাই হয়তো ই্উএনও আরো বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছে। জেলা প্রশাক জসীম উদ্দীন হায়দার জানান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ৫ কার্য দিবসের মধ্যে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট শাহ মো. রফিকুল ইসলাম জানান, তাকে আহবায়ক করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি করা হয়েছে শুনেছেন। কিন্তু কোন চিঠি এখনও পাননি। তিনি আরো জানান, ঘটনার সময় অনেক লোক সেখানে ছিলো। যাদের সিংহভাগ জেলা পরিষদ নির্বাচনের ভোটার। আগামী ১৭ অক্টোবর ভোট। তাই এখনই তদন্ত শুরু করা যাচ্ছে না। ভোট শেষ হওয়ার পর ১৮ অক্টোবর থেকে কাজ শুরু করতে পারবো।
