বরিশালের গর্ব সাংস্কৃতিজন মুকুল দাস বরিশালের গর্ব সাংস্কৃতিজন মুকুল দাস - ajkerparibartan.com
বরিশালের গর্ব সাংস্কৃতিজন মুকুল দাস

3:36 pm , September 11, 2022

আরিফ আহমেদ, বিশেষ প্রতিবেদক ॥ মুকুল দাস। একজন সংগীতজ্ঞ ও নাট্যজন। ভাড়া বাড়িতে অসহায় জীবনযাপন করেও আত্মমর্যাদায় আজো অটুট তিনি। করুনা কিংবা দান নয়, ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা নিয়েই বেঁচে থাকতে চান তিনি। একজন খাঁটি মানুষ হিসেবেও সুনাম রয়েছে মুকুল দাসের। বরিশালের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের উল্লেখযোগ্য একটি নাম। একটা সময় গেছে, যখন যে কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে মুকুল দাস ছিলেন সকলের আগে, সকলের প্রয়োজনে। গান এবং নাটকে কিংবা মঞ্চের শোভা বাড়াতে প্রয়োজন হতো মুকুলের। তরুণ মুকুল দাস তখন রীতিমতো বেগার দিতেন সব সাংস্কৃতিক সংগঠনে। আজো বরিশালের সাংস্কৃতিক আয়োজন তাকে ছাড়া বেমানান লাগে। তাইতো শব্দাবলী গ্রুপ থিয়েটারের নতুন নাটকের প্রদর্শনীতে মুকুল দাসের নিমন্ত্রণ। কারণ, তিনি প্রদর্শনী দেখে যদি বলেন চমৎকার। তবেই এটি নিয়মিত মঞ্চে যাবে, তানা হলে আবারও চলবে পরিমার্জন। বরিশালের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আজো বিশ্লেষক মুকল দাস এর বিকল্প নেই। সংগীত, নৃত্য, চিত্রকলা কিংবা নতুন নাটকের প্রদর্শনী হবার আগে তাই বিশ্লেষক মুকুল দাসের ডাক পড়ে আজো। যদিও পকেটে তার রিক্সা ভাড়া নেই, তবুও ছুটে যান যে কারো ডাকে।
ঝাউতলার ১ নং গলিতে মোরশেদা মঞ্জিল নামের বাড়ির নীচতলার এই ভাড়াটিয়া মুকুল দাসকে নতুন প্রজন্মের কেউই চেনে না তেমন। তার উপর চলতি মাসেই এই বাড়িটিতে এসেছেন তিনি। এর আগে ছিলেন জেলে বাড়ির পুলের একটি বাড়িতে। সহধর্মিণী তাপসী সমদ্দারকে নিয়ে দুজনের টানাটানি সংসার। তার উপর ইদানীং প্রায়ই অসুস্থ থাকেন, পথচলতে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন মুকুল দাস। কানেও প্রায় শোনেন না। আবার কথা না শোনার অভিযোগ জানান তাপসী সমদ্দার। দুজনের শিক্ষকতা পেশা থেকে যা আয়, তাই দিয়ে চলছে বাড়ি ভাড়া, বাজারঘাট ও চিকিৎসা সেবা। এতে টানাটানি লেগে যায় প্রায়ই। কেননা মুকুল দাস তার শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর নিয়েছেন তাও প্রায় ১৩ বছর আগে। সহধর্মিণী তাপসী সমদ্দারের স্বাস্থ্য খুব একটা ভালো নয়। তারপরও তিনি বলেন, বেশ ভালো আছি আমরা। শুধু কলেজে গিয়ে মানুষটিকে নিয়ে চিন্তায় থাকি ইদানীং। নিজের শরীরও খুব একটা ভালো নয়। আশেপাশের পরিচিত মানুষগুলো এখন আর খুব প্রয়োজন ছাড়া আসে না। ডেকেও পাইনা কাউকে।
তারা প্রেম করে বিয়ে করেছেন। প্রেমপত্র লেখা নিয়ে মজা করেন নিজেরাই। ছোটবেলায় ভগবানের কাছে গায়ক স্বামী চেয়েছিলেন তাপসী। কলেজে এসে তাই প্রেমে পড়েন গায়ক মুকুল দাসের। নিঃসন্তান দম্পত্তির আনন্দ হাসি দুজনের ভাগাভাগি হয় আজো।
নাট্যাভিনেতা, সুরকার, সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব, লেখক সহ একাধিক পরিচয়ে পরিচিত মুকুল দাস। ১৯৪৯ সালের ৯ জানুয়ারী বরিশাল নগরীর দপ্তরখানা এলাকায় একটি সংস্কৃতিবান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পিতা স্বর্গীয় মনিন্দ্র কুমার দাস ছিলেন একজন জমিদার শ্রেণীর মানুষ। মাতা স্বর্গীয়া সরযূ দাস। ছয় ভাইবোনের মধ্যে মুকুল দাস সবার বড়। প্রবাদ আছে বড়টি সবসময় কুলের বলদই হয়। মানে সহজ সরল সহায়-সম্পত্তি বিষয়ে উদাসীন একজন ভালো মানুষ এই মুকুল দাসও। তাই পারিবারিক সম্পত্তি সব মামলা মোকদ্দমায় হেরে ভাড়া বাড়িতে জুটেছে আশ্রয়।
বরিশালের সংগীত ও সাহিত্য মজলিশে যে কজন ব্যক্তি আপন গুনে নিজেদের খ্যাতির শীর্ষে ফুটিয়ে তুলেছেন – মুকুল দাস তাদের মধ্যে অন্যতম। সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম মুকুল দাসের ছোটবেলা কেটেছে রাজার হালে। ঐ সময় সাহিত্য-সঙ্গীত আড্ডায় মুকুল দাসের পরিবার ছিলো সর্বাগ্রে। তার মা সরযু বালা চমৎকার ভজন শিল্পী ছিলেন। মায়ের কাছেই সংগীতের হাতেখড়ি নেন মুকুল দাস। তিনি বলেন, আমাদের বাড়িতে ঐ সময় তিন রকমের গ্রামোফোন থাকার সুবাদে গানের প্রতি আগ্রহটা বেড়ে যায়। মাত্র ৯ বছর বয়সে মঞ্চে প্রথম একটি শ্যামা সংগীত পরিবেশন করে সংগীত ভুবনে স্থান করে নেন তিনি। তারপর থেকে একটানা ৫৯ বছর সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সাথে একনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছেন। তার মধ্য দিয়েই পড়াশুনা শেষ করেছেন এবং চাকুরী করেছেন, প্রেম ও বিয়ে করেছেন। পেশাগত জীবনে মুকুল দাস একজন স্কুল শিক্ষক ছিলেন। অবসরে গেছেন তাও প্রায় ১৩ বছর। কিন্তু শিক্ষক পরিচয় ছাপিয়ে মুকুল দাস আজ সাংস্কৃতিক জন ও সংগীতজ্ঞ পরিচয়ে অধিক প্রতিষ্ঠিত।
তিনি কেন্দ্রীয় খেলাঘর, বরিশাল খেলাঘর, ঢাকার আরণ্যক নাট্যদল, বরিশাল নাটক, জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, জাতীয় কবিতা পরিষদ ও উদীচীর সাথে জড়িত ছিলেন। কাজ করেছেন ঢাকার আরণ্যক নাট্যদলের সাথেও। বরিশাল থিয়েটারে নিখিল সেনের নাটকসহ অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেছেন। তিনি কবি আসাদ চৌধুরী, নাট্যজন খায়রুল আলম সবুজসহ অনেকেই উল্লেখযোগ্য মনে করেন মুকুল দাসকে। বরিশালের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের অনেকেরই স্ব-স্নেহে ঘনিষ্ঠ হতে পেরেছিলেন। এছাড়া তিনি ঢাকা ও কলকাতার অনেক গুণী ব্যক্তির সংস্পর্শে আসেন। আজন্ম কৌতুক প্রিয় সর্বক্ষণ শিশুসুলভ আচরণের এই মানুষটি অনেক ঘটনার সাক্ষী। বহু গানের আসর মাতিয়ে মুকুল দাস আজও অমলিন হয়ে রয়েছেন। গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিয়ে সাহিত্য বাজার পত্রিকার ১৫ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বরিশাল সাহিত্য সংসদ আয়োজিত গুনীজন সম্মাননা নিবেদন করা হয়েছে মুকুল দাস চরণে।

এই বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০  
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT