দাম সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে দাম সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে - ajkerparibartan.com
দাম সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে

3:37 pm , July 28, 2022

উৎপাদন বেড়েছে ইলিশের!

আরিফ আহমেদ, বিশেষ প্রতিবেদক ॥ পত্রিকার পাতাজুড়ে শিরোনাম উৎপাদন বেড়েছে ইলিশের। এ জন্য দক্ষিণাঞ্চলের ইলিশের উন্নয়নে অবদান রাখার জন্য বরিশালের জেলা প্রশাসক প্রধানমন্ত্রী থেকে স্বর্ণপদকও পেয়েছেন। ২৩ জুলাই মধ্যরাতে নিষেধাজ্ঞা ওঠার সাথে সাথে সাগরে ছুটছেন জেলেরা এবং ২৪ জুলাই ফিরে এসেছেন ট্রলার ভর্তি মনকে মন ইলিশ নিয়ে। এই ধারাবাহিকতায় ২৭ জুলাই সকালেও ট্রলার ভর্তি মনকে মন ইলিশ এসেছে বরিশালের ইলিশঘাটে। এদিকে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার মেঘনায় ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ার সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। সেখানে এক নৌকায় ধরা পড়েছে ছোট-বড় মিলিয়ে ৯৯ মণ ইলিশ। ইলিশের এতো সুসংবাদ পাওয়া গেলেও বাজারে কিন্তু সোনার হরিণের মতো দাম ইলিশের। সাধারণমানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। ১০০০ টাকার নীচে কোনো ইলিশ নেই এখনো, পরিষ্কার জবাব মাছ বিক্রেতাদের।
সারাদেশে একই চিত্র। সাগরে মাছ শিকারের ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হতেই ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়েছে কক্সবাজার, ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী ও বরিশালের জেলেদের জালে। যা নিয়ে জেলেরা দ্রুত ফিরেছেন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ঘাটে। তবে এসব ইলিশের সবটাই সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। আর হতদরিদ্র ও নি¤œবিত্তদের কাছে সোনার হরিণের মতোই মূল্যবান এখন প্রবৃদ্ধির এই ইলিশ। তাদের দাবী, এটা একটা কৌশল প্রবৃদ্ধি দেখানোর। নিষেধাজ্ঞা খুব উপকারী প্রমাণ করতেই উঠেপড়ে লেগেছে সরকারি এই মহল। কেননা শনিবার রাতে যেয়ে রবিবার সকালেই সাগর থেকে ফিরে আসা অসাধ্য ব্যাপার। গভীর কোনো রহস্য রয়েছে এর পিছনে। তবে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দুদিন আগেই সাগরে ছুটেছেন জেলেরা সে প্রমানও স্পষ্ট ইলিশের চোখে। কারণ, ঘাটে আসা বেশিরভাগ ইলিশের চোখ টকটকে লাল। পাইকারী ব্যবসায়ী রংপুরের মিলনের দাবী, দুতিন দিন আগের ধরা না হলে চোখ এতো লাল হয়না।
তবে জেলেরা বলছেন, নিষেধাজ্ঞার পরপরই সাগরে ছুটে যান তারা। একরাতেই ট্রলার ভর্তি ইলিশ ধরা পড়ায় দারুণ খুশি। আর অবতরণ কেন্দ্রে ইলিশ দেখে স্বস্তি ফিরেছে বলে মুগ্ধ প্রচারণা চালাচ্ছেন মৎস্য ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তারাও।
এদিকে ২৬ জুলাই সকালে কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ঘাটে একের পর এক ট্রলার ভেড়ার সংবাদ ছাপা হয়েছে পত্রিকার পাতায়। ভোলা ও হাতিয়ায় ট্রলারে বসে একের পর এক ইলিশ গুনেছেন জেলেরা। দুহাতে গুনে গুনে তা ভরছেন ঝুড়িতে। আর বিক্রির জন্য দ্রুত তা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের পল্টুনে। এ সংবাদ আনন্দ উৎসব হওয়া উচিত বলে দাবী অনেক সংবাদ প্রতিবেদকের। কিন্তু তানা করে তাদের ফেসবুক স্টাটাসেও উঠেছে প্রশ্ন। একরাতের মধ্যে সাগরে মাছ ধরে ফিরে আসার রহস্য জানতে মরিয়া অনেকেই।
কক্সবাজারের একজন সাংবাদিক জানিয়েছেন, ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে শনিবার বাঁকখালী নদীর মোহনা দিয়ে বড় বড় ট্রলারকে সাগরে মাছ শিকারে যেতে দেখেছেন তিনি। একইসময় আবার কিছু কিছু ট্রলারকে ফিরতেও দেখেছেন কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ঘাটে। প্রতিটি ট্রলার ভর্তি মাছ আর জেলেদের মুখে হাসি বলে দেয় তারা নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগে থেকেই সাগরে কাটিয়ে এসেছেন।
একইচিত্র বরিশাল বিভাগেও। এখানে বরগুনার এফবি আল্লাহর দান ট্রলারের মাঝি বলেন, “নিষেধাজ্ঞা শেষে ২৩ জুলাই শনিবার মধ্যরাতে সাগরে মাছ শিকারে যান তারা। কিন্তু গভীর সাগরে না গিয়ে মাত্র ৪ ঘণ্টা ট্রলার চালিয়ে জাল ফেলতেই ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়েছে জালে। তা-ও আবার আকারে অনেক বড়। কয়েক ঘণ্টা মাছ শিকারের পর ৫ হাজার ইলিশ নিয়ে দ্রুত ঘাটে ফিরেছেন তারা।”
বরিশালের জেলে রুস্তম বলেন, “বর্ষা মৌসুম পানিও বেড়েছে। তাই জালে বড় বড় ইলিশ ধরা পড়েছে। রাতে গিয়ে জাল ফেলে তা ট্রলার ভর্তি করে বেলা ১১টার দিকে পোর্ট রোডের ঘাটে ফিরলাম। ইলিশের ভালো দামও পাওয়া যাচ্ছে।”
বুধবার সকালে বরিশালের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ঘাটে দেখা যায়, একের পর এক ট্রলার ভিড়ছে ঘাটে। আর ট্রলারে বসে একের পর এক ইলিশ গুনছেন জেলেরা। দুহাতে গুনে গুনে তা ভরছেন ঝুড়িতে। আর বিক্রির জন্য দ্রুত তা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পোর্ট রোডের আড়ৎদারদের কাছে। পোর্ট রোডের আড়ৎদার জহির সিকদার জানালেন, ২৪ জুলাই সকাল থেকেই ট্রলার বোঝাই মাছ আসছে বাজারে। আসার আগেই তা পাইকাররা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ আগাম বায়না করেছেন। তাদের ট্রাকে আগে মাছ তুলে দেয়া হচ্ছে।
আড়ৎদার ও খুচরা বিক্রেতা মোবারক হাওলাদার বলেন, আসলে স্থানীয় বাজারে যে মাছ তা জেলেদের নিজেদের খাবারের জন্য রাখা মাছের একটা অংশ। আর কিছু ছুটকোছাটকা। বেশিরভাগ মাছই চলে যাচ্ছে খুলনা, রাজশাহী, রংপুর ও সিলেট থেকে আসা পাইকারী ব্যবসায়ীদের ট্রাকে। ফলে স্থানীয় বাজারে মাছ কম। দাম বেশি হচ্ছে। এসময় মাছ কিনতে আসা আরিফুল ইসলাম বলেন, “৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞার পর বেশ ভালোই মাছ পাওয়া যাচ্ছে শুনে কিনতে এসেছি। কিন্তু এখানে এসে ইলিশে হাত দেওয়া যাচ্ছে না। এক কেজি বা তার বেশি ওজনের ইলিশের দাম চায় ১৬০০ থেকে ১৭০০ টাকা। ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম নিচ্ছে ১৩০০ থেকে ১৪০০ টাকা। একটু ছোট ইলিশের দাম চায় কেজি প্রতি ১ হাজার টাকা।”
বরিশালের সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও অর্থনীতি সমিতির সভাপতি কাজী মিজানুর রহমান বলেন, দেশে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে। দক্ষিনাঞ্চলে ইলিশ প্রবৃদ্ধির হার এখন ১১৫ ভাগ। এ নিয়ে প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় অবিরাম প্রচারও চলছে। অথচ সাধারণ মানুষের কেনার ক্ষমতার বাইরে ইলিশ। আমার প্রশ্ন এত উৎপাদন ও সরবরাহের প্রভাব বাজারে পরছে না কেন? অর্থনীতির সূত্রের সাথে কোন মিল খুঁজে পাচ্ছিনা এ বক্তব্যের। সাধারণ মানুষ বছরে কে কয়টা ইলিশ সাশ্রয়ী দামে কিনে খেতে পারেন? উৎপাদন বৃদ্ধি তখনই ঘটে যখন সাধারণ মানুষের মাঝেও স্বাভাবিক ক্রয়ক্ষমতা থাকে।
মৎস কর্মকর্তা ও ইলিশ বিশেষজ্ঞ ড. বিমল চন্দ্র দাস বলেন, জলবাযুর প্রভাবে ইলিশ উৎপাদনে কিছুটা তারতম্য হয়েছে। তবে ইলিশ উৎপাদন কমেনি। এছাড়া সাগর, নদ-নদীতে সুস্বাদু পানির পরিমাণ আর পানির উচ্চতার উপরও ইলিশের চলাচল নির্ভর করে। আবার লবণাক্ততা থাকায়ও ইলিশের চলাচল পথ এবং জীবনচক্রের পরিবর্তনে ইলিশ মৌসুমেরও পরিবর্তন ঘটছে। তিনি আরও বলেন, দেশের উপকুলীয় তটরেখা এবং সমুদ্রের ২শ নটিক্যল মাইল পর্যন্ত ‘একান্ত অর্থনৈতিক এলাকা’র ১ লাখ ১৮ হজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটারের প্রায় সর্বত্রই ইলিশের বিচরণ রয়েছে’। তবে দূর্যোগপূর্ণ মৌসুম বিধায় বর্তমানে দুবলা পয়েন্ট থেকে ভোলার মনপুরার ভাটিতে ঢালচর ও চর কুকরী-মুকরী হয়ে টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনের মধ্যবর্তি সাগর এলাকা পর্যন্ত জেলেরা জাল ফেলতে পারছে। এসব এলাকাতেই ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ উঠে আসছে জালে।

এই বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১  
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT