ঐতিহ্যবাহী পদ্ম পুকুরে তৈরি হচ্ছে জেটি! বরিশালবাসীর তীব্র প্রতিবাদ ঐতিহ্যবাহী পদ্ম পুকুরে তৈরি হচ্ছে জেটি! বরিশালবাসীর তীব্র প্রতিবাদ - ajkerparibartan.com
ঐতিহ্যবাহী পদ্ম পুকুরে তৈরি হচ্ছে জেটি! বরিশালবাসীর তীব্র প্রতিবাদ

3:24 pm , August 2, 2022

আরিফ আহমেদ, বিশেষ প্রতিবেদক ॥ বরিশালের ঐতিহ্যবাহী পদ্ম পুকুরে নির্মিত হচ্ছে ঝুলন্ত বৈঠকখানা বা জেটি। প্রশাসন ও ভিআইপিদের চা আড্ডা কিম্বা কাছ থেকে উপভোগের জন্য পুকুরের ভিতর এই আয়োজন করছে বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশলী কর্তৃপক্ষ। অথচ দর্শনার্থীদের জন্য উম্মুক্ত নয় এই অন্যতম দর্শনীয় স্থানটি। একপাশে সড়ক ও সান বাঁধানো ঘাট থাকলেও অযতœ অবহেলায় পুকুরের তিনপাশে আগাছা জঙ্গলের বিস্তার। বরিশালের সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দের দাবী পদ্ম পুকুরটিকে যেমন আছে তেমনই থাকতে দেয়া হোক এবং এ অবস্থায়ই এটিকে পর্যটন স্পষ্ট হিসেবে গড়ে তোলা হোক। দর্শনীর বিনিময়ে দর্শনের ব্যবস্থা হলে এটিও হতে পারে পর্যটন আয়ের উৎস। পদ্ম পুকুরটি মডেল স্কুলের বিপরীতে বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী সাইনবোর্ড ঝুলানো চারদেয়ালের ভিতরে সংরক্ষিত এলাকায়। বান্দরোড সংলগ্ন সড়ক থেকে দেখা বেশ কষ্টসাধ্য এটি। মডেল স্কুল ও মহিলা ক্লাবের ঠিক মাঝখানে বিপরীত পাশেই বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী ভবনের প্রবেশপথ। এ পথ আগলে আছে স্টিলের বড় গেট ও তালা। রয়েছেন একজন নিরাপত্তা রক্ষীও। রক্ষীর কাছে একটু পুকুর দেখার জন্য বিনীত অনুরোধ জানাতেই সে দরজা খুলে দিলেন আর বললেন, পুকুর দেখুন। তবে অফিস ভবন আর ঐ পুকুরের মাঝে যে কাজ চলছে ওদিকে যাবেন না। গেট দিয়ে প্রবেশ করতেই পিচঢালা পথ সোজা চলে গেছে অফিস ভবনে। হাতের ডানে শ্বেতপদ্মরা উঁকি দিয়ে ডাকছিল যেন। বেশ বড় পুকুর। পরে জানাগেল প্রায় ৭০ শতক জমিতে এই পুকুরটি তৈরি করা হয়েছে। পুকুর জুড়ে পদ্মপাতা আর সাদাটে শ্বেতপদ্ম ফুটি ফুটি অনুভূতির আমন্ত্রণ। হাতের বামপাশে চমৎকার একটি রেস্টহাউজ। লেখাই আছে – এটি ভিআইপিদের জন্য। পুকুরের চারপাশে ঘোরার বা হাঁটার কোনো ব্যবস্থা নেই। আছে আগাছা আর নরম কাদামাটি। পিচঢালা পথের পাশেই পুকুরে নেমে গেছে সান বাঁধানো ঘাট। ঘাট থেকে একটু সামনে এগিয়ে পুকুরের ভিতরে দাঁড়িয়ে আড্ডা দেওয়ার জন্য ঝুলন্ত বৈঠকখানা বা জেটি তৈরির কাজ চলছে। পদ্মপাতা আর শ্বেতপদ্মে পরিপূর্ণ পুকুরটি এই মুহূর্তে। যদিও ফুলগুলো সব বুঝে আছে। দু একটি ফুটেছে সাদাটে ডানা মেলে। এখানে এই পুকুরটির রক্ষণাবেক্ষণে উদাসীনতা স্পষ্ট। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবেশ আন্দোলনের নেতা এনায়েত হোসেন শিবলু। জেটি নির্মাণের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, দর্শনার্থীদের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত রাখা ও সৌন্দর্যবর্ধনের কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় ধীরে ধীরে পদ্ম পুকুরের ঐতিহ্য ম্লান হয়ে যাচ্ছে। দূরের দর্শক এসে সহজে খুঁজে পাচ্ছে না এটি। তাছাড়া পুকুরটি থেকে গত বছর সব পদ্ম তুলে ফেলে পরিষ্কার করা হয়েছিল। তাই খুব একটা ফুল ফোটার সম্ভবনা নেই এ বছর বলে জানান শিবলু।
গতবছরের তুলনায় এবার অনেক বেশি ফুল ফুঁটেছে বলে দাবী করেন বিআইডব্লিএটিএ কর্তৃপক্ষ। তবে হেরিটেজ হওয়ায় পদ্ম পুকুরের তীর সংরক্ষণ ও তীরে ওয়াকওয়ে নির্মাণসহ পুকুরের সৌন্দর্য বর্ধণের কাজ প্রায় শেষের দিকে বলে জানালেন বরিশালের বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ। তবে ঝুলন্ত বৈঠকখানা বা জেটি বিষয়ে নবনিযুক্ত উপ পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক কিছুই জানেন না দাবী করে বলেন, এটি আসলে নির্বাহী প্রকৌশল বিভাগের দায়িত্বে আছে।
বরিশাল বিআইডব্লিটিএর ইতিহাস ঘেটে জানা যায়, ১৯৬৫ সালে বরিশাল মেরিন ওয়ার্কশপের তৎকালীন ম্যানেজার জার্মানীর বাসিন্দা মি. ইলিগনর কয়েকটি শ্বেতপদ্ম মূলসহ সংগ্রহ করে বিআইডব্লিটিএ’র ‘হীম নীড়’ পুকুরের তলদেশে রোপন করেন। ধীরে ধীরে ৬৯ শতাংশ আয়তনের পুরো পুকুরে ছড়িয়ে পড়ে শ্বেতপদ্ম।
স্থানীয় নিরাপত্তা কর্মী জানান,, প্রতি বছর ফাল্গুনে গরম পড়তে শুরু করলে পদ্ম গাছে পাতা ছাড়তে শুরু করে। পাতায় পুরো পুকুর ছেয়ে যায়। পাতা থাকে পানির উপরে ভাসমান অবস্থায়। বৈশাখে জৈষ্ঠ্যমাসে ফুল ফুটতে শুরু করে। ভাদ্র মাস পর্যন্ত ফুল পাওয়া যায়। ভাদ্র মাসের পরপরই পুকুরের সব পদ্ম গাছ এবং অন্যান্য আগাছা পরিস্কার করা হয়। আবার পদ্ম গাছ বেড়ে ওঠে ফাল্গুনে।
পদ্ম ফুলের ৫ মাসের মৌসুমে নগরীর বান্দ রোড লাগোয়া হীম নীড়ের পুকুর পাড়ে দর্শনার্থীদের ঢল নামে বলা হলেও পর পর পাঁচদিন সরেজমিনে কোনো দর্শনার্থী দেখা যায়নি। এমনকি সাংবাদিক জেনেও প্রতিবেদককে প্রবেশে বাঁধা দেওয়া হয় প্রথমে। স্বাভাবিক ভাবেই বোঝা যায়, এখানে দর্শনার্থীদের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত। এটা লেখাও আছে সাইনবোর্ডে। তবে সরকারি ছুটির দিনে অনুমতি নিয়ে দর্শনার্থীদের দেখার সুযোগ রয়েছে বলে জানালেন বিআইডব্লিউটিএ নির্বাহী প্রকৌশল কর্তৃপক্ষ।
পুকুর জুড়ে পদ্ম পাতা ও ফুলে ভরে উঠা হীম নিড় দর্শনার্থীদের জন্য উম্মুক্ত করার দাবী সাধারণ নাগরিকদের। তবে বিশিষ্টজনের দাবী এটি দূর থেকে যেন ভালোভাবে দেখা যায়, সেলফি বা ফটোসেশান করা যায় সে ব্যবস্থা করাই উত্তম।
ঝুলন্ত বৈঠকখানা বা জেটি যাইহোক পুকুরের ভিতর কিছু নির্মানের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সামাজিক আন্দোলনের নেতা ও অর্থনিতি সমিতির সভাপতি কাজী মিজানুর রহমান বলেন, পদ্ম পুকুরটিকে ওর মতো থাকতে দিতে হবে। ওখানে দূর দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসে। তারা যাতে দূর থেকেই এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। ঝুলন্ত বৈঠকখানা বা জেটি যাই নির্মাণ হোক, সব কাজ সম্পন্ন হলেও তা ভেঙে ফেলতে হবে। বিষয়টি জরুরী জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন হায়দার এর দৃষ্টিতে আনার অনুরোধ জানান কাজী মিজান।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বরিশাল সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি অধ্যাপক শাহ সাজেদা বলেন, গত বছর পদ্মগাছ গোড়ালী (মূল)সহ উপড়ে ফেলে পুকুর পরিস্কার করে বিআইডব্লিউটিএ। তখন সচেতন নাগরিকদের অনেকেই প্রতিবাদ করেছিলো। তৎকালীন জেলা প্রশাসকের কাছেও আপত্তি জানিয়েছিলো। তারপরও পুরো পুকুর পদ্ম শূন্য করে ফেলা হয়েছে। ওই ঘটনার পর এবার কিছু ফুল ফুটেছে। যেগুলো ফুটছে সেগুলোও পরিপূর্ণ নয়।
শাহ সাজেদা আরো বলেন, বাংলাদেশের আর কোথাও আমার জানামতে শহরের মধ্যে এভাবে পুকুর ভরা পদ্ম ফুল পাওয়া যাবে না। বরিশালের পদ্ম পুকুর গৌরব করার মতো। কেন তারা পুকুরটির সৌন্দর্য নষ্ট করছে জানিনা। শুনেছি এখন আবার পুকুরের ভিতরে জেটি বানাচ্ছেন কর্তৃপক্ষ। এতে সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে? না পুকুর নষ্ট হবে তা তারাই ভালো বলতে পারবেন। শাহ সাজেদা আরো বলেন, কয়েকবছর ধরে শুনে আসছি কর্তৃপক্ষ সৌন্দর্যবর্ধন করবেন, দর্শনার্থীরা যাতে সহজেই পদ্ম উপভোগ করতে পারে সে ব্যবস্থা করবেন। আজ পর্যন্ত তা হয়নি। কেন হয়নি এই একই প্রশ্ন বরিশালের সচেতন নাগরিকদের প্রায় সকলের।
তবে বিআইডব্লিউটিএ বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশিদ জানালেন, এটি কোনো ঝুলন্ত বৈঠকখানা নয়। পদ্মফুলের কাছাকাছি যেয়ে আরো গভীরভাবে অনুভব করার জন্য এটি একটি জেটি তৈরির কাজ চলছে। এটি সৌন্দর্যবর্ধনেরই একটা অংশ। ওখানে দাঁড়িয়ে পুকুরের সৌন্দর্য মুগ্ধ হতে আরো সুবিধা পাবে ভিআইপি দর্শনার্থীরা। আর যেহেতু এটি হেরিটেজ পুকুর। এটির চারপাশে হাঁটার পথ হলে এর সৌন্দর্য নষ্ট হবে। আমরা নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার রাখছি।

এই বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১  
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT