3:34 pm , October 4, 2022
এমএম আমজাদ হোসাইন ॥ অবশেষে বন্ধ হয়ে গেল বরিশাল-ঢাকা, বরিশাল-খুলনা রকেট স্টীমার সার্ভিস। পরিসমাপ্তি ঘটল প্রায় দেড়শ বছরের ইতিহাসের। বরিশাল খুলনা স্টীমার সার্ভিস শুরু হয়েছিল ১৮৮৪ সালে। সে হিসেবে সময়কাল ১৩৯ বছরের হলেও এর পেছনে রয়েছে আরো ইতিহাস যার সূচনা কাল ১৮২৯ সাল।
ব্রিটিশ সরকার ১৮২৯ সালে মেরিন বোর্ডের অস্থায়ী নিয়ন্ত্রক জন স্টোনকে এ অঞ্চলের নদীগুলোর উপযোগী স্টীমার নির্মানের তাগিদ দেয়। এর ১৫ বছর পর অর্থাৎ ১৮৪৪ সালে ব্রিটিশ মালিকানাধীন দি ইন্ডিয়ান জেনারেল স্টিম নেভিগেশন কোম্পানী (আই জি এস এন) বরিশালে অঞ্চলে জরিপ শুরু করে। তারপরও চলে যায় আরো ৩০ বছর। ১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রিভার স্টিম নেভিগেশন বা আর এসএন কোম্পানী। ঐ কোম্পানী বিভিন্ন নৌ রুট পর্যালোচনা করে এবং ১৮৮৪ সালে ফ্লোটিলা কোম্পানী বরিশাল-খুলনা রুটে স্টীমার চালনা শুরু করে। প্রসঙ্গত: ১৮৮৪ সালেই আবার খুলনা-কোলকাতা রেল চলাচলের জন্য খুলনার রেলস্টেশন স্থাপিত হয়। সে সূত্রেই রেল চলাচলের জন্য খুলনায় রেলস্টেশন স্থাপিত হয়। সে সূত্রেই মালামাল পরিবহন ও যাত্রী চলাচলের সুবিধার্থে ফ্লোটিলা কোম্পানী কম-বেশি ১৪ খানা স্টীমার নদীপথে নিয়ে আসে। ঐ স্টীমারগুলোর মধ্যে রয়েছে গাড়ো, ফ্লোরিকান, ফ্লামিঙ্গো, মোহামেন্ড, বার্মা, মাজবি, শেরপা, পাঠান, ইরানি, সিল, লালি, সান্দ্রা, মেকলা এবং লেপচা নামের স্টীমার গুলো।
ফ্লোটিলা কোম্পানী’র জাহাজ ব্যবসা লাভজনক হওয়ায় লাখুটিয়ার জমিদারের এক আত্মীয় (কোতকাতা নিবাসী) ৪ খানা স্টীমার দিয়ে ব্যবসার নামে। তার জাহাজ গুলোর নাম ছিল, ভারত, লর্ড রিপন, বঙ্গ লক্ষ্মী এবং স্বদেশী। একই সময় বাটাজোর নামের একখানা স্টীমার দিয়ে জাহাজ ব্যবসায় যুক্ত হন ব্রজমোহন দত্ত। তবে ফ্লোটিলার সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ঐ ৫ খানা স্টীমারই ফ্লোটিলা কোম্পানীর কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়।
১৮৯৬ সালে ফ্লোটিলা কোম্পানী ইন্ডিয়ান জেনারেল নেভিগেশন (আই জি এন) এবং রিভার স্টিম নেভিগেশন (আর এস এন) এর যৌথ কোম্পানীর অধীনে চলে যায়। অর্থাৎ ফ্লোটিলা কোম্পানীর পরিসম্পাপ্তি ঘটে।
আর এস এন নামের যৌথ কোম্পানী বরিশালে একটি স্টীমার কারখানা নির্মান করে। একই বছর অর্থাৎ ১৮৯৬ সালে আই জি এন কোম্পানী স্টীমার পরিচালনার সুবিধার্থে বরিশালে পূর্ববাংলার সদর দপ্তর স্থাপন করে। হীম নীড় নামের ঐ সদর দপ্তরে জেনারেল ম্যানেজারের বাসভবন ছিল। ব্রিটিশ পরিদর্শক দল এসেও ঐ হীম নীড়ে অবস্থান করে বলে জানা যায়।
দেশ বিভাগের পর ১৯৪৭ সালে হীম নীড়ের মালিকানা চলে যায় পি আর এস এর হাতে। সে মালিকানা আবার ১৯৫৮ সালে চলে যায় ইপি আই ডব্লিউ টি এ’র হাতে। ১৯৭১ সালে এর মালিকানা পায় বি আই ডব্লিউ টি এ। ১৯৮৪ সালে হীম নীড় বি আই ডব্লিউ টি এ’র সদর দপ্তর করা হলেও তা বেশিদিন স্থায়ী ছিলনা যা ভিন্ন প্রসঙ্গ।
বরিশাল – ঢাকা, বরিশাল-খুলনা এবং এর মধ্যবর্তী চাঁদপুর ঝালকাঠী, কাউখালী, হুলারহাট (পিরোজপুর), বাগেরহাট, মংলা, খুলনা রুটে স্টীমার সার্ভিস জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় কোতকাতা রিচগার্ডেন শিপ ইয়ার্ডে নির্মিত হয় নতুন হুইল প্যাডেল স্টীমার পিএস গাজী ১৯২৯, পিএস অস্ট্রিচ ১৯২৯, পিএস মাসুদ ১৯২৯ এ তিনটি স্টিমারের বয়স এখন ৯৩ বছর। ১৯৩৮ সালে নির্মিত হয় পিএস লেপচা (৮৪ বছর), ১৯৫০ সালে পিএস টার্ন (৭২ বছর) এবং ১৯৫১ সালে পি এস শেলা (৭১ বছর)। তবে আধুনিক এ স্টীমারের সাথে লেপচা, মেকলা, লালি এবং সান্দ্রাও চলাচল করত যা ক্রমান্বয়ে বন্ধ হয়ে যায়।
এদিকে ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় থেকে খুলনা-কোলকাতা স্টীমার চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
রকেট স্টীমারগুলো ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত স্টিম ইঞ্জিনে চলত। কয়লা তোলা হতো নারায়নগঞ্জের নিতাইগঞ্জ থেকে। আমরা মনে করি ঐতিহ্যবাহী স্টীমারগুলো ইতিহাসের সাঙ্গী হিসেবে হলেও সংরক্ষন করা জরুরী। এটা এমন হতে পারে যে বরিশাল সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন বন্দরে এগুলোকে ভাসমান রেস্টুরেন্ট হিসেবে ব্যক্তি মালিকানায় ছেড়ে দেয়া যেতে পারে। বিআইডব্লিউ টি.সি কর্তৃপক্ষ প্রস্তাবটা ভেবে দেখবেন আশা করি।
