বরিশালে জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের স্মৃতি ধরে রাখার দাবী বরিশালে জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের স্মৃতি ধরে রাখার দাবী - ajkerparibartan.com
বরিশালে জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের স্মৃতি ধরে রাখার দাবী

3:49 pm , August 27, 2022

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি বিজড়িত বরিশালে অনেকটা নীরবেই ৪৬তম মৃত্যু বার্ষিকী চলে গেছে শনিবার। শুধু মাত্র নজরুল স্মৃতি সংসদ বরিশাল শিল্পকলা একাডেমিতে সন্ধ্যার পরে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে তাদের অস্তিত্বের জানান দিয়েছে। এমনকি মহানগরীতে কবির দেখা ও লেখার স্মৃতিগুলোর অস্তিত্বও ইতোমধ্যে প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে। জাতীয় কবির স্মৃতিকে ধরে রাখতে নগরীতে একটি রাস্তার নামকরণও হয়নি অদ্যবধি। বৃটিশÑভারত যুগে কবি নজরুল দু,বার বরিশালে এসে এই নগরীর অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে মোহিত হয়েছিলেন। কবি বরিশালে এসে কীর্তনখোলার কাছে বাঁধ রোডের পাশের ঝাউ বাগান দেখে মোহিত হয়েছিলেন। তিনি তার অমর উপন্যাস ‘মৃত্যু ক্ষুধা’য় কীর্তনখোলা নদী ও তার পাশের বাঁধ রোডের ধারে ঝাউ বাগানের বর্ণনা দিতেও ভোলেননি।
নজরুলের বরিশালে এখনো রূপসী বাংলার চিরায়ত কিছু রূপ চোখে পড়লেও অব্যাহত নগরায়নে নগরীতে কবির দেখা ঝাউ ও পাম গাছসহ প্রাকৃতির অনেক কিছুই বিলুপ্ত হয়েছে। দলবাজ সুশীল সমাজ ও দলদাশ বুদ্ধিজীবীসহ কথিত পরিবেশবাদীরাও এসব বিষয়ে সরব হবার সময় পান না। দাবীও তোলেননি কবির স্মৃতিকে ধরে রাখার।
বরিশাল নগরীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাতে গোনা কয়েকটি পাম গাছ এখনো তাদের অস্তিত্বের জানান দিলেও গাছের সারি বিলুপ্ত হয়েছে অনেক আগেই। সাবেক নগর পরিষদ নতুন করে নগরীর কয়েকটি স্থানে ঝাউগাছের আবাদ করায় তার কিছু এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকলেও অযতœ অবহেলায় বেশীরভাগেরই অস্তিত্ব সংকটাপন্ন। নগরীর পাশে বহমান কীর্তনখোলা নদীর পাড়ে মুক্তিযোদ্ধা পার্ক, আমতলার মোড়ের স্বাধীনতা পার্ক, গোড়াচাঁদ দাশ রোডের খৃষ্টান গোরস্থান এবং বিসিক রোডের নিকটে মহাশ্মশানের পাশে ঝাউগাছের যে বনায়ন হয়েছিল বিগত নগর পরিষদের সময়ে, এখন তার তেমন কোন যতœ নেই।
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বৃটিশযুগে অবিভক্ত বাংলার গভর্ণর শের-ই বাংলা একে ফজলুল হকের সাথে প্রথম বরিশালে আসেন ১৯২০ সালে। বরিশালের সন্তান ফজলুল হকের সাথে সেবার তিনি বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনী সভায় দেশাত্ববোধক গান পরিবেশন করেন। পরবর্তীতে ১৯৩০ সালের দিকে তিনি নোয়াখালী হয়ে আরো একবার বরিশালে এসে এই নগরীর প্রাকৃতিক শোভায় মোহিত হয়ে অমর উপন্যাস ‘মৃত্যু ক্ষুধা’য় বরিশাল শহরের প্রাকৃতিক শোভার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়েছেন। কবি নাসির উদ্দীনের সম্পাদনায় ‘মাসিক সওগাত’ পত্রিকায় মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাসটি বাংলা ১৩৩৪-এর অগ্রহায়ন থেকে ’৩৬ সালের ফাল্গুন পর্যন্ত সংখ্যাগুলোতে ছাপা হয়েছিল। কবি বৃটিশ যুগে এ শহরের পাশে প্রবাহমান কীর্তনখোলা নদী তীরে সুড়কীর রাস্তা আর গাছ গাছালীর কথাও উল্লেখ করতে ভোলেননি ।
জাতীয় কবি লিখেছিলেন, ‘বরিশাল। বাংলার ভেনিস। আঁকাবাঁকা লাল রাস্তা। শহরটি জড়িয়ে ধরে আছে ভুজ-বন্ধের মত করে। রাস্তার দু-ধারে ঝাউ গাছের সারি। তারই পাশে নদী। টলমল টলমল করছেÑবোম্বাই শাড়ী পড়া ভরা-যৌবন বধূর পথÑচলার মত করে। যত না চলে, অঙ্গ দোলে তার চেয়ে অনেক বেশী। নদীর ওপারে ধানের ক্ষেত। তারও ওপারে নারকেল-সুপারী কুঞ্জঘেরা সবুজ গ্রাম, শান্ত নিশ্চুপ। সবুজ শাড়ীÑপড়া বাসর-ঘরের ভয়-পাওয়া ছোট্ট কনে-বৌটির মত। এক আকাশ হতে আর-আকাশে কার অনুনয় সঞ্চারন করে ফিরছে। বৌ কথা কও, বৌ কথা কও। আঁধারে চাঁদর মুড়ি দিয়ে তখনো রাত্রী অভিসারে বোরোয়নি। তখনো বুঝি তার সন্ধ্যা প্রসাধন শেষ হয়নি। শঙ্কায় হাতের আলতার শিশি সাঁঝের আকাশে গড়িয়ে পড়েছে। পায়ের চেয়ে আকাশটাই রেঙে উঠেছে বেশী। মেঘের কালো খোপায় ভূতীয়া চাঁদরে গো’ড়ে মালাটা জড়াতে গিয়ে বেঁেক গেছে। উঠোনময় তারার ফুল ছড়ানো। …..।’
নজরুলের দেখা ‘বাংলার ভেনিস’ বরিশাল’কে এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। অপরিকল্পিত নগরায়নে জাতীয় কবির বরিশাল থেকে বেশীরভাগ খাল বিলুপ্ত হয়েছে অনেক আগেই। ফলে এনগরীতে এখন আর জোয়ারÑভাটার পানি আসা যাওয়া করেনা। খাল ভরাট করে যে সব কংক্রীটের ড্রেন নির্মিত হয়েছে, তাতে পানি চলাচলের পরিবর্তে ময়লার ভাগারে ঠাসা। ফলে এক ঘন্টার বৃষ্টিতে ড্রেনের পানি রাস্তাকে সয়লাব করে দিচ্ছে। অপরদিকে নদী বন্দর সচল রাখার নামে অপরিকল্পিত ড্রেজিং-এ কির্তনখোলার পলি আবার নদীতেই ফেলায় তলদেশ ভরাট হয়ে এ নগরী ক্রমাগত জলাবদ্ধতার কবলে।
বিবেকহীন কর্মকান্ডে এ নগরী থেকে প্রকৃতির অনেক দান বিলুপ্ত হলেও তাকে রক্ষা করাসহ ফিরিয়ে আনার সময় এখনো আছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদগন।
কবি নজরুল ‘মৃত্যু ক্ষুধা’য় যে স্থানের বর্ণনা দিয়েছিলেন, সেটি নিঃসন্দেহে নগরীর বাঁধ রোডের ভাটার খাল থেকে স্টেডিয়ামের মধ্যবর্তী এলাকা। কীর্তনখোলা নদী তীরে সে সময়ের বরিশাল শহর, আজকের মহানগরীর ঐ এলাকায় বাঁধ রোডের দুধারে তখন ঝাউ আর পাম গাছের সারি যেকোন পাষানেরও মন জুড়াতো। নজরুলের দেখা বাঁধ রোডটি জাতীয় কবির নামে নামকরণের দাবীও রয়েছে সাধারন মানুষের।
বাঁধ রেডে বঙ্গবন্ধু উদ্যানের পাশে যে কয়টি পাম গাছ তাদের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছিল, তাও কয়েক বছর আগে কেটে ফেলা হয়েছে কথিত নিরাপত্তার অজুহাতে। যদিও বঙ্গবন্ধু উদ্যানের কোল ঘেষে বাঁধ রোডের ধারে কিছু সোনালু গাছ রঙ ছড়াচ্ছে।
পাশের হীমনীড়-এর পদ্ম পুকুরের পদ্ম ফুলের বংশ সমূলে ধ্বংস করার কর্মযজ্ঞ চলছে। এ পদ্ম পুকুর আর ফুল দেখতে এখনো দূর দূরান্ত থেকে বহু মানুষ প্রতিদিন ছুটে আসেন। কিন্তু পাম গাছ আর ফিরে আসেনি। সোনালু ফুল এ নগরীর শোভাবর্ধন করলেও পাম গাছের অস্তিত্ব প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে। নগরীর ফজলুল হক এভিনিউ ও হাসপাতাল রোডের পাশের প্রায় সব পাম গাছ বিলুপ্ত হয়েছে গত এক দশকে। নগর ভবন বা বন অধিদপ্তরও এ নগরীকে প্রকৃতির অতীত রূপে ফিরিয়ে আনতে তেমন কোন ভূমিকা রাখছে না।

এই বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT