3:38 pm , September 26, 2022
বিশেষ প্রতিবেদক ॥ অনানুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষনা করা হলো ১৫০ বছরের পুরনো রকেট স্টিমার সার্ভিস। তৎকালীন বৃটিশ সরকার ১৮৭৪ সালে বাষ্পীয় প্যাডেল হুইল জাহাজের মাধ্যমে নারায়নগঞ্জÑচাঁদপুরÑবরিশালÑঝালকাঠীÑখুলনা নৌপথে রকেট স্টিমার চালু করেছিলো। এছাড়া ঢাকা থেকে একাধিক স্টেশন হয়ে বরিশাল পর্যন্ত একটি মেইল স্টিমার সার্ভিসও চলাচল করতো। স্বাধীনতার পরে উভয় স্টিমারই নারায়নগঞ্জের পরিবর্তে ঢাকা থেকে চলাচল শুরু করে। বিগত দেড়শ বছর ধরে বরিশাল ও পুরনো ঢকাবাসীর সকালে ঘুম ভাঙ্গতো রাষ্ট্রীয় যাত্রীবাহী নৌযানের হুইসালে। এমনকি ঢাকার বুড়িগঙ্গা তীরের নবাব বাড়ীর লোকজনের অতি প্রত্যুষে ঘুম ভাঙ্গার কারণে বৃটিশ যুগে বরিশাল থেকে বাদামতলী ঘাটে নোঙর করা যাত্রীবাহী স্টিমারগুলোর হুইসেল দেয়া নিষিদ্ধ ছিল। ষাটের দশক থেকে সেই অনিয়ম প্রত্যাহার হলেও এতদিন বরিশাল নগরবাসীর ঘুম ঠিকই ভেঙ্গে যেতো সরকারী এসব নৌযানের হুইসেলে।
করোনা মহামারী সংকটের আগেই রাষ্ট্রীয় নৌ বানিজ্য প্রতিষ্ঠান বিআইডব্লিউটিসি তার খরচ সাশ্রয়ী প্যাডেল জাহাজগুলো বসিয়ে রেখে তিনগুন পরিচালন খরচের নতুন দুটি স্ক্রÑহুইল যাত্রীবাহী নৌযান চালিয়ে লোকসানের বোঝা ভারী করতে থাকে। ২০১৪ ও ২০১৫ সালে সংগ্রহ করা ‘এমভি মধুমতি ও এমভি বাঙালী’ নামের এসব নৌযানের জ¦ালানী খরচ প্যাডেল জাহাজগুলোর আড়াইগুন বেশী। তার পরেও এসব নৌযান পরিচালনে সংস্থাটির এক শ্রেণীর কর্মকর্তাদের আগ্রহ বেশী লক্ষ্য করা গেছে। অথচ এসব নৌযান যেমনি যাত্রী বান্ধব নয়, তেমনি তা পরিচালন-এর চেয়ে বসিয়ে রাখলেই সংস্থাটির লোকসানের বোঝা হালকা হতো।
অপরদিকে সাশ্রয়ী খরচের ৪টি প্যাডেল জাহাজের মধ্যে পিএস অস্ট্রিচ’কে বিনা টেন্ডারে সাবেক নৌ পরিবহন মন্ত্রীর নির্দেশে দীর্ঘ মেয়াদী ইজারা প্রদান করা হয়েছে। অপর ৩টির মধ্যে ‘পিএস লেপচা ও পিএস টার্ণ’ দীর্ঘদিন ধরেই নিয়মিত মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষনের বাইরে। ‘পিএস মাহসুদ’ জাহাজটি প্রায় ২কোটি টাকা খরচে দীর্ঘদিন পরে মাঝারী ধরনের মেরামত সম্পন্ন করে এ বছরের শুরুতে যাত্রী পরিবহনে নিয়োজিত করেও তা প্রত্যাহার করা হয়। পদ্মা সেতু চালুর ৩ বছর আগেই বিআইডব্লিউটিসি’র একমাত্র অভ্যন্তরীণ যাত্রীবাহী স্টিমার সার্ভিসটি কার্যত বন্ধ রয়েছে। এখন পদ্মা সেতুকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে পুরো সার্ভিসটিই বন্ধ করে দেয়া হলো। দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রী সাধারনের অভিযোগ, ‘সরকারী নৌযানগুলোর সময়সূচী কখনোই যাত্রী বান্ধব ছিলনা। এখন পদ্মা সেঁতুকে খোড়া অজুহাত হিসেবে দাঁড় করা হচ্ছে’। তাদের মতে ঢাকা থেকে বর্তমানের সন্ধা সাড়ে ৬টার পরিবর্তে রাত সাড়ে ৮টায় প্যাডেল চালিত রকেট স্টিমারগুলো ছেড়ে চাঁদপুরÑবরিশালÑঝালকাঠীÑপিরোজপুর হয়ে পরদিন সকাল সাড়ে ১১ টায় বাগেরহাটের সন্ন্যাশী ঘাঁটে পৌঁছে, সেখান থেকে দুপুর সাড়ে ১২ টায় ফিরতি যাত্রা করে একই পথে তা পরের দিন সকালে ঢাকায় পৌঁছানো সম্ভব। এতে করে মাত্র দুটি প্যাডেল জাহাজের সাহায্যে রকেটি স্টিমার সার্ভিসটি পরিচালনের পাশাপাশি অপর ১টি নৌযানকে স্ট্যান্ডবাই হিসেবে রাখা যেতে পারে।
পাশাপাশি স্ক্রু-হুইল দুটি নৌযান ঢাকা থেকে ভোলার ইলিশা হয়ে হাতিয়া পর্যন্ত দিবাকালীন যাত্রী পরিবহনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলেও মনে করছেন সচেতন মহল।
এসব বিষয়ে বিআইডব্লিউটিসি’র পরিচালক (বানিজ্য) আশিকুজ্জামানের সাথে আলাপ করা হলে তিনি জানান, অব্যাহত লোকসানে রকেট স্টিমার সার্ভিসটি অপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। আমরা কমিটি করে দিয়েছি নতুন রুটের সন্ধানে। পাশাপাশি বন্ধ হয়ে যাওয়া রকেট সার্ভিসটিও কিভাবে যাত্রী সুবিধা অনুযায়ী পরিচালন করা যায় তাও পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
