ইলিশ শিকার-বিপননে নিষেধাজ্ঞা শেষ, ২২ দিনে ৬৬ লাখ টাকা জরিমানা আদায় ইলিশ শিকার-বিপননে নিষেধাজ্ঞা শেষ, ২২ দিনে ৬৬ লাখ টাকা জরিমানা আদায় - ajkerparibartan.com
ইলিশ শিকার-বিপননে নিষেধাজ্ঞা শেষ, ২২ দিনে ৬৬ লাখ টাকা জরিমানা আদায়

2:49 pm , October 25, 2021

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ প্রজনন নির্বিঘœ করার মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশে ইলিশ-এর আহরন, পরিবহন ও বিপননে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা উঠে গেল গত মধ্যরাতে। নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হয়ে আসায় গত কয়েকদিন ধরেই দক্ষিণাঞ্চল সহ উপকুলে ইলিশ আহরনে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে জেলেরা। দক্ষিনাঞ্চলের সব জেলে পল্লী ও ইলিশ মোকামগুলো আবার প্রাণ চাঞ্চল হয়ে উঠছে। জাল মেরামত সহ সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহন করে মঙ্গলবার সকাল থেকেই জেলেরা তাদের নৌকা ভাসানোর অপেক্ষার প্রহর গুনছে। তবে আগামী ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সারা দেশে ইলিশ পোনাÑজাটকা আহরন ও বিপননে ৮ মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হচ্ছে। এ সময়ে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ৬টি অভয়াশ্রমে পর্যায়ক্রমে দুই মাস করে সব ধরনের মৎস্য আহরনে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি সারা দেশে অনুর্ধ্ব ১০ ইঞ্চি পর্যন্ত জাটকা আহরন নিষিদ্ধ থাকবে।
মা ইলিশের অত্যাধিক প্রাচুর্য থাকায় গত ৪ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে ভোলার পশ্চিম আউলিয়া পয়েন্টÑতজুমদ্দিন, মনপুরা দ্বীপ, পটুয়াখালীর কলাপাড়ার লতাচাপলি পয়েন্ট-এর ধলচর দ্বীপ, মৌলভীরচর দ্বীপ ও কালিরচর দ্বীপ, মায়ানী পয়েন্টÑমীরসরাই ছাড়াও কুতুবদিয়া পয়েন্ট এলাকার ৭ হাজার বর্গ কিলোমিটারে ২২ দিনের জন্য সব ধরনের মৎস্য আহরন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।
এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর ৭টি সমর নৌযান ছাড়াও কোষ্ট গার্ড, পুলিশ ও র‌্যাব সহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলাÑউপজেলা প্রশাসন মৎস্য বিভাগের সাথে নানামুখি ১৭ হাজার অভিযান ও দুই হাজার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে।
নিষেধাজ্ঞার এ সময়ে আইনÑশৃংখলা বাহিনী ও প্রশাসনের অভিযানে প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের সাড়ে ৯ লাখ মিটার নিষিদ্ধ জাল ছাড়াও ৩৩ টন ইলিশ উদ্ধার হয়। পাশপাশি আড়াই হাজার জেলেকে কারাদন্ডাদেশ দেয়া হয়েছে। জরিমানা আদায় হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ টাকা। এ সময়ে নিষিদ্ধ নৌকা সহ বিভিন্ন মৎস্য আহরন সরঞ্জাম নিলামে বিক্রি করে সরকারী কোষাগারে প্রায় ৬ লাখ টাকা জমা করা হয়েছে।
‘হিলসা ফিসারিজ ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্লান’র আওতায় ২০০৫ সালেই ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে ১০ দিন, ২০১১ সালে ১১ দিন, ২০১৫ সালে ১৫ দিন ও ২০১৬ সালে থেকে ২২ দিন ইলিশ আহরন নিষিদ্ধ করে সরকার। এসব বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ গ্রহনের ফলে দেশে ইলিশের উৎপাদন নিকট অতীতের ১.৯৮ লাখ টন থেকে বর্তমানে সাড়ে ৫ লাখ টনের উপরে উন্নীত হয়েছে। যার ৬৬Ñ৭০% ইলিশ উৎপাদন হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী বছর দুয়েকের মধ্যে জাতীয় এ মাছের উৎপাদন ৬ লাখ টন অতিক্রম করতে পারে বলেও মনে করছেন একাধিক মৎস্য বিশেষজ্ঞ।
বাংলাদেশের ইকোসিষ্টেমে সারা বছরই ৩০% ইলিশ ডিম বহন করে এবং পরিপক্ক হয়ে ডিম ছাড়ে। যে ডিমগুলো পুরুষ ইলিশ দ্বারা নিষিক্ত হয়ে থাকে, তা নতুন প্রজন্ম গঠন করে। মৎস্য গবেষনা ইনষ্টিটিউট-এর গবেষনায় দেখা গেছে, ২০১৮-এর ৭Ñ২৮ অক্টোবর আহরন বন্ধ থাকাকালে উপকূলের প্রজননস্থল সহ অভ্যন্তরীন মূক্ত জলাশয়ে ৪৮% মা ইলিশ ডিম ছাড়ার সুযোগ পেয়েছে। ইনস্টিটিউট-এর মতে প্রজননক্ষম মা ইলিশের হার ২০১৭ সালে ৭৩% থেকে ’১৮ সালে ৯৩%-এ উন্নীত হয়। পাশাপাশি এ সময়ে প্রজনন সাফল্য ৮০%-উন্নীত হয়। ইলিশ আহরন নিষিদ্ধের ফলে ঐ সময়ে দেশে ৭ লাখ ৬ হাজার কেজি উৎপাদিত ডিমের ৫০%-এর সাফল্যজনক পরিস্ফুটন সহ তার ১০% বেঁচে থাকলেও ইলিশ পরিবারে নতুন ৩ হাজার কোটি জাটকা যূক্ত হয়।
আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে ইলিশের একক অবদান এখন ১%-এর বেশী। আর মৎস্য খাতে অবদান প্রায় ১২.৫০%।
অভিপ্রয়াণী মাছ ইলিশ প্রতিদিন ¯্রােতের বিপরীতে ৭১ কিলোমিটার পর্যন্ত ছুটে চলতে সক্ষম। জীবনচক্রে স্বাদু পানি থেকে নোনা পানিতে এবং সেখান থেকে পুনরায় স্বাদু পানিতে অভিপ্রয়ান করে এ মাছ। উপকুলের ৭ হাজার বর্গ কিলোমিটারের মূল প্রজনন ক্ষেত্রে মূক্ত ভাসমান অবস্থায় ছাড়া ডিম থেকে ফুটে বের হয়ে ইলিশের লার্ভা, স্বাদু পানি ও নোনা পানির নার্সারী ক্ষেত্রসমুহে বিচরন করে খাবার খেয়ে বড় হতে থাকে। নার্সারী ক্ষেত্রসমুহে ৭Ñ১০ সপ্তাহ ভেসে বেড়াবার পরে জাটকা হিসেব সমুদ্রে চলে যায়। বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন এলাকায় ১২Ñ১৮ মাস অবস্থানের পরে পরিপক্ক হয়েই পূর্র্ণাঙ্গ ইলিশ হিসেবে প্রজননের লক্ষ্যে আবার স্বাদু পানির নার্সারী ক্ষেত্রে ফিরে এসে ডিম ছাড়ে।ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্র ও মাইগ্রেশন পথ নির্বিঘœ রাখা সহ সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের মজুদ ও জীব বৈচিত্রকে সমৃদ্ধ করতে ২০১৯-এর ২৬ জুন হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপ সংলগ্ন ৩ হাজার ১৮৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকাকে দেশের প্রথম ‘সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা বা মেরিন রিজার্ভ এরিয়া’ ঘোষণা করা হয়েছে। গত ২২ দিন ইলিশ আহরনে বিরত জেলে সম্প্রদায়ের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০ কেজি করে চাল প্রদান করা হয়েছে। শুধুমাত্র বরিশাল বিভাগের সাড়ে ৩ লাখ জেলের মধ্যে ৩ লাখ ৭ হাজার ১২৪ জনকে প্রায় ৭ হাজার টন চাল বিতরন করা হয়েছে বলে মৎস্য অধিদপ্তর জানিয়েছে।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT