অবসরে গেলেন বরিশালের আপনজন কার্ডিওলজিষ্ট অধ্যাপক জাকির হোসেন অবসরে গেলেন বরিশালের আপনজন কার্ডিওলজিষ্ট অধ্যাপক জাকির হোসেন - ajkerparibartan.com
অবসরে গেলেন বরিশালের আপনজন কার্ডিওলজিষ্ট অধ্যাপক জাকির হোসেন

3:36 pm , February 23, 2022

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ বিধিনিষেধের চাকুরী জীবন শেষ হয়েছে। এখন আরো বেশি রোগীর সেবায় মগ্ন হবেন ডা. জাকির হোসেন। গত মঙ্গলবার বরিশাল শের-ই বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেন অবসরে গেছেন। শেষ কর্মদিবস শেষে সহকর্মী চিকিৎসক, নার্স, হাসপাতালের কর্মকর্তা কর্মচারী, কলেজ ও হাসপাতাল প্রশাসনের সহযোগিতা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরন করে সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এ সময় ডা. জাকির বলেন, শিক্ষক ও চিকিৎসক হিসেবে একই প্রতিষ্ঠানে পচিশ বছর শিক্ষকতা করা গর্বের বিষয়। আমার আনন্দ হচ্ছে এই পচিশ বছরে প্রায় পাঁচ হাজার চিকিৎসক তৈরির পিছনে আমার সম্পৃক্ততা আছে, যাদের অনেকেই দেশ বিদেশে প্রতিষ্ঠিত।
তিনি জানান, ১৯৮৫ সালের ১৮ নভেম্বর তিনি প্রথম ইন সার্ভিস ট্রেইনি হিসেবে শেবাচিম হাসপাতালে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে ইউনিয়ন সাব সেন্টার, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, বরিশাল জেলা সদর হাসপাতালের চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য যোগদান করেন জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটে। সেখান থেকে কার্ডিওলজি পড়া শেষ করে ১৯৯৬ সালের নভেম্বর মাসে রেজিস্ট্রার কার্ডিওলজি হিসেবে পুনরায় শেবাচিম এ যোগদান করেন তিনি। এ সময় তার সুযোগ ছিলো উচ্চতর শিক্ষায় বিদেশে পড়াশুনা ও চাকুরীর। অন্য জেলা, এমনকি রাজধানী ঢাকাতেই অবস্থান করার সুযোগ হাতছাড়া করেছেন বহুবার। শেবাচিমে শুরু ও শেবাচিমেই শেষ। একই প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতি প্রাপ্ত হয়ে সহকারী, সহযোগী শেষে পূর্ণাঙ্গ অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০১৪ সাল থেকে কার্ডিওলজি বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে গেছেন।
গত ৩৫ বছর তিন মাসের এই কর্মজীবনে তিনি হেঁটেছেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। কাছ থেকে দেখেছেন গ্রামীণ জনপদের সাধারন মানুষের কঠিন জীবন যাপন।
ডা: জাকির বলেন, ১৯৮৬/৮৮ ঐ সময়ের চিত্র খুবই কষ্টকর। কাঁচা সড়কে মাইলের পর মাইল হেঁটে রোগী দেখা। ৮৮ তে আমি ভোলার একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্ব পালন করেছি। তখন খুব ডায়রিয়া প্রকোপ দেখা দিয়েছিলো। ভোলার দক্ষিণ দিঘলদীর একটি মাদ্রাসায় ক্যাম্প করা হয়েছিলো। মহামারী পরিস্থিতির ভয়াবহতা এতোটাই যে স্বয়ং রাষ্ট্রপতি ছুটে এসেছিলেন। আর্মি মেডিকেল টিম এসে সাহায্য করেছিল। মহামারী মোকাবেলায় সফল হয়েছিলাম। প্রশংসা কুড়িয়েছিলাম। এটা একটা স্মৃতি যা মনে দাগ কেটেছিল।
আরেকটি ঘটনা আছে, অনেক সময় এমনও রোগী আমাদের কাছে এসেছে যাদের কিছু রোগ জন্মগত সমস্যা। এরকম একটি মজার ঘটনা। একজন মেয়ে রোগীর হার্টের ভাল্ব সমস্যা দেখা দিলে রোগীর স্বামী গোপনে এসে জানতে চান – রোগটি জন্মগত না বিয়ের পর হয়েছে আসলে তাদের তখন মাত্রই বিয়ে হয়েছে। বিয়ের দু-তিন মাসের মধ্যেই এ সমস্যা দেখা দেয়। স্বামীটির প্রশ্ন শুনে আমি হতচকিত হয়েছিলাম। পরে অবশ্য বুঝিয়ে তার উৎকণ্ঠা দূর করতে পেরেছিলাম। ঐ রোগী সুস্থ হয়ে পরে এসে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। যেটা খুব ভালো লেগেছে।
ডা. জাকির বরিশালেই থেকে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে বলেন, আমার মায়ের জন্য। আমার মা তার সারাটা জীবন সন্তানদের ভালোর জন্য উৎসর্গ করেছেন। তাই আমিও মাকে ছেড়ে কোথাও যেতে রাজী হইনি।
যদিও ডা. জাকিরের জন্মস্থান বরিশাল নয়। তিনি ১৯৬৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার কাপাসিয়া থানা সদরে জন্মগ্রহণ করেন। সে হিসেবে বুধবার জন্মদিন ছিলো ডা. জাকির হোসেনের। তার বাবা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মো. আমজাদ আলী ছিলেন কাপাসিয়া থানার ওসি। বাবার পুলিশে চাকুরীর সুবাদে ঘুরে বেড়ানো জীবন ডা. জাকির ও তার ১০ ভাই বোনের। চার ভাই ও ছয় বোনের মধ্যে তিনি ষষ্ঠ সন্তান। টাঙ্গাইলের আদালত পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় হয়ে শিবচর থানা, কালকিনী, মকসুদপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন তিনি। এরপর ৭১ সালে বাবা আমজাদ আলীকে কালকিনি থানা থেকে হঠাৎ বদলী করা হয় তখনকার ফরিদপুর জেলার মোকশেদপুর (বর্তমানে গোপালগঞ্জে)। এটা ছিলো শাস্তিমূলক বদলী। শাস্তি দেয়ার কারণ ছিলো ঐ সময়ে ছাত্র আন্দোলনে, মুক্তিকামীদের সহযোগিতা করা। এখানে বাবা এসবিতে ছিলেন এবং বাবাকে তথ্যপাচারের অভিযোগে পাক সরকার গ্রেফতার ও বন্দি রেখে নির্মম নির্যাতন করে বেশ কয়েকবার। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ওরা বাবাকে নজরদারিতে রাখলেও জুন মাসে কৌশলে বাবা আমাদের বরিশাল পাঠিয়ে দেন। বড়ভাই ও মেজভাই পড়াশুনার কারণে আগে থেকেই বরিশালে ছিলেন। আমরাও চলে আসি। কিন্তু বাবা থেকে যান। বাবা ঐ সময় আমাদের ভুরঘাটা ব্রীজ পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যান। ওটাই ছিল বাবার সাথে আমাদের শেষ দেখা। শিবচর ও কালকিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থাকাকালে ছাত্র আন্দোলনে সহযোগিতা , নির্বাচন কালীন পাক পন্থীদের সহযোগিতা না করা ,স্থানীয় স্বাধীনতাকামী এবং পরবর্তীতে মুকসুদপুর থানায় কর্মরত কালীন মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য সহযোগিতা ও বিভিন্ন তথ্য দেওয়ার কারনে ১৯৭১ সালের ৯ আগষ্ট মুক্তি যোদ্ধাদের একটি দল থানা আক্রমনের প্রাক্কালে পাক সেনা এবং রাজাকারেরা বাবাকে প্রত্যুষে থানার বাহিরে অবস্থিত ভাড়া বাসা থেকে নিয়ে যায় এবং নির্মম ভাবে হত্যা করে বলে তৎকালীন স্থানীয় তথ্য এবং তখনকার ফরিদপুরের পুলিশ সুপার কাছ থেকে জানা যায়। আমরা বাবার লাশও পাইনি । তবে তৎকালীন স্থানীয় কিছু তথ্য মতে থানার ভিতরের কোন স্থানে বা বাহিরে বাবাকে দাফন করা হয় বলে শুনেছি যা নির্ভরযোগ্য নয় ।
বরিশাল এসে নব আদর্শ প্রাইমারী বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। এরপর বিএম স্কুল থেকে ১৯৭৭ সালে এসএসসি এবং ১৯৭৯ সালে বিএম কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করে ১৯৮০ সালের জানুয়ারীতে শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস পড়ায় যুক্ত হই। বাবা না থাকায় ঐ সময় মায়ের উপর খুব চাপ তৈরি হয়েছিলো। তারপরও মা আমাদের সব ভাইবোনকে কঠিন নিয়ন্ত্রণে রেখে পড়াশুনা করিয়েছিলেন। মায়ের ঐকান্তিক চেষ্টার পাশাপাশি আত্মীয় স্বজনই শুধু নয়, বলতে হয় পুরো বরিশালবাসী আমাদের পাশে থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। বিশেষ করে বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম শেখ কুতুবউদ্দিন আহমেদ ও তার বন্ধু সহযোদ্ধাদের কাছে অসংখ্য কৃতজ্ঞতা আমাদের। বরিশালের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নেতৃবৃন্দ, প্রফেসর মোহাম্মদ হানিফ স্যারসহ আরো কৃতজ্ঞতা আমার স্কুল শিক্ষক গফুর মোল্লা স্যার, নরেন স্যার, পিকে সেন স্যার, সাবের স্যারের প্রতিও। তারা আমাকে সবসময় আগলে রাখতেন। তাদের ভালোবাসাই আমাকে ডাক্তার হতে সাহায্য করেছে।
আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া আমি আমি আমার চাকুরী জীবনের সবসময় মায়ের পাশে থাকতে পেরেছি। মা গতবছর ২৩ জুলাই ৯১ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেছেন। মায়ের শেষ সময়ে তাঁর পাশে থাকতে পারাটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি বলবো আমি।
অবসর জীবনে অধ্যাপনা ও সমাজ সেবায় ব্যস্ত থাকবেন জানিয়ে ডাক্তার জাকির হোসেন বলেন, এটা এমন এক পেশা, যেখানে চাইলেও কেউ অবসর নিতে পারেনা। কেননা এরপর সাউথ এ্যাপোলো মেডিকেল কলেজের শিক্ষকতা ছাড়াও জনসেবা জাতীয় সামাজিক কার্যক্রমে যুক্ত থাকার ইচ্ছে আমার। আর রয়েছে রোগীদের প্রতি ভালোবাসা। যে কারণে অনেক রোগী ও স্বজনদের সাহায্য সহযোগিতা করতে হয় । কর্মজীবনে ডা. জাকির বরিশাল হার্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি এবং ডায়াবেটিস সমিতির যুগ্ম সম্পাদক দায়িত্ব পালন করছেন দীর্ঘ সময়। এছাড়াও বর্তমানে বরিশালের অন্যতম প্রাইভেট হাসপাতাল বেলভিউতে নিয়মিত রোগী দেখেন তিনি।

এই বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১  
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT