উন্নয়নের অগ্রধারায় আগামীর বরিশাল নগরী কেমন চাই? উন্নয়নের অগ্রধারায় আগামীর বরিশাল নগরী কেমন চাই? - ajkerparibartan.com
উন্নয়নের অগ্রধারায় আগামীর বরিশাল নগরী কেমন চাই?

3:14 pm , October 2, 2021

কাজী মিজানুর রহমান ॥ ধান, নদী, খাল এই তিনে বরিশাল। কীর্তনখোলার তীর ঘেষে ছায়া সুনিবিড় সবুজ ঝাউ, পামগাছের সারি, নদীতে পাল তোলা নৌকা, জেলেদের মাছ ধরা, ভাসমান বেদে, সবুজের সমারোহ, স্টীমারের হুইসেল, কুয়াশা ঢাকা ভোর, ঝিরিঝিরি বাতাস, নদীতে ঢেউয়ের খেলা এমন সব স্নিগ্ধ দৃশ্যপট মনে ভেসে উঠে জীবনানন্দ দাশের রুপসী বাংলা কবিতার মতো, কেউ কেউ বলেন ‘বাংলার রানী। কাজী নজরুল ইসলাম মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন প্রাচ্যের ভেনিস।
বলতে বলতে আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করে ফেলেছি। আমাদের অনেকে ভাগ্যবান প্রজন্ম। যারা স্বাধীনতা দেখেছি, দেশের সুবর্নজয়ন্তীতেও জীবিত আছি।
কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে বরিশাল তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।
নগরীর পরিবেশ, ইতিহাস, ঐতিহ্য রক্ষা করে কি করে পরিকল্পিত ভাবে বরিশালকে একটি উন্নত, আধুনিক, সবুজ নগরীতে রুপান্তর করা যায় সেটাই সকল নাগরিকের ভাবনা।
বাংলাদেশ ক্রমেই অর্থনৈতিকভাবে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। অনুন্নত দেশের তকমা খুলে এখন উন্নয়নশীল দেশের দ্বারপ্রান্তে। রুপকল্প -২০২১ এর সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছি। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ক্ষুধা- দারিদ্রমুক্ত কাঙ্ক্ষিত,স্বপ্নের উন্নত সমৃদ্ধ দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্যে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বিগত একযুগে আমরা উন্নয়নের সকল সূচকে অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধন করেছি। অর্থনৈতিক অগ্রগতির মানদন্ডে বিশ্বের প্রথম ৫টি দেশের মধ্যে স্থান করে নিয়েছি। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের ৪১ তম অর্থনীতির দেশ। আমাদের মাথাপিছু আয় ২২২৭ ডলারে উন্নীত হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় নিকট অতীতে জনগন এবং সরকারের আগ্রহে এখানে বিশ্ববিদ্যালয়, শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত সেতু (কীর্তনখোলা ব্রীজ) লেবুখালি শেখ হাসিনা পায়রা সেতু, মেরিন একাডেমী, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, শেখ হাসিনা ক্যান্টনমেন্ট, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার, ক্যান্সার হাসপাতাল, সুকান্তবাবু শিশু হাসপাতাল, শিল্পকলা একাডেমী ভবন ও অডিটোরিয়ামসহ অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, উঠছে। ফলে এখানকার অধিবাসীদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি জীবনজীবিকায় লক্ষণীয় পরিবর্তন আসবে।
এর বাইরে বরিশালে শিক্ষা নগরী তথা সুচিকিৎসা এবং প্রযুক্তি নির্ভর কর্মক্ষম দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হলে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়, ব্লু ইকোনোমি বা সমুদ্রবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি!
ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যার বেশী অংশ কর্মক্ষম থাকার সুবিধা কাজে লাগাতে কাজের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।মানব সম্পদের দক্ষতা বাড়ানো না গেলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা পাওয়া যাবে না। সময় এসেছে দেশী-বিদেশি চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ, আধা দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে জীবন ও কর্মঘনিষ্ঠকার্য প্রশিক্ষন প্রতিষ্ঠান/ইন্সটিটিউট বরিশালসহ সারাদেশ ব্যাপী স্থাপনের উদ্যোগ নেয়ার।মাধ্যমিকের পরে যুব জনগোষ্ঠীকে দুই বছরের হাতেকলমে বাস্তব, কারিগরী প্রশিক্ষণ যেমনঃ ফায়ার ফাইটার, ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট, সিকিউরিটি,ফাস্টএইড, ইটের ব্লক তৈরি, কৃষিযন্ত্র ব্যবহার, আইটি সহ শিল্পের প্রয়োজনে বাস্তবমুখী ট্রেনিং, সাথে একাধিক ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা রাখলে বেকার সমস্যা দূরীভূতকরণের পাশাপাশি দেশে- বিদেশে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে,সম্ভব হবে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন। মানসম্মত শিক্ষিত, দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা গেলে দেশ উন্নয়নের পথে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
এক্ষেত্রে প্রথমেই প্রয়োজন সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দেশে বিদেশে চাহিদা নিরুপন, সিলেবাস প্রণয়ন এবং দক্ষ প্রশিক্ষক তৈরি। প্রশিক্ষণ কেন্দ্র শহরতলী, উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায় হতে পারে। বাস্তবধর্মী এই প্রশিক্ষনে প্রশিক্ষণার্থীদের বিপুল সাড়া পাওয়া যাবে। এই কর্মযজ্ঞে টিটিসি, পলিটেকনিক, বিসিক এমনকি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে। দেশব্যাপী মডেল মসজিদকে কেন্দ্র করে যুব ও কিশোরসমাজের নৈতিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষন মূল্যবোধ, মমত্ববোধ, দেশপ্রেম তথা উন্নত মানুষ, উন্নত জাতি গঠনে সহায়তা করবে।
বিপুল সংখ্যক যুবদের কর্মসংস্থান এবং শিল্পায়নের জন্য সুবিধাজনক স্থানে বিশেষত খাস জমিতে একাধিক ইকোনমিক জোন, আইটি ভিলেজ/পার্ক প্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প নাই।দেশী-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে উদ্যোগী হতে হবে। কারন আমাদের দরকার বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
বিসিককে সকল সুযোগ-সুবিধার সমন্বয়ে শিল্প প্রতিষ্ঠার জন্য মানসম্মত হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরীর জন্য এখনই প্রস্তুতি শুরু করা দরকার। একটি চামড়াশিল্পপার্কের প্রয়োজনীয়তাও অনুভূত হচ্ছে। অনেক নতুন উদ্যোক্তা শিল্প প্রতিষ্ঠা তথা দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অংশ নেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বরিশালের আমড়া ও পেয়ারা প্রক্রিয়াজাত কারখানা করা যায় কিনা ভাবলে নতুন দ্বার উন্মোচন হতে পারে।
এ বছরের ডায়রিয়া পরিস্থিতিতে বরিশালে আইইডিসিয়ার এর আদলে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা খুবই অনুভূত হয়েছে।
দেড় কোটি মানুষের প্রানের দাবী, আজন্মলালিত স্বপ্ন, মেগা প্রকল্প ভাংগা-কুয়াকাটা রেললাইন স্থাপনের অগ্রগতি এবং প্রয়োজনীয় বাজেট, বরাদ্দের খবরের জন্য সবাই মুখিয়ে ছিল। এখন আগামী ২০২২ সালে ২৪৪ কিঃমিঃ রেললাইন স্থাপনের কাজ শুরুর অপেক্ষায় দিন গুনছে সবাই।
আমরা জীবনমানে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু স্থানীয় সরকারের আওতায় নগর উন্নয়ন,নাগরিক সুযোগ-সুবিধা এবং পরিবেশ, বিবেচনায় আমরা ক্রমশই দেশের অন্য নগরের উন্নয়নের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছি। পানি উন্নয়ন বোর্ড, বি.আই.ডব্লিউটিএ, প্রশাসন, বন, পরিবেশ অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য বিভাগ, গণপূর্ত, সড়ক, পর্যটনসহ সকল দপ্তরের সমন্বিত কার্যক্রম চোখে পড়ে না। আমাদের রাস্তাঘাট সরু, পয়ঃনিষ্কাশন, জলাবদ্ধতা,নদী-খাল দখল-দূষন, নদীভাঙ্গন, মাদকের ছোবল, সামাজিক অস্থিরতা মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করে তুলছে। মানুষের অপরিণামদর্শী আচরনে প্রাকৃতিক পরিবেশ, সৌন্দর্য, ক্রমশই কমে যাচ্ছে। পার্ক,লাইব্রেরি, খেলার মাঠের অপ্রতুলতা, খোলা জায়গা কম থাকা, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের অভাব, নগরীর মধ্যে কারখানা, পর্যটনের অবহেলা, শব্দদূষন, বায়ুদূষণ যেখানে নিত্যসঙ্গী, কীর্তনখোলার তীর আর বঙ্গবন্ধু উদ্যান ছাড়া নির্মল বাতাসের দেখা মেলা ভার। সবুজ গাছপালা মানুষের মানসিক শান্তি ও সজীবতা ফিরিয়ে আনে, যা নগর স্বাস্থ্যের জন্য খুবই প্রয়োজন। জনসমাগম স্থলে ওয়াশরুম, ফিডিং কর্নার, কর্মজীবী নারী হোস্টেল, শিক্ষার্থীগণের জন্য আবাসিক হল এবং হোস্টেল সুবিধা খুবই কম, এগুলো মানুষের মৌলিক চাহিদা। সবকিছু মিলিয়ে নগরীর পরিবেশ স্বস্তিদায়ক নয়, এটা নাগরিকদের আশাহত করছে। আমরা অন্যদের সাথে সমানতালে এগোতে চাই।
সড়ক দ্বীপে বা মোড়ে বরিশালের ঐতিহ্য ইলিশ, পেয়ারা এবং আমড়ার ভাস্কর্য নগরীর সৌন্দর্য্য বাড়াবে।
নগরীর অনেক রাস্তা, এলাকার নামকরণ হয়েছে গাছের নামে, যেমনঃ আমতলা, বটতলা, বেলতলা, ঝাউতলা। কিন্তু বাস্তবতা হল এই গাছগুলি এখন আর নাই। হয়ত কাটা পড়েছে, নয়ত মারা গেছে। ওই সকল এলাকায় নতুন করে একই গাছ লাগানো হলে নামকরনের স্বার্থকতা যেমন বাস্তব রুপ পাবে বৃদ্ধি পাবে সৌন্দর্য, তেমনি পরিবেশের জন্যও ভাল হবে।
পদ্মাব্রীজ চালু হলে ঢাকা-কুয়াকাটা পথে কোন ফেরী থাকবেনা। অনাগত দিনে বরিশালের বুক চিড়ে ট্রেন চলাচলের স্বপ্নও পূরণ হবে। মহাসড়ক হবে চার লেন, শোনা যায় ছয় লেনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আছে। বাইপাস রোড এবং মেট্রোপলিটন এলাকা নিয়ে আঊটার রিংরোডের আগাম সমীক্ষা ভবিষ্যৎ যোগাযোগকে মসৃণ করবে।
পায়রা সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, কুয়াকাটা পর্যটন কেন্দ্রের কথা মাথায় রেখে অনেকে শিল্প, কলকারখানা স্থাপনার জন্য এতদঞ্চলে জমি ক্রয় করছেন কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে একবার স্থাপন হয়ে গেলে এর কুফল ভোগ করতে হবে অনন্তকাল। এখন থেকেই বিষয়টি সরকারের নজরে আনা বাঞ্ছনীয়। বাণিজ্যিক এলাকা, আবাসিক এলাকা এবং শিল্প কলকারখানার জন্য আলাদা জোন নির্বাচন করতে সঠিক নিয়মনীতি অনুসরন সার্বিকভাবে মঙ্গলজনক। নগরীর জাহাজ নির্মান কারখানাগুলি শহর থেকে দূরে ভাটিতে স্থানান্তর করা পরিবেশের জন্য সহায়ক হবে। আমাদের ফ্লোটিং ডক ফিরিয়ে আনার দাবিতে সোচ্চার হওয়ার সময় এসেছে।
দেশের দীর্ঘতম সেতু বরিশাল-ভোলা সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাই হচ্ছে। সেক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ প্রয়োজন ও বাস্তবতার নিরিখে কর্নফুলির ন্যায় আমাদের কীর্তনখোলা নদীতে ওয়ান সিটি টু টাউন এর আদলে টানেল নির্মানের দাবী উঠতে শুরু করেছে। নদীর ওপাড়ে নতুন উপশহর গড়ে উঠলে বর্তমান নগরীর উপর জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপ সামাল দেওয়া সহজ হবে। এখনই কিছু সরকারি -বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, ভবিষ্যতে আরো প্রতিষ্ঠান গড়ার পরিবেশ গড়ে উঠবে, গড়ে উঠতে পারে ইপিজেড, নতুন নতুন শিল্পকলকারখানা এবং সেটা হবে সকল জনগোষ্ঠীর সুষম উন্নয়ন। চিকিৎসা, শিক্ষা, কমিউনিটি সেন্টার এবং শপিং কমপ্লেক্স এর সুবিধা দিতে পারলে মানুষের চলাচল কমে আসবে, মূল নগরীর উপর চাপ হ্রাসসহ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত, প্রকল্প গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ হলে বরিশালের বিভাগের মানুষের আনন্দ হবে সীমাহীন, আকাশচুম্বি।

এই বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮  
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT