3:05 pm , October 13, 2022
ইলিশ নিয়ে লুকোচুরি খেলা
নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ ঘড়ির কাটায় তখন রাত ১২টা। মিনি ট্রাক বোঝাই করে শায়েস্তাবাদ এলাকা থেকে প্রায় ৫শ কেজি ইলিশ নিয়ে বরিশাল নগরীতে ফিরছিলো একটি অসাধু চক্র। কিন্তু তালতলী ব্রীজ পার হওয়ার আগ মুহূর্তেই সাদা পোশাক পড়া কয়েক ব্যক্তি যারা নিজেদের ডিবি পুলিশের পরিচয় দেয়া ও সাংবাদিকদের পাল্লায় পড়ে ওই চক্র। শুরু হয় দেন দরবারের পালা। ঘুষের রেট শুরু হয় ৫ হাজার টাকা থেকে আর ঠেকে ৭০ হাজারে। মাছের পরিমানের পাশাপাশি ট্রাকে কতজন লোক রয়েছে সেই হিসেব করে নির্ধারণ হয় ঘুষ লেনদেনের বিষয়টি। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন ওই রাতে মিনি ট্রাকটিতে তিনজন ব্যবসায়ী ছিলেন। তাদের বাসা নগরীর আমানতগঞ্জ এলাকায়। তিনজনের কাছে ৯০ হাজার টাকা দাবী করা হলেও রফা হয় ৭০ হাজারে। স্থানীয়রা বলছেন শায়েস্তাবাদ এলাকায় প্রতিদিন রাত ১০টায় প্রকাশ্যেই বিক্রী করা হয় ইলিশ। এতে করে জেলেরা তেমন একটা সুবিধা না পেলেও অসাধু ব্যবসায়ীদের পোয়া বারো। এর পাশাপাশি পুলিশ ও সাংবাদিকদের নাম ভাঙ্গিয়ে লাভবান হচ্ছে তৃতীয় পক্ষ। আর মৎস্য অধিদপ্তরের লোকজন টাকা কামাচ্ছেন জাল বিক্রী করে। জেলেদের জাল আটক করে আবার তাদের কাছেই বিক্রী করা হচ্ছে দ্বিগুন দামে। যদিও মৎস্য দপ্তরের কর্মকর্তারা এ ধরণের অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন।
গেলো ১১ অক্টোবর বিকেলে শায়েস্তাবাদ এলাকায় গিয়ে দেখা মিললো জেলেদের ঘরে ঘরে তাজা ইলিশ। হবিনগর গ্রামের একটি জেলে পরিবারের ঘরে দিয়ে দেখা গেছে ক্রেতা এসে দাঁড়িয়ে আছেন ইলিশ নিতে। তাজা ইলিশ তখনো জালে আটকানো ছিলো। ৯শ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রী করা হয়েছে ৬শ টাকা কেজি দরে। এভাবে শুধু একজনই নয় অধিকাংশ জেলেরাই নদীতে মাছ শিকার করছেন কীর্তনখোলা ও আড়িয়াল খাঁ নদীতে। একজন জেলেকে দেখা গেলো জাল প্রস্তুত করতে। তিনি জাল সেলাই করার কাজে ব্যস্ত। হবিনগর খেয়াঘাটে গিয়ে মিললো মাছ ধরার দৃশ্য। বেশ কয়েকজন জেলে জাল টানছেন। স্থানীয় একজন জানালেন এখানে যারা ইলিশ ধরে তারা চর হবিনগর গিয়ে তা বিক্রী করেন। এপারে আসেন না। নদীর ওপারে ব্যবসায়ীরা আছেন তারা পাইকারী দরে কিনে নিয়ে যান।
স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, দিনে-রাতে দেদারছে ইলিশ ধরছেন জেলেরা। অপেক্ষাকৃত কম দামে এই তাজা ইলিশ জুটছেনা এলাকার লোকজনের কপালে। বরিশাল নগরীর প্রভাবশালী লোকজন গিয়ে মাছ পাইকারী ধরে কিনে নিচ্ছেন। শায়েস্তাবাদ বাজার থেকে রাতে শত শত কেজি ইলিশ কিনে আনছেন বরিশালের আড়ৎদাররা। পিকআপে করে ওই মাছ প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় নগরীর পলাশপুর এলাকায়। সেখান থেকে হয় ভাগ ভাটোয়ারা।
বরিশাল মৎস্য অধিদপ্তরের যোগসাজশেই অসাধু চক্র নিষিদ্ধকালীন সময়ে ইলিশ মজুদ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মৎস্য অফিসের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সরাসরি এর সাথে জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয় জেলেদের কাছ থেকে জাল আটক করে তা আবার জেলেদের কাছেই বিক্রী করে মোটা অংকের টাকা আয় করছে মৎস্য দপ্তরের লোকজন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জেলে জানান, ১২ অক্টোবর রাতে এক জেলেকে জালসহ আটক করে মৎস্য অফিসের লোকজন। ওই জেলের বাড়ী শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের চুরামন গ্রামে। আটককৃত জাল ওই জেলের কাছেই আবার ৩০ হাজার টাকায় বিক্রী করা হয়। জেলেদের দাবী যে জাল আটক করা হয়েছিলো তার বাজার মূল্য ১৫ হাজার টাকার মত। অথচ গরীব এই জেলের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে দ্বিগুন।
জেলেরা বলছেন জালে এখন ধরা পরছে ঝাকে ঝাকে ইলিশ। কোনভাবে একটা টান দিতে পারলেই হাজার হাজার টাকার মিলছে রুপালী ইলিশ। অধিকাংশ ইলিশের কেজি ৯শ গ্রাম থেকে দেড় কেজির কাছাকাছি। ইলিশের পাশাপাশি প্রচুর পাঙাস মাছও উঠে আসছে জালে। বুধবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে অনেক জেলেই ইলিশের সাথে বড় বড় পাঙাস পেয়েছেন জালে। ৭ থেকে ১০ কেজি ওজনের পাঙাস বিক্রী হচ্ছে ৬শ টাকা কেজি দরে। একজন জেলে সাড়ে ৭ কেজি ওজনের একটি পাঙাস জিইয়ে রেখেছেন পানিতে। সন্ধ্যার পরে বাজারে তোলার কথা জানালেন তিনি।
