3:42 pm , September 15, 2022
আরিফ আহমেদ, বিশেষ প্রতিবেদক ॥ “মাঝ রাতে উঠে আলোটা জ্বালিয়া
সাজিয়ে নেবেন ভাতের থালিয়া
আলাদা বাটিতে মাছের কালিয়া
লাগে যতটুকু থালায় ঢালিয়া
খুশী মনে খান আর গেয়ে গান
মহাসুখী মাছ পুকুরে পালিয়া
আমাদের নেতা সুজন মালিয়া
ভর্তা খাবেন মরিচ টালিয়া
খাওয়া শেষ হলে মুখে দিয়ে পান
তৃপ্তির সুরে স্মিত হাসিমুখে
বলেন, উসকো খা লিয়া, খা লিয়া…” এটি ছড়াকার তপংকর চক্রবর্তীর অসংখ্য ছড়ার একটির অংশ বিশেষ। তার শ্রেষ্ঠ ছড়া বইটিতে এমন হাজারো ছড়া ছড়িয়ে আছে শিশু কিশোর ও বড়োদের মনে মনোলোভা তৃপ্তি দানে। কোনোটা শিক্ষনীয় উপকরণে সাজানো কোনোটা আবার শুধুই রসাত্মক। তিনি যেমন শিশুতোষ ছড়া রচনায় পারদর্শী তেমনি তার কবিতায় ফুটে ওঠে রাজনীতি, সমাজ ও মানুষকে দেখেছেন চুলচেরা বিশ্লেষণে।
“কেমন আছেন ?—-ভালো
এ রকম বলার অভ্যাস
হৃদয়ে দহন যার
কতটুকু ভালো আর কাটায় সময়?
চারপাশে বেনোজল, লোভের কুহক, এ জীবন আদ্যোপান্ত মিথ্যার বেসাতি
ছল- চাতুরীর খেলা,”
একদিকে তিনি যেমন পেয়েছেন পাঠক প্রিয়তা, তেমনি গভীর ভাব-সম্পদে ঋদ্ধ তাঁর অন্যান্য সম্পাদনা গ্রন্থগুলো।
তপংকর চক্রবর্তী বলেন, সাহিত্য সাংস্কৃতিক চর্চায় বর্তমান বরিশাল অনেক পিছিয়ে আছে। বিভাজন ও তরুণ প্রজন্মের অনাগ্রহ এজন্য দায়ী। আমরাও দায়ী কারণ হয়তো তরুণদের বোঝাতে বা শিখাতে ব্যর্থ হয়েছি আমরা। তাই আমি অন্তত চাই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে থেকে কেউ এগিয়ে আসুক। দলমত নির্বিশেষে সবাইকে সাথে নিয়ে সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চার বিকাশ ঘটাবে সে এটাই আমার প্রত্যাশা। আমরা প্রবীণরা তাকে সহযোগিতা করবো।
কিন্তু এমন কেউ আদৌ কি আছেন? এ প্রশ্ন বরিশালের তথা বাংলাদেশের পাঠকের মনেও। কবি আসাদ চৌধুরীর পরে আজ পর্যন্ত বরিশালের উল্লেখ করার মতো সাহিত্য কর্মী আর তৈরি হয়নি কেউ। এটাও এক ধরনের ব্যর্থতা বলতে হবে। অরূপ তালুকদার, দীপংকর চক্রবর্তী ও হেনরী স্বপন আছেন বটে। তবে তারাও সীমাবদ্ধ সীমানা অতিক্রমে কতটা সার্থক?
বরিশালের সাহিত্য সাংস্কৃতিক চর্চায় সবচেয়ে মন্দা সময় চলছে বিগত প্রায় দুই যুগ ধরে। মতাদর্শের অমিল লেখনীতে প্রকাশ না পেয়ে প্রকাশিত হয়েছে অন্তরদ্বন্দ্বে। এরমধ্যেও যে কয়েকজন হাতেগোনা মানুষ সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চাটা নিয়মিত ধরে রেখেছেন তাদের অন্যতম একজন কবি ও ছড়াকার তপংকর চক্রবর্তী। তিনি যে শুধু বরিশালের সাহিত্য নিয়ে কাজ করছেন তা ই শুধু নয়। ঢাকা ও কলকাতার সাহিত্য অঙ্গনে বরিশালকে তুলে ধরার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন সেই ১৯৬৮ সালে প্রথম কবিতা লিখতে শুরু করার দিন থেকে।
১৯৭০ সালে ঢাকার পত্রিকায় প্রথম কবিতা প্রকাশিত হবার পর থেকে আজ পর্যন্ত লিখেছেন অসংখ্য পত্রিকার পাতায়। নিজেই সম্পাদনা করেছেন সাহিত্যের পত্রিকা ধারাপাত, নান্দনিক ও বর্তমানে স্বকাল কবিতা পত্রিকার সম্পাদক তিনি।
তপংকর চক্রবর্তী বলেন, পিতা শৈলেশ্বর চক্রবর্তী ও মা কুন্তিরাণী চক্রবর্তী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সৈনিক ছিলেন। দুজনেই শিক্ষক হিসেবে সুনামের সাথে জীবীকা নির্বাহ করতেন। তাদের আদর্শ নিয়েই আমরা তিন ভাই বেড়ে উঠেছি এই বরিশালের আলো হাওয়ায়। আমরা বিশেষ করে আমি সবসময় চেষ্টা করছি সবাইকে একসাথে নিয়ে সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চাটা ধরে রাখতে। তবে বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সাহিত্য সাংস্কৃতিক চর্চায় খুব একটা আগ্রহ দেখিনা।
কবি তপংকর চক্রবর্তীর মৌলিক প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২০টির বেশি। এছাড়াও ২৯ টির বেশি সম্পাদনা কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন। পেশায় কলেজ শিক্ষক। ১৯৮৩ সালে তিনি সহকারী অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। ২০১৬ সালে অমৃত লাল দে কলেজের অধ্যক্ষ তপংকর চক্রবর্তী শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর গ্রহণ করেন। শুধু কবিতা ও ছড়া নয়। সাংবাদিকতা, জীবনী গ্রন্থ, ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়েও তার মৌলিক গ্রন্থ কম নয়। অশ্বিনী কুমার দত্ত, কামিনী রায় কে নিয়েও রয়েছে তার গবেষণা। বরিশালে জাতীয় কবিতা পরিষদের পাশাপাশি জীবনানন্দ মেলার আয়োজন।
একনজরে তপংকর চক্রবর্তী
পিতা ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামী ও শিক্ষাবিদ শৈলেশ^র চক্রবর্তী, মাতা: ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামী কুন্তী রানী চক্রবর্তী, জন্ম: বরিশাল শহর, ৯ জুলাই (২৪ আষাঢ়) ১৯৫৫। সাবেক অধ্যক্ষ, অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়, বরিশাল। প্রকাশিত মৌলিক গ্রন্থ সংখ্যা ২০টি এবং সম্পাদিত গ্রন্থ সংখ্যা ৩৪টি। ধারাপাত, কবি ও কবিতা, আলোকপত্র, নান্দনিক ও স্বকাল কবিতাপত্রের সম্পাদক তিনি। দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি সাংবাদিকতার সাথেও জড়িত। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের নানা স্থান থেকে পেয়েছেন পুরস্কার ও সম্মাননা। কবি, ছড়াকার, গবেষক, সংগঠক ও শিক্ষাবিদ হিসেবে তার বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। তার বইগুলো কামিনী রায়, অশ্বিনী কুমার দত্ত, মোপাসাঁ রচনাসমগ্র- সুবোধ চক্রবর্তী (অনুবাদক) , তপংকর চক্রবর্তী (সম্পাদক) শ্রেষ্ঠ ছড়া ইত্যাদি।
