3:12 pm , September 27, 2022
বরিশাল-চট্টগ্রাম রুট
বিশেষ প্রতিবেদক ॥ বরিশালÑচট্টগ্রাম রুটে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন নির্বিঘœ এবং নিরাপদ করার লক্ষ্যে গত দুই দশকে সরকারের কাছ থেকে শত কোটি টাকায় ৩টি নৌযান সংগ্রহ ও ২টির পুনর্বাসনের পরেও গত ১১ বছরের বেশী সময় ধরে দেশের উপকূলীয় দুটি বিভাগীয় সদরের মধ্যে নিরাপদ যাত্রী পরিবহন সচল করতে পারেনি বিআইডব্লিউটিসি। এমনকি গত দুই দশকে বরিশালÑচট্টগ্রাম রুটের কথা বলেই নৌযান সংগ্রহ ও পুনর্বাসনে দফায় দফায় সরকারের কাছ থেকে শত কোটি টাকা গ্রহণ করলেও রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি এ রুটে নিরাপদ নৌ-যোগাযোগ নিশ্চিত করণে খুব আগ্রহী নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বরিশাল থেকে ভোলাÑহাতিয়াÑসন্দ্বীপ হয়ে চট্টগ্রামের নিরাপদ নৌ যোগাযোগের ভবিষ্যত এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। উপরন্তু অতি সম্প্রতি ঢাকাÑচাঁদপুরÑবরিশাল রুটে রকেট স্টিমার সার্ভিসটিও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চল থেকে ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম পৌঁছতে ২৪ ঘন্টারও বেশী সময় লাগছে। ফলে চরম দুর্ভোগে দক্ষিণাঞ্চল থেকে চট্টগ্রামগামী সাধারন যাত্রীরা।
সর্বশেষ প্রায় ৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বরিশালÑভোলাÑহাতিয়াÑসন্দ্বীপÑচট্টগ্রাম রুটের জন্য ‘এমভি তাজউদ্দিন আহমদ’ ও ‘এমভি আইভি রহমান’ নামের দুটি উপকূলীয় যাত্রীবাহী নৌযান সংগ্রহের পরে গত বছর ২ ডিসেম্বর পরীক্ষামূলক পরিচালন সম্পন্ন হলেও নানামুখী প্রতিবন্ধকতার কথা বলে এর বানিজ্যিক পরিচালন গত ১০ মাসেও শুরু হয়নি। তবে নৌযান দুটি বরিশালÑচট্টগ্রামের পরিবর্তে চট্টগ্রামÑহাতিয়া এবং কুমিড়াÑগুপ্তছড়া রুটে চলছে।
অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সরকারী অনুদানে গত বছর মার্চে বরিশালÑচট্টগ্রাম রুটের জন্য প্রায় ৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘এমভি তাজউদ্দিন আহমদ’ ও ‘এমভি আইভি রহমান’ নামে দুটি নুতন নৌযান সংগ্রহ করে বিআইডব্লিউটিসি। এসব নৌযান ২০১৭ সালের জুন ও আগষ্ট মাসে সরবরাহের কথা থাকলেও তা ২০২১ সালের এপ্রিলে সংস্থাটি গ্রহণ করে। নৌযান দুটি সংগ্রহের মাত্র ৯ মাস পরে গত বছর ২ ডিসেম্বর বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তাদের নিয়ে এ রুটে পরীক্ষামূলকভাবে একটি নৌযান পরিচালন করলেও বানিজ্যিক পরিচালনের বিষয়ে আর কোন অগ্রগতি হয়নি। ফলে বরিশালÑচট্টগ্রাম নৌপথে নৌযোগাযোগ আর পুনরায় প্রতিষ্ঠা হয়নি।
এমনকি বরিশালÑচট্টগ্রাম রুটের কথা বলেই গত দুই দশকে চীনা সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটে প্রায় ৩৩ কোটি টাকায় ‘এমভি বার আউলিয়া’ নামের একটি নতুন নৌযান সংগ্রহ ছাড়াও সরকারী ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘এমভি আবদুল মতিন ও এমভি মনিরুল হক’ নামের দুটি পুরনো নৌযান পুনর্বাসন করা হয় ২০০৯ সালে। এমনকি ‘এমভি বার আউলিয়া’ সংগ্রহের পরে গত ২০ বছরে তার পুনর্বাসন ও নতুন ইঞ্জিন সংযোজনে আরো প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এসব কিছুর বাইরেও বিশ^ ব্যাংকের সুপারিশে দেশের উপকূলভাগে নিরাপদ যাত্রী পরিবহনকে সরকার ‘গণ দায়বদ্ধ সেবাখাত’ হিসেবে ঘোষনা করে প্রতি বছর বিআইডব্লিউটিসি’কে নগদ ভর্তুকিও প্রদান করছে।
কিন্তু এতসব কিছুর পরেও দেশের উপকূলীয় দুটি বিভাগীয় সদরের মধ্যে নিরাপদ নৌ যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ ২০১১ সালের মে মাস থেকে। গত বছর ২ ডিসেম্বর বরিশালÑচট্টগ্রাম নৌপথে ‘এমভি তাজউদ্দিন আহদমদ’কে নিয়ে পরীক্ষামূলক পরিচালনের পরে বিআইডব্লিউটিসি’র তরফ থেকে বরিশালÑচট্ট্গ্রাম নৌ-পথের ‘বামনীর নালা’ ও ‘সেলিম বাজার টেক’ এলাকায় নাব্যতা উন্নয়নের অনুরোধ জানানো হয়। এর প্রেক্ষিতে বিআইডব্লিউটিএ ইতিমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ওই এলাকায় ড্রেজিং সম্পন্ন করে পুরো নৌপথটিকে ১৫ ফুট গভীরতার নৌযান চলাচলের উপযোগী করেছে বলে বিআইডিব্লিউটিএ’র চট্টগ্রাম জোনের পরিচালন পরিদপ্তরের উপ-পরিচালক জানিয়েছেন।
তবে বিষয়টি নিয়ে বিআইডব্লিউটিসি’র পরিচালক (বানিজ্য) আশিকুজ্জামানের সাথে আলাপ করা হলে তিনি জানান, বরিশালÑচট্টগ্রাম নৌপথের ভাষানচরের কাছে ‘বামনীর নালা’ ও তার উজানে ‘সেলিম বাজার টেক’ এলাকায় নাব্যতা সংকট রয়েছে। ফলে উপকূলীয় নৌযানগুলো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা অতিক্রম করে বরিশাল বা চট্টগ্রামে পৌঁছতে পারবে না বিধায় এ রুটে নৌযান চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
কিন্তু বিআইডব্লিউটিসি’র এসব বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষন করেছেন বিআইডব্লিউটিএ’র দায়িত্বশীল মহল। তাদের মতে চট্টগ্রাম থেকে হাতিয়া হয়ে ভোলার ইলিশা ঘাট পর্যন্ত কোথাও নাব্যতা সংকট নেই।
অপর একটি সূত্রের মতে, গত বছর সংগ্রহ করা বিআইডব্লিউটিসি’র ‘এমভি তাজউদ্দিন আহমদ ও এমভি আইভি রহমান’ নৌযান দুটির গতি ১০ নটেরও নিচে। অথচ ইলিশা ঘাট থেকে হাতিয়া হয়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা পর্যন্ত ভাটার সময় নদীর প্রবাহের গতি প্রায় ৭Ñ৮ নট। ফলে এসব নৌযান বরিশাল থেকে চট্টগ্রামে পৌঁছতে ১৮Ñ২০ ঘন্টাও সময় লাগবে বলে মনে করছেন কারিগরি বিশেষজ্ঞগন। গত ২ ডিসেম্বর পরীক্ষামূলক পরিচালনে এমভি তাজউদ্দিন আহমদ ১৯ ঘন্টায় গন্তব্যে পৌঁছে।
