‘পর্যটন শিল্পের কল্যাণে একটি দেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যায়’ ‘পর্যটন শিল্পের কল্যাণে একটি দেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যায়’ - ajkerparibartan.com
‘পর্যটন শিল্পের কল্যাণে একটি দেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যায়’

3:40 pm , September 26, 2022

আজ বিশ্ব পর্যটন দিবস

কাজী মিজানুর রহমান ॥ আজ বিশ্ব পর্যটন দিবস।
জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থার (ইউএনডব্লিউটিও) উদ্যোগে ১৯৮০ সাল থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর দিবসটি পালন করা হয়।
পর্যটনের ভূমিকা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উপযোগিতাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়াই এ দিবসের লক্ষ্য। আমাদের দেশেও দিবসটি পালন করা হয়।
বাংলাদেশে পরিচিত অপরিচিত অনেক পর্যটন
-আকর্ষনীয় স্থান আছে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যুগে যুগে ভ্রমণকারীরা মুগ্ধ হয়েছেন। এর মধ্যে প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন,ঐতিহাসিক মসজিদ এবং মিনার,পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত, পাহাড়, অরণ্য,বিস্তীর্ণ হাওর, চা বাগানসহ ইত্যাদি অন্যতম।
২৫ জুন ‘২২ পদ্মা সেতুর দ্বার উন্মোচনের পর দেশের দক্ষিনাঞ্চলের সমুদ্র কন্যা কুয়াকাটায় পর্যটকের ভীড় বাড়ছে। অনেকেই পর্যটন শিল্পের ভবিষ্যত নিয়ে আশাবাদী হয়ে উঠছেন। আমরাও আশাবাদী হতে চাই কিন্তু পরিকল্পনার অভাব এবং গাঁ ছাড়া ভাব ক্রমশই আমাদের পিছু টানছে। পর্যটনকে এগিয়ে নিতে হলে সরকারি এবং বেসরকারি ট্যুর অপারেটরদের সমন্বিতভাবে ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। তবে সবাই একমত হবেন যে, বরিশালের বর্তমান অবস্থা বেশ হতাশাজনক। কুয়াকাটার বাইরে বিচ্ছিন্ন কিছু মৌসুমি প্রচেষ্টা পর্যটনকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখতে পারছেনা।
পর্যটনকে জনপ্রিয়,আকর্ষণীয় করতে হলে প্রথমেই এগিয়ে আসতে হবে সরকারী সংস্থা পর্যটন কর্পোরেশনকে। আগাগোড়াই পর্যটন কর্পোরেশনকে বরিশালের প্রতি নিঃস্পৃহ মনে হয়েছে। নেই কোন মোটেল,কটেজ,যানবাহন এমনকি একটি অফিস।বিভাগীয় শহরে একটি পাঁচতারা মানের হোটেলের অভাবে বরিশালে আন্তর্জাতিক কোন খেলা আয়োজন করা যাচ্ছে না। নির্মল আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দক্ষিনাঞ্চলের মানুষ।
পর্যটন শিল্পের কল্যাণে একটি দেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যায়।
দক্ষিণাঞ্চলে একটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন শিল্প এলাকার চাহিদায়, থাকা উচিৎ বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জাদুঘর,পাঁচ তারকা হোটেল, থিম পার্ক, আন্তর্জাতিক মানের পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, ইন্টারন্যাশনাল
এক্সপো সেন্টার, রিসার্চ ইনস্টিটিউট,
স্টাফ রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া, এগ্রো ট্যুরিজম, গ্রিন
এনার্জি,সাফারিপার্ক,পর্যটন ডিপ্লোমা কোর্স স্কুলসহ অন্যান্য সুবিধাসমূহ।
এতে পর্যটন কেন্দ্রে প্রতিদিন লক্ষাধিক ভ্রমণপিয়াসী মানুষের ভ্রমণের ব্যবস্থা হতে পারে, হতে পারে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান ।
সময়োপযোগী ও পরিকল্পনামাফিক পদক্ষেপ গ্রহনের মাধ্যমে এসব পর্যটন স্পট যদি
পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা যায়, তাহলে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে নবদিগন্তের সূচনা হবে।
দেশের দক্ষিণাঞ্চলের এই বরিশাল বিভাগ সরকারের পরিকল্পনায় কতটুকু আছে সেদিকে মনোযোগ দেয়ার সময় এসেছে। বরিশাল এবং কুয়াকাটার মাস্টার প্লান এবং উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনে অনেক বিলম্ব হয়ে যাচ্ছে।
বরিশাল বিভাগ মূলত – ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, পিরোজপুর , বরগুনা ও ভোলা জেলা নিয়ে গঠিত এবং প্রতিটি জেলাতেই রয়েছে নদী, অনেক দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থান।
আমাদের বিভাগেই আছে শের-ই- বাংলা স্মৃতি জাদুঘর,চারণ কবি মুকুন্দ দাস কালী মন্দির,জীবনানন্দ দাশের বাড়ি,দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরের বাড়ি,আছে গৈলা মনসা মন্দির,লাকুটিয়া জমিদারবাড়ি,দূর্গাসাগর, গজনী দিঘি, ব্রাহ্মসমাজ প্রার্থনালয় ,গুঠিয়া মসজিদসহ আরো অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন।ঝালকাঠিতে আছে কীর্তিপাশা জমিদার বাড়ি,সুজাবাদ কেল্লা।পটুয়াখালীতে আছে পানি জাদুঘর,পায়রা সমুদ্রবন্দর,মজিদবাড়িয়া মসজিদ,সোনার চর,কুয়াকাটার মতো দর্শনীয় স্থান।দ্বীপের রানী ভোলায় আছে দেশের সব থেকে বড় ওয়াচ টাওয়ার,চর কুকরিমুকরি,মনপুরা দ্বীপ। বরগুনায় আছে লালদিয়ার বন ও সমুদ্র সৈকত,হরিণঘাটা বনাঞ্চল ও পর্যটন কেন্দ্রসহ আরো অনেক নাম প্রচারিত না হওয়া দর্শনীয় স্থান।
এসব স্থানে সহজ যোগাযোগ সুবিধা সৃষ্টি থেকে শুরু করে এসব স্থানের বিষয়ে পর্যটকদেরকে আকৃষ্ট করা এবং তাদের জন্য পর্যটন বান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলাটাই হবে বরিশালের জন্য প্রথম করনীয়।
এই বরিশালেই রয়েছে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি,মনসা মঙ্গল কাব্যের রচিয়তা বিজয় গুপ্তর বাসস্থান।
ভাষা আন্দোলনের স্মরণীয় গান আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো-এর রচয়িতা আব্দুল গাফফার চৌধুরী এবং প্রথম সুরকার আবদুল লতিফ ও বর্তমান সুরকার আলতাফ মাহমুদের জন্মও এই বরিশালেই।
অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের মতো ব্যক্তিত্বের জন্মও এই বিভাগেই।দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরও এই বিভাগেরই সন্তান।
বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর,বীরশ্রেষ্ঠ মোঃ মোস্তফা কামাল এই বিভাগেরই গর্ব।
রবীন্দ্র পরবর্তী বাংলা কবিতার প্রধান পুরুষ হয়ে উঠা জীবনানন্দ দাশ তার জীবনের অনেকটা সময় এই বরিশালেই কাটিয়েছেন।মার্কিন গবেষক ‘ক্লিন্টন বি সিলি’ ষাটের দশকে দুই বছর বরিশালে ছিলেন,দেশে ফিরে জীবনানন্দকে নিয়ে লেখেন আ পোয়েট এ্যাপার্ট!
বরিশালের জীবনানন্দ দাশের মতো আরো অনেক গুনি ব্যক্তিবর্গ নিয়ে শুধুমাত্র দেশ নয়, সারা পৃথিবীতেই বিস্তর আগ্রহ রয়েছে।উচ্চশিক্ষা বা গবেষণার বিষয়বস্তু হিসেবে তাদেরকে নিয়ে ইতিমধ্যে কার্যক্রম চলছে এবং আরো আগ্রহ তৈরি হয়েছে।বরিশালের এসব গুনি ব্যক্তিবর্গের ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণে বাংলাদেশ সমৃদ্ধ হতে পারে। পাশাপাশি পর্যটকদের বরিশালে আসতে উদ্বুদ্ধ করবে,ইতিহাস সম্বলিত জ্ঞান বিস্তৃত হবে।
বরিশাল নগরীর প্রবেশমুখে বরিশালের ইতিহাস ঐতিহ্যের প্রতীক ইলিশ, আমড়া, পেয়ারা, নারিকেলের ভাষ্কর্য তৈরি করা যেতে পারে। বরিশাল নগরীর সকল দর্শনীয় স্থানগুলো বিশেষত বঙ্গবন্ধু উদ্যান, ডিসি লেক,মুক্তিযোদ্ধা পার্কসহ বেলতলা থেকে কীর্তনখোলার তীর ধরে শহীদ আঃ রব সেরনিয়াবাত সেতু পর্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সংস্কার করে সাজাতে হবে। নগরীর বিলুপ্ত প্রায় খালগুলো সংস্কার এবং সৌন্দয্যমন্ডিত করে আকর্ষণীয় রুপ দেয়া সম্ভব।
তবে সব কিছু করতে হবে পরিবেশ এবং বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করে। মাথায় রাখতে হবে প্রাচ্যের ভেনিস বরিশালের অতীত ঐতিহ্য। ব্রিটিশ আমলে চালু হওয়া অধুনা বন্ধ শত বছরের ঐতিহ্যবাহী প্যাডেল ষ্টিমার নিয়েও বরিশাল কেন্দ্রিক কিছু চিন্তাভাবনা করার সুযোগ আছে।অন্যথায় ভাসমান ডক হারানোর ন্যায় দুঃখজনক অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। মহাসড়ক এবং জেলা-উপজেলা ভিত্তিক এলাকায় ওই নির্দিষ্ট এলাকার পর্যটনকেন্দ্র, ঐতিহাসিক স্থান সম্পর্কে প্রচার -প্রচারনা একজন পর্যটককে আকৃষ্ট করবে। একটি আকর্ষণীয়,মানসম্মত নান্দনিক বাস টার্মিনাল পর্যটক আকর্ষনের অন্যতম উপাদান হতে পারে।
বরিশাল বিভাগের যেসব স্থান যেমন,দেশী পেয়ারার বাগান, ভাসমান বাজার, লাল শাপলার বিল ইতিমধ্যে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছে সেসব স্থানে পর্যটকদের নিরাপত্তা, পরিবহন সুবিধা, হোটেল-মোটেল নির্মান,গাইড ব্যবস্থাসহ আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে এবং এ সবকিছু ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমেই করা সম্ভব। পর্যটন ক্ষেত্রে আধুনিক বিশ্বের ন্যায় উন্নত সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি করার পরিকল্পনা: এগিয়ে যাওয়া অর্থনীতির দেশ;বাংলাদেশের থাকা উচিৎ।
নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট বা এ্যাপ ব্যবহার করেই একটি অঞ্চলের পর্যটন কেন্দ্রের সাইট সিইং,
গাইডিং,ট্রান্সপোর্ট,হোটেল-মোটেলসহ সকল সুবিধা ভোগের সুযোগ নিশ্চিত করাও সম্ভব।
তবেই দেশি বিদেশি ভ্রমণকারীগণের আগমনে অপূর্ব সৌন্দয্যের আধার ধান-নদী-খাল এর বরিশাল বিভাগ পর্যটন শিল্পে ব্যাপক কর্মসংস্থানসহ দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে ভুমিকা রাখতে পারবে।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT