উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় আগামীর বরিশাল নগরী কেমন চাই? উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় আগামীর বরিশাল নগরী কেমন চাই? - ajkerparibartan.com
উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় আগামীর বরিশাল নগরী কেমন চাই?

3:04 pm , October 3, 2021

কাজী মিজানুর রহমান ॥ উন্নয়নের গতির সাথে আমাদেরকেও তাল মিলিয়ে পা ফেলতে হবে। আমরা পিছিয়ে পড়তে চাই না। আগামীর ভবিষ্যৎ শিশু, কিশোর, তরুনদের জন্য সৌন্দর্যময়, উন্নত নাগরিক সুবিধা সম্পন্ন বরিশাল নগরী রেখে যেতে চাই। সুকান্তের কথার প্রতিধ্বনি করে আমরাও বলি –
‘এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান;
জীর্ন পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ -পিঠে
চলে যেতে হবে আমাদের।
চলে যাব তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রান
প্রানপনে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাস যোগ্য ক’রে যাব আমি —-
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অংগীকার।’
আমাদেরকে নারী ও শিশুবান্ধব নগরী গড়ে তুলতে হবে। এই কোভিড প্রজন্মই হবে আগামি দিনের দেশের কা-ারি।তবে তাদের বর্তমানকে উপেক্ষা করা যাবেনা।
এই প্রেক্ষাপটে আমি একজন সাধারন নাগরিক হিসাবে কিছু স্বপ্ন, ইচ্ছা প্রকাশ করছি। অসম্পূর্ণ অংশ কেউ পূরণ করবেন এটা প্রত্যাশা। নীতি নির্ধারক, জনপ্রতিনিধি, সরকারি দপ্তর, বিশেষজ্ঞ, নগর পরিকল্পনাবিদগণ আমার প্রস্তাবনার ত্রুটি ও দুর্বল দিকগুলি চিহ্ণিত করে একটি পূর্নাংগ ভবিষ্যত পরিকল্পনা প্রনয়ন করে অনেকের মত আমার জন্মস্থান প্রাণপ্রিয় বরিশাল নগরীকে পরিবেশবান্ধব আধুনিক, আকর্ষনীয় বসবাস উপযোগী করে গড়ে তুলবেন এই কামনা।
প্রথমেই আসবে নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং নগর পরিকল্পনা। এক সময়ের নদী, খাল, পুকুর, মাঠ, দিঘী, বৃক্ষরাজি, ঝাউ, পাম গাছের সুশোভিত নগরে সবুজ ক্রমেই কমে যাচ্ছে, তৈরি হচ্ছে ধুসর, কংক্রিটের জঞ্জাল।
উজানে নদীর উৎস মুখে প্রবাহ নিয়ন্ত্রনের কারনে কীর্তনখোলা তার ধারন ক্ষমতা, স্রোত দুইই হারাচ্ছে, পলিথিন, প্লাস্টিক এখন গলার কাটা। নদী এবং পরিবেশ রক্ষায় পলিথিন, প্লাস্টিক রিসাইকেল এবং পচনশীল বিকল্প ব্যবহারে অভ্যস্থ হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। পলিথিন, প্লাস্টিক এর কঠিন স্তর কেটে নাব্যতা রক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তি সহায়তায় কার্যকর ক্যাপিটাল ড্রেজিং অপরিহার্য। তাছাড়া নদীভাংগন রোধে গবেষনার মাধ্যমে সমন্বিত মহাপরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি।
পানিতে লবনাক্ততার আগ্রাসন, বাড়ছে দূষণ।
পরিকল্পনাবিদদের হতে হবে পরিবেশ ও নিসর্গের প্রতি সংবেদনশীল। আমরা ইতোমধ্যেই ‘বিশ্ব বাস্ততন্ত্র পূনরুদ্ধার দশক’ ২০২১ এ পা রেখেছি। পরিবেশ প্রতিবেশ রক্ষায় সুনির্দিষ্ট পথ নকশা প্রনয়ন করে আগাতে হবে। লোকায়ত জ্ঞান এবং স্থানীয় সংরক্ষন পদ্ধতিকে গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নাই। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং আগ্রহী এনজিওর নিয়মিত গবেষণালব্ধ ফলাফলের ভিত্তিতে স্বল্প, মধ্যম এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা সুফল আনতে পারে। অনুদান, অর্থায়নের মাধ্যমে এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানের জ্ঞানলব্দ সেবা নেওয়া সম্ভব হলে তা সকলের জন্য বিশেষত জলবায়ু বিপর্যয়ের কারনে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ন উপকূলীয় এলাকা দেশের দক্ষিন পশ্চিমাঞ্চলের জন্য কল্যাণকর হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, ঊপকূলীয় এলাকার মানুষকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করে বাঁচতে হয়। আইলা, বুলবুল, সিডর, আমফান, ইয়াস এখন প্রায় নিয়মিতই আঘাত হানছে। সাড়া পৃথিবীর সাইক্লোনজনিত পাঁচটি মৃত্যুর চারটির কারন বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঝড়। জীবন ও জীবিকার জন্য সম্পদ ও অবকাঠামো হারিয়ে উদ্বাস্ত হচ্ছে উপকূলীয় এলাকার মানুষ।এর চাপ পড়ছে শহর ও নগরে, যা ধারন ক্ষমতার বাইরে।
সুউচ্চভবন আর আলোঝলমল বিপনিবিতান শহরের সৌন্দর্য নয়, নগরীর কত অংশ সবুজ, কতটা পরিবেশবান্ধব সেটাই গুরুত্বপূর্ন। এধৎফবহ ঈরঃু ঈড়হপবঢ়ঃ একটি সুন্দর লক্ষ্যমাত্রা হতে পারে। সার্বিক ভাবে কৃষি, ভূমি, মৎস্য, বন বিভাগ এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের অধিকতর দায়িত্বশীল আচরন কাম্য, একইসাথে পরিবেশ আদালতের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। নগরীর সার্বিক নিরাপত্তার জন্য জনবান্ধব পুলিশের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নগর পরিকল্পনার উদ্যেশ্যকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়।
১। নগরের সৌন্দর্য,
২। নাগরিকের সুযোগ সুবিধা, এবং
৩। জনস্বাস্থ্য।
নগরের সৌন্দর্য নগরবাসীর রুচিবোধের পরিচয় বহন করে। সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও সুপরিকল্পিত নগরী গড়ে তোলা পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান শর্ত।
পর্যটন কর্পোরেশনের সুদৃষ্টি এলাকার প্রতি ভ্রমন পিপাসুদের আকৃষ্ট করতে পারে। মোটেল, হোটেল নির্মান, স্টীমারে নৌভ্রমণ, বিভাগের সকল ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থানের জনবান্ধব উন্নয়ন এবং সহজ যোগাযোগ বরিশালকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে। মানসম্মত তারকা হোটেল, জিমনেশিয়াম এবং সুইমিংপুলের অভাবে বরিশাল আন্তজার্তিক খেলা আয়োজন থেকে বঞ্চিত। একটি বিভাগীয় শহরের বাসিন্দাদের জন্য এটা লজ্জাজনক, কষ্টদায়ক। এর থেকে পরিত্রানের উপায় খোঁজা অতি জরুরি। বরিশাল বিকেএসপি’র কার্যকলাপ আশাব্যঞ্জক নয়, একে নতুন করে জীবন দিতে হবে। প্রকৃতপক্ষে একটি আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন ক্রীড়া কমপ্লেক্স বিভাগীয় নগরের জন্য মানানসই।
নগর পরিকল্পনা ২০১১ খৃস্টাব্দ অনুযায়ী বরিশাল মেট্রোপলিটন সিটি নগরীর সংশোধিত আয়তন প্রায় ৫৮ বর্গ কিলোমিটার। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে নগরীর আয়তন হবে বর্তমান আয়তনের প্রায় দ্বিগুন। আমাদের ভূমি সীমিত তাই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বর্তমান শহরকে রেখেই পরিকল্পিত উপায়ে নগর সম্প্রসারন করতে হচ্ছে। কিন্তু জমির শ্রেণী চরিত্র যথাসম্ভব পরিবর্তন না করার আইনটি মাথায় রেখেই নি¤œভূমি, জলাশয়, খাল, পুকুর, নদী রক্ষা করেই উন্নয়ন করতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমাতে হলে বৃষ্টির পানিসহ ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের পানি ব্যবহারের উপর জোর দিতে হবে। কীর্তনখোলাসহ খালগুলো পূনরুদ্ধার, খনন, রক্ষণাবেক্ষনের মাধ্যমে প্রবাহমান করে পুকুর, জলাশয়ে জোয়ার এবং বর্ষার পানি সংরক্ষনের উদ্যোগ সুফল বয়ে আনবে। ভবিষ্যৎ নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় বরিশালে তিন হাজার পুকুর সংরক্ষনের কথা বলা হয়েছে, যদিও বাস্তবে এই সংখ্যক পুকুরের অস্তিত্ব নেই। এক্ষেত্রে করনীয় নির্ধারন জরুরি। ইতোমধ্যে নগরের অধিকাংশ পুকুর ভরাট হয়ে গেছে, এতে অনেক বাস্ততন্ত্র ধ্বংস হয়েছে। অবশিষ্ট পুকুর অধিগ্রহন করে চতুর্পাশে পার্কের ন্যায় বিনোদন কেন্দ্রে গড়ে তোলা যায়। রাজশাহীতে ২০টি পুকুর অধিগ্রহন করে এমন প্রকল্প নেয়া হয়েছে । ভবিষ্যতে ব্যক্তির প্রয়োজনে পুকুর ভরাট করে ভবন নির্মিত হলে কিছু করনীয় থাকবেনা।
পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ‘নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’। দরকার নিরাপদ ও সুষম নগর তৈরীর জন্য জাতীয় নগর নীতিমালার অনুমোদন। একই সাথে দরকার সঠিক পরিকল্পনা, তদারকি এবং সরকারী উন্নয়ন সহায়তা। এ দুটির অভাবে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নগরীর কয়েক লক্ষ বাসিন্দা নাগরিক সুযোগ সুবিধার কাঙ্ক্ষিত মানের অবর্তমানে মনঃকষ্টে ভুগছে। নগরবাসী আশা করছে এ বছর প্রকল্পগুলি অনুমোদন পেয়ে অর্থ বরাদ্দ আসবে, পূরণ হবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য।
একটি নগর সুপরিকল্পিত হলে ঐ নগরের অধিবাসীগণ তাদের দৈনন্দিন চাহিদা ও উপযোগীতার ক্ষেত্রে বেশী সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে পারে। এক্ষত্রে সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি নাগরিকের দ্বায়িত্ববোধের কথা আমরা ভুলে যাই। নাগরিকগনকেও প্রচলিত আইন-কানুন, আচরনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
প্রথমেই পরিকল্পিতভাবে নগরের বর্তমান এবং বর্ধিতাংশের ভূমির সুষম ব্যবহারের কথা আসবে। নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল অবশ্যই নগরীর শেষ প্রান্তে, দূরে কোথাও সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। ফাঁকাস্থানে একটি পরিবেশ বান্ধব পার্ক/উদ্যান নির্মান নগরীর মর্যাদা এবং নগরবাসীর রুচি বোধের পরিচয় বহন করবে এবং এটা হবে বরিশালের ফুসফুস।
ট্রাক টার্মিনালের অভাব দীর্ঘদিনের। দুর্ঘটনা কমাতে, চলাচল নিরাপদ রাখতে ব্যস্ত সড়কে ওভারপাস, আন্ডারপাস এর দাবী উঠেছে অনেক আগেই।
বাস্তবে নাগরিকের নিরাপত্তায় আরও আগে থেকেই নগরীর নথুল্লাবাদ, হাতেম আলী কলেজ চৌমাথা, রুপাতলি সহ অন্তত ৪টি স্থানে এর প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে।
সরু রাস্তাঘাট, মারাত্মক দুর্ঘটনা, যোগাযোগ সমস্যা সৃষ্টি করে। জরুরি প্রয়োজনে ফায়ার সার্ভিস, এম্বুলেন্স সেবা গ্রহনে বিপত্তি ঘটায়। ফলে জানমালের হানি হয়। এ থেকে উত্তরনের উপায় খোঁজা দরকার। ১০-১২ তলা উঁচু ভবনে দুর্ঘটনায় উদ্ধার কার্যের জন্য ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়ানোর সময় এসেছে।
অপরিকল্পিত পরিবহণ সময়ক্ষেপণ এবং জরুরি কাজে সমস্যা, কর্মঘন্টা নষ্ট করে। পরিবহন নীতিমালা থাকলে মানুষ নির্বিঘেœ চলাফেরা করতে পারে। রাস্তার আয়তনের ভিত্তিতে যান চলাচল নিয়ন্ত্রন করা প্রয়োজন। অন্যথায় বিরক্তি এবং কর্মঘন্টা নষ্ট হতেই থাকবে, চলবে নাগরিক দুর্ভোগ । একটি সুবিন্যস্ত সড়ক ব্যবস্থা জনমনে বিশেষ প্রভাব ফেলে, বিশেষত আগন্তকের উপর। আধুনিক ও আরামদায়ক পরিবহন ব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এই বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT