শেবাচিম হাসপাতালে এ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট বলয়ে জিম্মি রোগীরা শেবাচিম হাসপাতালে এ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট বলয়ে জিম্মি রোগীরা - ajkerparibartan.com
শেবাচিম হাসপাতালে এ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট বলয়ে জিম্মি রোগীরা

3:30 pm , April 22, 2022

হেলাল উদ্দিন ॥ কোন ভাবেই দমানো যাচ্ছে না বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (শেবাচিম) ঘিরে গড়ে ওঠা অবৈধ এ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট। প্রশাসন ও কিংবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কেউ লাগাম টেনে ধরতে পারছে না সংঘবদ্ধ এই চক্রটিকে। যে কারনে এ্যাম্বুলেন্স মালিক কিংবা চালকদের দয়া ও ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে সেবা পেতে হচ্ছে নগরীসহ দক্ষিনাঞ্চলের রোগী ও স্বজনদের। বেসরকারী মালিকানাধীন এই এ্যাম্বুলেন্স-গুলোর পাহাড় বলয় সিন্ডিকেটের কারনে রোগীরা সরকারী এ্যাম্বুলেন্স সেবা নিতে পারছে না। সিন্ডিকেটটির অবস্থান এমন যে এদের বাইরে গিয়ে কারো এ্যাম্বুলেন্স সেবা নেওয়ার সুযোগ নেই। এমনি নতুন করে কারো এই ব্যবসায় আসা সম্ভব না। আর এই সব কিছু নিয়ন্ত্রন হচ্ছে বরিশাল এ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতির নামে। মাঝে মধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবৈধ এ্যাম্বুলেন্স ধরতে অভিযান পরিচালনা করা হলেও কিছু দিন পর আবার স্বরুপে ফিরে আসে চক্রটি। এছাড়া এ্যাম্বুলেন্স সাইনবোর্ড দিয়ে আড়ালে মাদক ব্যবসারও অভিযোগ রয়েছে বেশ কিছু চালকদের বিরুদ্ধে। হাসপাতাল প্রশাসন বলছে রোগীদের এ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়েছে। হাসপাতাল চত্বরে ২০ টির বেশী এ্যাম্বুলেন্স অবস্থান করতে পারবে না। এছাড়া ভাড়া নির্ধারন করে টানিয়ে দেওয়া হবে। এসব সিদ্ধান্ত না মানলে আইনানুক ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। শেবাচিম হাসপাতাল ঘিরে বেসরকারী মালিকদের এ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটটি পরিচালিত হচ্ছে বরিশাল এ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতির নামে। পূর্বে এর নাম ছিলো ‘দক্ষিণবঙ্গ এ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতি। কিন্তু এ নামে সরকারী নিবন্ধন না থাকায় বর্তমান কমিটি নতুন নাম (বরিশাল এ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতি) দিয়ে নিবন্ধন করেছেন। ফলে তাদের এই ব্যবসার ভিত কিছুটা মজবুত হয়েছে। জানা গেছে এই সংগঠনটির অধীনে ৯০ টির অধিক এ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। যে সব এ্যাম্বুলেন্স মালিকরা এই কমিটির সদস্য সহ বিভিন্ন পদে রয়েছেন। এই সংগঠনের খাতায় নাম না লিখিয়ে এ্যাম্বুলেন্স ব্যবসা করার সুযোগ নেই বরিশাল সহ গোটা দক্ষিনাঞ্চলে। আবার এই কমিটিতে স্থান পেতে হলে অর্ধ লাখ থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয় সংগঠনের নেতাদের। এখানেই শেষ নয় প্রতি মাসে প্রতিটি এ্যাম্বুলেন্স থেকে প্রশাসন ম্যানেজের নামে প্রশাসন বিট বাবদ দেড় হাজার এবং উন্নয়ন ফি বাবদ আরো ৫ থেকে ১ হাজার টাকা আদায় করা হয়। যে সব টাকা অনায়াসে সংগঠনের নেতারা লুটেপুটে খান। মাসে বিভিন্ন খাত থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করা হলেও সংগঠনের নামে নেই কোন ব্যাংক হিসাব। রোগীদের জিম্মি করায় ক্ষেত্রেও রয়েছে সংগঠনটির অভিনব আতœ স্বীকৃত কিছু পন্থা। কোন রোগী এ্যাম্বুলেন্স খোজ করলেই ছুটে আসেন সংগঠনের কিছু নেতারা। তারা প্রথমে রোগীকে সরকারী এ্যাম্বুলেন্স সেবা থেকে বঞ্চিত করে। এর জন্য এ্যাম্বুলেন্স নষ্ট বা সার্ভিস ভাল না অথবা রোগী যেখানে যেতে চায় সেখানে যাবে না এছাড়াও নানা কথা বলে বেসরকারী এ্যাম্বুলেন্স নিতে বাধ্য করে। এরপর দাম দর ওই নেতারাই নির্ধারন করে দেন। কোন চালকের কম টাকা নিয়ে রোগী বহনের ইচ্ছে থাকলেও তার কোন উপায় নেই। এর পর কোন এ্যাম্বুলেন্স রোগী বহন করবে তাও ঠিক কওে দেওয়া হয়। এর পর ওই চালকের কাছ থেকে বড় অংকের টাকা কমিশন কেটে রাখেন সংগঠনটির নেতারা।
তথ্য মতে শেবাচিম হাসপাতালে রোগী পরিবহনে মাত্র ৪ টি সরকারি এ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। যা বেশীর ভাগ নগরীর মধ্যেই রোগী বহন করে। আবার সরকারী এ্যাম্বুলেন্স লাশ বহন করার নিয়ম নেই। ঠিক এসব সুযোগই কাজে লাগাচ্ছে বেসরকারি এ্যাম্বুলেন্স মালিক সিন্ডিকেট। সরকারিভাবে ভাড়া নির্ধারণ থাকার পরও সরকারি এ্যাম্বুলেন্স সংকটের দোহাই দিয়ে রোগী এবং তাদের স্বজনদের জিম্মি করে বেসরকারি এ্যাম্বুলেন্সে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে হাজার হাজার টাকা। আবার সরকারিভাবে মরদেহ বহনের পরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় বেসরকারি এ্যাম্বুলেন্সেই ভরসা খুঁজে নিতে হচ্ছে। এর ফলে দরিদ্র নিন্মবিত্ত মানুষের বেশি ভাড়ায় এ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নেয়াটা রীতিমত কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, শেবাচিম হাসপাতালের সামনে প্রায় ৯০ টির মত বেসরকারি এ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। যেগুলোর বেশিরভাগের নেই বৈধ কাগজপত্র। পুরনো মাইক্রোবাসের ছাদে ইমারজেন্সি হুটার এবং গায়ে এ্যাম্বুলেন্স লিখেই মাইক্রোবাসগুলোকে এ্যাম্বুলেন্সে রূপান্তর করা হয়েছে। অপরদিকে,‘সরকারি নির্র্দেশনা অনুযায়ী একটি এ্যাম্বুলেন্সে যেসব সরঞ্জাম থাকা উচিৎ তার কোনটিই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না অবৈধ এ্যাম্বুলেন্সগুলোতে। থাকার মধ্যে আছে একটি মাত্র স্টেচার এবং নাম মাত্র অক্সিজেন সিলিন্ডার। তাও বেশিরভাগ এ্যাম্বুলেন্সে অক্সিজেন সিলিন্ডারও খুঁজে পাওয়া দুস্কর হয়ে দাঁড়ায়। হাসপাতালের চত্তরে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এ্যাম্বুলেন্সের কয়েকজন মালিক দাবি করেন, তারা সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে আছেন। গাড়ি বেশি হওয়ায় অনেক সময় এমন দিন আছে যে ট্রিপ পাওয়া যায় না। অথচ যারা সিন্ডিকেটের হোতা তাদের পকেটে হরহামেশাই টাকা আসছে। তারা জোর করে এক গাড়ির ট্রিপ অন্য গাড়িতে তুলে দিচ্ছে। তারা আরও অভিযোগ করেন, ‘মাস শেষে আমাদের কাছ থেকে প্রশাসনিক বিটের নামে দেড় হাজার টাকা করে নিচ্ছে বরিশাল এ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতি নামের সংগঠনের নেতারা। এমনকি তারা মাসিক চাঁদাও আদায় করছে আলাদাভাবে। অথচ ওই সংগঠন থেকে আমরা কোন সুযোগ সুবিধা পাই না।
শেবাচিম হাসপাতালের সরকারি এ্যাম্বুলেন্স চালকরা বলেন ‘সরকারিভাবে মাত্র ৪ টি এ্যাম্বুলেন্স সচল রয়েছে। সরকার নির্ধারিত ভাড়া নিয়েই রোগী পরিবহন করা হচ্ছে এ্যাম্বুলেন্স দুটিতে। বেসরকারি এ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের কারণে রোগীরা আমাদের কাছে আসতে পারে না। সিন্ডিকেটের লোকেরা চার দিক থেকে ঘিরে ফেলে রোগীদের বেসরকারি এ্যাম্বুলেন্সের কাছে নিয়ে যায়। এর ফলে সরকারি এ্যাম্বুলেন্স সেবা থেকে বঞ্ছিত হচ্ছে রোগী এবং স্বজনরা। এক কথায় অবৈধ সিন্ডিকেটের কাছে রোগী এবং স্বজনদের পাশাপাশি আমরা সরকারি এ্যাম্বুলেন্স চালকরাও জিম্মি হয়ে পড়েছি।
সব বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশাল এ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি ফিরোজ আলম বলেন প্রথম সংগঠনে নতুন সদস্য নেওয়া বন্ধ রয়েছে। তাই সদস্য পদ দেওয়ার নামে টাকা নেওয়ার প্রশ্নই উঠে না। আর উন্নয়ন ফি বাবদ মাসে এ্যাম্বুলেন্স প্রতি ২’শ টাকা আদায় করা হয়। এ টাকা সংগঠন চালাতে দরকার হয়। তিনি বলেন বিগত কমিটি কি করেছে সে জবাব আমি দেব না। তবে আমাদের সংগঠন কোন চাঁদাবাজীর সাথে জড়িত নেই। রোগী জিম্মি করার বিষয়ে তিনি বলেন এটাই আমাদের ব্যবসার ধরন। বর্তমানে এ্যাম্বুলেন্স সংখ্যা বেড়ে গেছে। তাই রোগী পেতে হলে প্রতিযোগীতা করতেই হবে। তিনি আরো বলেন সংগঠন চালাতে গেলে অভিযোগ থাকবেই এটাই স্বাভাবিক। তবে আমরা মানবিক কাজও করি। অনেক গরীব রোগীকে বিনা মূল্যে বা কম টাকায় সেবা দিয়ে থাকি। এছাড়া সংগঠনের সদস্যদের বিপদে আপদে সংগঠনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগীতা করা হয়। সব বিষয়ে আলাপ কালে হাসপাতাল পরিচালক ডাঃ মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন গতকালই এ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির নেতাদের নিয়ে বসেছিলাম। এ্যাম্বুলেন্স ব্যবসায় শৃঙ্খলা আনার জন্য এবং রোগীদের ভোগান্তি দূর করার জন্য কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকার নির্ধারিত ভাড়া চার্ট করে টানিয়ে দেওয়া,হাসপাতাল চত্তরের মধ্যে (নির্দিষ্ট স্থানে) সর্বোচ্চ ২০ টি এ্যাম্বুলেন্স পার্কিং করে রাখা। এছাড়া রোগীদের টানাহেছড়া না করাসহ বেশ কিছু নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত না মানলে আইনানুক ব্যবস্থা গ্রহনের কথা হয়েছে তাদেরকে। খুব দ্রুত এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হবে বলে জানান তিনি।

এই বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১  
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT