নগরীর মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র “হলি কেয়ার” থেকে যুবকের লাশ উদ্ধার নগরীর মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র “হলি কেয়ার” থেকে যুবকের লাশ উদ্ধার - ajkerparibartan.com
নগরীর মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র “হলি কেয়ার” থেকে যুবকের লাশ উদ্ধার

3:27 pm , August 27, 2021

 

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ নগরীর নবগ্রাম রোডের মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র হলিকেয়ার থেকে এক যুবকের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল শুক্রবার সকালে কেন্দ্রের চতুর্থ তলার মেস থেকে যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই যুবক হলো- চন্দন সরকার (২৫)। আগৈলঝাড়া উপজেলার বড়পাইকা এলাকার চিত্তরঞ্জন সরকারের ছেলে। এদিকে যুবকের স্বজনদের দাবী চন্দনকে মারধর করে হত্যা করা হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের দাবী মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ায় যুবক চন্দন নিজেই আতœহত্যা করেছে। এ বিষয়ে কোতোয়ালি মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শাহজালাল মল্লিক জানান, খবর পেয়ে লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। মৃত ওই যুবকের গলায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। মানসিক ভারসাম্যহীন রোগীকে কেন মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে রাখা হয়েছে সে বিষয়ে কোন জবাব দেয়নি প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, গত ৭ আগস্ট হলি কেয়ার মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে চন্দন সরকারকে দিয়ে যান তার মামা নিবাস মহুরী। এর আগেও চন্দন মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে ছিলেন। চন্দন মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন বলে ওই কেন্দ্রের রোগী এবং দায়িত্বরতরা জানিয়েছেন। কয়েক দিন ধরেই চন্দন নির্ধারিত বিছানায় রাত কাটায়নি। এ নিয়ে রোগীদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার রাতে চন্দন তার নির্ধারিত বিছানায় পশ্চিম দিকে পা দিয়ে শুয়ে পড়েন। এ সময় পাশের রোগী তারিকুল ইসলাম পশ্চিমে পা দিয়ে শুতে বাধা দেন। তখন চন্দন সরকার তারিকুলের মুখে ঘুষি মারেন। এই খবর জানতে পেরে চতুর্থ তলার দায়িত্বে থাকা ভলান্টিয়ার সরোয়ার রাত সাড়ে ১০টার দিকে চন্দনকে এসে মারধর করেন। এমনকি চন্দন যেন কথার অবাধ্য না হন, সে জন্য তার হাত-পা রশি দিয়ে বেঁধে রাখেন।
এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সবাই যে যার মতো ঘুমাতে গেলে রাত তিনটার কিছু সময় পরে রোগীদের চিৎকার-চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে যায়। সবাই জানতে পারেন, চন্দন টয়লেটের ভ্যান্টিলেটরের সঙ্গে গামছা দিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তবে একাধিক রোগী ও স্থানীয়রা দাবি করেছেন, টয়লেটের ভ্যান্টিলেটরের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করা অসম্ভব। চন্দন অনেক লম্বা ছিল। তাকে মেরে ভিন্ন গল্প সাজানো হচ্ছে।
এ বিষয়ে ভলান্টিয়ার সরোয়ার বলেন, রাত সোয়া তিনটার দিকে আমাকে ডেকে জানানো হয় একজন টয়লেটে আত্মহত্যা করেছে। উঠে দেখি চন্দন সরকার গলায় গামছা পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। আমরা তাকে ঝুলন্ত অবস্থা থেকে নামিয়ে মেঝেতে এনে রাখি। বাথরুমে বসে কেউ আত্মহত্যা করতে পারে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে সরোয়ার বলেন, তা বলতে পারব না, তবে লাশ সেখান থেকে উদ্ধার করেছি। ভর্তি রোগীরা অভিযোগ করে বলেন, হলিকেয়ার সেন্টারে মাদকাসক্তি নিরাময়ে কোনো চিকিৎসা হয় না। এখানে কথায় কথায় নির্যাতন করা হয়। আবার ভেতরে যে নির্যাতন হয়, তা পরিবারের লোকজনের কাছে বলতে দেওয়া হয় না। অনেকের হাত-পায়ে নির্যাতনের চিহ্নও রয়েছে। তাদের দাবি, ভলান্টিয়ার সরোয়ার অকথ্য নির্যাতন করেন। এ বিষয়ে অভিযুক্ত সরোয়ার বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে চন্দন সরকার পশ্চিম দিকে পা দিয়ে শুয়ে পড়লে আরেক রোগী তারিকুল তা নিষেধ করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে চন্দন তারিকুলকে ঘুষি মারেন। এ সময় চন্দনকে নিবৃত্ত করতে গিয়ে কয়েকটি ‘চড়’ দিয়েছি। কিন্তু তাকে কোনো নির্যাতন করিনি।
চন্দনের মামা নিবাস মহুরী জানান, তার ভাগ্নে চন্দন দীর্ঘদিন ধরে মাদকে আসক্ত ছিল। পরিবারের পক্ষ থেকে অনেক চেষ্টা করেও মাদক সেবন বন্ধ করা যায়নি। নিরুপায় হয়ে চিকিৎসার জন্য তাকে নগরীর নবগ্রাম রোডের হলিকেয়ার মাদকাসক্তি চিকিৎসা সহায়তা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়।
নিবাস মহুরী আরো বলেন, ভাগ্নেকে যখন এখানে দিয়ে যাই, তখন কোমরের বেল্টটি পর্যন্ত রাখতে দেয়নি। রশি বা গামছা তো দূরের কথা। তাহলে হত্যায় গামছা পেল কীভাবে? প্রশ্ন করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ভোর রাতে হলি কেয়ার থেকে মোবাইলে আমাকে জানানো হয় চন্দন আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু আমি তা বিশ্বাস করি না। আমার ভাগ্নেকে টর্চার করে মেরে ফেলা হয়েছে। এখানে এসে তো লাশও দেখছি না। আত্মহত্যা করলে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করবে। কিন্তু এখানে লাশ পুলিশ উদ্ধার করেনি, হলি কেয়ারের লোকজনই বাথরুম থেকে লাশ ফ্লোরে এনে রেখেছে। এটি হত্যাকান্ড, আমি এই হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।
হলিকেয়ারের ব্যবস্থাপক মাইনুল হক তমাল দাবি করেন, হলিকেয়ার মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে মোট ২৮ জন রোগী ভর্তি ছিল। তাদের মধ্যে একজন মারা গেছে। এখন ২৭ জন রয়েছে। পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে নিয়ে গেছে। মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে মানসিক ভারসাম্যহীন রোগীকে রাখার কোনো বিধান আছে কি না, এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি এর কোনো জবাব দেননি।
এদিকে, শুক্রবার ছিল হলি কেয়ারে চিকিৎসাধীন রোগীর অভিভাবকদের সাক্ষাতের নির্ধারিত দিন। বেশ কয়েকজন অভিভাবক এ দিন দেখা করার জন্য সেখানে আসেন। তখন তারা ওই খবর পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে চিকিৎসাধীন দুই জনকে সেখান থেকে বাসায় নিয়ে যায়।
অপরদিকে, খবর পেয়ে সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন বরিশাল মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তখন মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক পরিতোষ কুন্ড সাংবাদিকদের বলেন, ‘পুরো বিষয়টি আমরা তদন্ত করব। তদন্তে নির্যাতনের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে হলিকেয়ারের লাইসেন্স বাতিল করা হবে।’
দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন উপ- পুলিশ কমিশনার আলী আশরাফ ভূঁইয়া। পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘চন্দনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তার লাশ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনা তদন্ত করে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
একই সেন্টারে বছর দুয়েক আগে একজনকে নির্যাতনে হত্যার অভিযোগ উঠেছিল। সর্বশেষ গত ৩ সেপ্টেম্বর নগরীর রূপাতলী এলাকায় ড্রিম লাইফ নামে একটি মাদক নিরাময়কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্যাতনে সুমন খান নামে এক যুবকের মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ করেন তার স্বজনরা। নগরীতে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র আছে ৬টি।

এই বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT