অটোরিকশা ও ইজিবাইকের দৌরাত্ম যানজটে আটকে থাকে নগরী অটোরিকশা ও ইজিবাইকের দৌরাত্ম যানজটে আটকে থাকে নগরী - ajkerparibartan.com
অটোরিকশা ও ইজিবাইকের দৌরাত্ম যানজটে আটকে থাকে নগরী

3:25 pm , April 11, 2022

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ যানজট ও সড়ক দূর্ঘটনা নগরবাসীর এখন নিত্য সাথী। ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের দৌরাত্মে হরহামেশাই ঘটছে দূর্ঘটনা। আর নিত্যনতুন রিকশাগুলোর দাপটে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সব পয়েন্টে তৈরি হচ্ছে যানজট। যেভাবেই হোক যানজট মুক্ত চায় নগরবাসী। আর প্রশাসন বলছেন পদ্মা সেতু চালু হলে এ যানজট আরো বাড়বে শহরে। অন্যদিকে, বিশেষজ্ঞের মতে, সবচেয়ে ভয়ংকর অটোরিকশার দ্রুতগতি। সরেজমিনে নগরীর সিএন্ডবি রোড ধরে সাগরদী হয়ে রূপাতলী বাসস্ট্যান্ড, ফজলুল হক এভিনিউ, নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকা, হাসপাতাল রোড, বাংলা বাজার মোড়, স্বরোড, মল্লিক রোড, কালীবাড়ি রোড, নতুন বাজার, কলেজ রোড, সদর রোড ও কাউনিয়া এলাকা ঘুরে দেখা যায়, যানজটে অস্থির এক নগরীর চিত্র। অটোরিকশা ও ইজিবাইকের ছড়াছড়ি পুরো নগর জুড়ে। কোনো নিয়মনীতি নেই, যে যার মতো ছুটছে যাত্রী ধরার প্রতিযোগিতায়। যত্রতত্র ব্রেক করে যাত্রী ওঠানামা করতে গিয়ে ঘটছে একের পর এক দূর্ঘটনা। বিশেষ করে, অটোরিকশাগুলোর শুধু সামনের চাকায় ব্রেক থাকা এবং গতির সাথে বডির ভারসাম্য না থাকায় উল্টে যাওয়ার আতংক থাকছেই। প্রশাসন ও নগর চিন্তাবিদদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নগরীতে মোট ৫৯৩ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এরমধ্যে পিচ-ঢালাই সড়ক প্রায় সাড়ে তিনশো কিলোমিটার। আর সিটি করপোরেশনের দেয়া তথ্যানুসারে, সংস্কার চলছে এমন সড়কের দৈর্ঘ্য এখন ৮০ কিলোমিটার। এসব সড়কের কোথাও বড় বড় গর্ত। আবার কোথাও খানাখন্দকে ভরা। কোথাও আবার চলছে নতুন সড়ক নির্মাণের কাজ। সিএন্ডবি রোড বা মহাসড়কে আমতলা মোড় থেকে নথুল্লাবাদ পর্যন্ত বিকল্প সড়কের ব্যবস্থা থাকলেও দীর্ঘদিন তা খানাখন্দের কারণে অব্যবহৃত। অটোরিকশা, ইজিবাইক ও মহেন্দ্রগুলো এখানে নিরুপায় হয়ে মহাসড়ক ব্যবহার করছে। ফলে এ সব সড়কে ঘটছে দুর্ঘটনা। অন্যথায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যানবাহন। তবে নগরবাসীর প্রধান সমস্যা এখন অটোরিকশা ও ইজিবাইকের প্রতিযোগিতা। যে হারে প্রতিদিন এগুলো বাড়ছে ও যত্রতত্র অনিয়ন্ত্রিত গতিতে ছুটছে তাতে প্রতিদিন কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনা লেগেই আছে। এ অবস্থা থেকে নগরবাসীকে দ্রুত মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের নেতা। নগর চিন্তাবিদ কাজী মিজানুর রহমান বলেন, প্রথম এবং প্রধান কথা হলো ৪ কিলোমিটার এলাকায় নগরীকে সীমাবদ্ধ না রেখে ৫৮ কিলোমিটার এলাকার ব্যাপ্তি ঘটাতে হবে। যেখানে কালেক্টরি ভবনেই যানবাহন রাখার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই সেখানে বাণিজ্যিক এলাকার কি অবস্থা তা সহজেই অনুমেয়। তিনি বলেন, নগরীতে যানজট ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সদর রোড, জেলখানার মোড়, নথুল্লাবাদ, সাগরদী, বটতলা এলাকায় অসহনীয় অবস্থায় সৃষ্টি হয়েছে। অপরিসর রাস্তা, যানবাহনের সংখ্যা অগুনতি, ফুটপাত ভাসমান হকারদের দখলে, সাইকেল লেন নাই। বাণিজ্যিক ভবনে পার্কিং ব্যবস্থা নাই। এমনকি সরকারি দপ্তরেও সেবা প্রত্যাশিগনের জন্য কোন পার্কিং ব্যবস্থা রাখা হয় নাই। নগরময় পাবলিক ওয়াশরুমের অভাব প্রকট। নগরীতে অন্তত ৬টি ফুটওভারব্রিজ বা আন্ডারপাস নির্মাণ অতীব জরুরি (হাতেম আলি কলেজ চৌমাথা, আমতলা মোড়, রুপাতলি, নথুল্লাবাদ, জেলখানার মোড়, সাগরদী বাজার)। কাজী মিজান আরো বলেন, অটোরিকশা ও ইজিবাইকের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে মহাদুর্যোগ তৈরি হবে। এগুলোর বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। হয় রাখুন, না হয় একদল বন্ধ করে দিন। দয়া করে এদের নিয়ে খেলবেন না। এদিকে বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার আমিন উল আহসান নিজেই বলছেন, অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে নগরী এখনই নাকাল হয়ে পড়েছে। আগামী দিনে এ চাপ আরও কয়েকগুণ বাড়বে। পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলে সব ধরনের যানবাহনের চাপ বাড়বে। এতে করে বর্তমান সড়কে যানবাহনের চাপ সামলানো অসাধ্য হয়ে পড়বে। তাই যানবাহনে শৃঙ্খলা ও বিকল্প সড়ক ব্যবস্থা করতে হবে। বরিশাল সিটি করপোরেশনের ৫৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পাকা সড়ক রয়েছে। ২০১৯ সালের জুনের আগে সিটি করপোরেশন দুই হাজার ৬৯০টি যানবাহনের লাইসেন্স দিয়েছিল। কিন্তু ওই বছরই উচ্চ আদালতের নির্দেশে সেসব যানবাহনের লাইসেন্স নবায়ন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ নিষেধাজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার লাইসেন্স নবায়ন বন্ধ রাখে সিটি করপোরেশন। লাইসেন্স নবায়ন বন্ধ হলেও গাড়ি চলাচল ও নতুন গাড়ি বৃদ্ধি থেমে থাকেনি। বর্তমানে নগরীতে ২০ হাজারের বেশি অটোরিকশা, ইজিবাইক ও মহেন্দ্র বাহন চলাচল করছে। অথচ বিআরটিএর মতে-বরিশাল মহানগরীতে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার যানবাহন চলাচলযোগ্য। অতিরিক্ত যানবাহন চলাচলের কারণে নগরীতে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। নগরীর মোড়ে মোড়ে ও অলিতে গলিতে বাড়ছে যানবাহনের চাপ। গত ডিসেম্বরে ইজিবাইক তৈরি নিষিদ্ধ করা হলেও নগরীর চৌমাথার রুইয়ারপুল, কালিজিরা ও নথুল্লাবাদ এলাকায় এখনো গোপনে তৈরি হচ্ছে অসংখ্য অটোরিকশা ও ইজিবাইক। সি এন্ডবি পোলের বাসিন্দা ইজিবাইক চালক ও মালিক আল আমিন শেখ জানান, তার দুটি অটোরিকশা ও ১ টি ইজিবাইক রয়েছে। অটোরিকশার দাম নতুন ৬০ ও পুরাতন ৩৫ হাজার। হলুদ অটো দাম ১ লাখ ৪০ নতুন এবং পুরাতন ১ লাখের মধ্যে পাওয়া যায়। আল আমিন শেখ, ইউনুস ও আলীসহ বেশ কয়েকজন অটোরিকশা ও ইজিবাইক চালকের সাথে কথা বলে জানা যায়, রুইয়ার পুল, কালিজিরা ও নথুল্লাবাদ এলাকায় এখনো গোপনে তৈরি হয় এসব যানবাহন। প্রতিদিন গড়ে চার থেকে পাঁচটি ইজিবাইক ও অটোরিকশা নতুন যুক্ত হচ্ছে নগরে। এ নিয়ে সদর রোডে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও আশেপাশে চলাচলের অনুমোদন রয়েছে। ফলে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বেশিরভাগই এখন অটোরিকশা বা ইজিবাইকের মালিক কিংবা দৈনিক চার থেকে ছয় শত টাকায় ভাড়ায় চলছে এসব যানবাহন। নগর চিন্তাবিদ ও পরিবেশ আন্দোলনের নেতা এনায়েত হোসেন শিবলু বলেন, নগরীতে প্রয়োজনের তুলনায় কয়েক গুণ যানবাহন চলাচল করায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। যানজট নিরসনে এখনই আমাদের কাজ করতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়িকে প্রাধান্য না দিয়ে পাবলিক পরিবহণে আমাদের আগ্রহ বাড়াতে হবে। আপনার মাধ্যমে নগরীর পোর্ট রোড ও চকবাজার এলাকা, বগুড়া রোড থেকে নতুন বাজার এলাকা ওয়ানওয়ে করার অনুরোধ জানাবো। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার বাহাউদ্দীন গোলাপ বললেন, ইজিবাইক তবুও মানা যায়, কিন্তু অটোরিকশাগুলোর ভোঁসভোঁস শব্দে ছুটে চলা ও একচাকার ব্রেক চাপার কারণে প্রায়শই উল্টে পড়ার পরিস্থিতি হয়। যা সত্যি আতঙ্কের বিষয়। একদিকে গ্রীষ্মকাল, অন্যদিকে রমজান মাস চলায় যানবাহনের চাপে মানুষের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তার উপর নগরীতে বিভিন্ন কোম্পানির বেশ কয়েকটি বাস, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি বাস, ব্যক্তিগত শ’ শ’ গাড়িসহ ইজিবাইক, মোটরচালিত রিকশা, বিআরটিএ কর্তৃক লাইসেন্সপ্রাপ্ত গ্যাসচালিত অটোরিকশা, সিএনজি ও থ্রি-হুইলার (মাহিন্দ্রা) চলাচল করছে। অনুমোদনের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি যানবাহন চলাচলের ফলে নগরীর অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে অহরহ যানজট দেখা দিচ্ছে। যদিও মেট্রোপলিটন ট্রাফিক বিভাগ জানায়, ছয় মাসে তারা এক হাজার ৫০০’র বেশি গাড়ি জব্দ করেছেন। মামলা করেছেন শত শত। সড়কের তুলনায় যানবাহন বেশি হওয়ায় এ দুর্ভোগ হচ্ছে বলে জানায় ট্রাফিক বিভাগ। আর বিআরটিএ’র উপ-পরিচালক জিয়াউর রহমানও স্বীকার করেন, নগরীতে সড়কের তুলনায় গাড়ির সংখ্যা বেশি। আঞ্চলিক পরিবহণ কমিটির বৈঠকে যানবাহন চলাচলে নানা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাতে করে যানবাহনের চাপ কিছুটা কমবে। মহানগরীতে ১০ থেকে ১২ হাজার অবৈধ যানবাহন চলাচল করছে বলেও জানান তিনি । এছাড়া কিছু অবৈধ গাড়ি রয়েছে। পাশাপাশি বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের কারখানাগুলোতে অভিযান চালিয়ে তা সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) এসএম তানভীর আরাফাত জানান, সামনে ঈদ। এ কারণে নগরীতে পণ্যবাহী যানবাহন বেশি চোখে পড়ছে। কোনো কোনো স্থানে একটু যানজটও হচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা যানজট নিরসনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। সড়কের তুলনায় এখানে যানবাহন কয়েকগুণ বেশি। বেশিরভাগ গাড়ি এখানে রাস্তায় পার্কিং করা হয়। কোনো স্থান বা ভবনে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় রাস্তায় গাড়িগুলো অবস্থান করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে আরো বেশি যানজট তৈরি হচ্ছে। এখনতো ভালোই, আগামী দুবছরে এই শহর পুরোপুরি যানজটে আবদ্ধ হয়ে যাবে। আর অটোরিকশা ও হলুদ ইজিবাইক দুটোই অবৈধ। এটা বন্ধ করতে হলে রাজনৈতিক ও নাগরিকদের সমন্বয়ে সিদ্ধান্ত আসতে হবে। আমরা শুধু নগরীতে কিছু সড়কে ওদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছি। এটা সমাধান নয়। এ ব্যাপারে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার ও অতিরিক্ত আইজিপি শাহাবুদ্দিন খান বলেন, নগরীর যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশ দিন-রাত কাজ করছে। ঈদের সময় এ চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এ কারণে প্রতি বছর নগরীর গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি সড়ককে আমরা ওয়ানওয়ে করে দেই। এ বছরও ১৫ রমজানের পর এ কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১  
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT