খাবার জোটেনি নগরীর শ্রমিক-রোগীর স্বজনদের খাবার জোটেনি নগরীর শ্রমিক-রোগীর স্বজনদের - ajkerparibartan.com
খাবার জোটেনি নগরীর শ্রমিক-রোগীর স্বজনদের

2:44 pm , July 3, 2021

হোটেল রেস্তোরা বন্ধ

হেলাল উদ্দিন ॥ শনিবার দুপুর ২ টা। নগরীর বগুরা রোডে একটি বহুতল ভবন নির্মানে কাজ করছেন অন্তত ২০ জন শ্রমিক। পাশেই অবস্থিত একটি খাবার হোটেলেই তারা প্রতিদিন খাবার (ভাত) খেতেন। কিন্তু গতকাল দুপুরে যখন খাবারের সময় হলো তখন গিয়ে দেখেন খাবার হোটেলটি বন্ধ। শ্রমিক মনির বলেন প্রথমে তারা ভেবে ছিলেন যে, কোন কারনে আজ হয়ত বন্ধ রেখেছেন। তাই আশেপাশের অন্য সব হোটেলে খোঁজ করলাম কিন্তু সব হোটেলই বন্ধ পেলাম। পরে শুনলাম প্রশাসনের নির্দেশে সব হোটেল বন্ধ রয়েছে। তাই দুপুরে আর ভাত খাওয়া হয়নি। চায়ের দোকান খুজে রুটিও পাইনি। তাই কলা আর বিস্কুট খেয়ে থাকতে হয়েছে। একই কথা জানান, টেইলার্স ব্যবসায়ী রকি। বলেন বিয়ে করিনি। মা বাবাও নেই। তাই সারা বছর হোটেলেই খাই। কিন্তু আজ (শনিবার) দেখলাম সব খাবার হোটেল বন্ধ। তাই খুব বিপদে পড়েছি। পরিচিত এক বাসায় গিয়ে লজ্জা ভেঙে চেয়ে দুপুরের ভাত খেয়েছি। রাতে এবং পরের দিনগুলোতে কিভাবে খাব তা ভেবেই চিন্তিত আছি। তবে হোটেল বন্ধ থাকায় ভোগান্তির করুন চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এই হাসপাতালে আসা হাজারো রোগীর স্বজনদের হোটেলে খেয়ে দিনের পর দিন রোগীর পাশে থাকতে হয়। কিন্তু হোটেল বন্ধ থাকায় চরম বিপদে পড়েন তারা। অনেকে হাসপাতাল থেকে রোগীর জন্য বরাদ্ধকৃত ভাত ভাগ করে খেয়েছেন। অনেকে রুটি বিস্কুট কলা খেয়ে দিন কাটিয়েছেন। সবাই দাবী তুলেছেন স্বাস্থ্য বিধি মেনে খাবার হোটেল গুলো খুলে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হোক। নতুবা হোটেল নির্ভর মানুষগুলোকে না খেয়ে থাকতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সুত্রগুলো জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান এ হাসপাতালটিতে প্রতিদিন দেড়সহ¯্রাধিক রোগী ভর্তি থাকে। প্রতি রোগীর সঙ্গে গড়ে ৩ জন থাকেন স্বজন। সে হিসাবে প্রতিদিন শেবাচিম হাসপাতালে রোগী ও স্বজন থাকেন। হাসপাতাল থেকে শুধুমাত্র রোগীদের খাবার দেয়া হলেও তা মানসম্পন্ন না হওয়ায় বেশীরভাগ রোগী সেটা গ্রহন করেন না। প্রত্যন্ত এলাকা থেকে আসা রোগী ও স্বজনরা হাসপাতাল এলাকার হোটেল থেকে ৩ বেলা খাবার কিনে খান। গতকাল প্রশাসন হোটেলগুলো বন্ধ করে দেয়ায় শনিবার সকালে ঘুম থেকে উঠেই খাবার সংকটে পড়েন চিকিৎসাধীন রোগী ও স্বজনরা।
শেবাচিম হাসপাতাল সংলগ্ন বান্দ রোডে ‘নন্দীনি’ হোটেলের মালিক পবিত্র দেবনাথ বলেন, শেবাচিম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী ও তাদের স্বজনদের বেশীরভাগই তিনবেলা খাবার চাহিদা মেটায় হাসপাতার সংলগ্ন বাঁধ রোডে অবস্থিত ৯টি খাবার হোটেল। শুক্রবার রাতে পুলিশ সদস্যরা পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত হোটেলগুলো বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। ফলে গতকাল থেকে হাসপাতাল এলাকার সবগুলো খাবার হোটের বন্ধ রয়েছে। পবিত্র দেবনাথ বলেন, শনিবার সকালে হোটেল বন্ধ দেখে খাবার নিতে রোগীর স্বজনদের মধ্যে হাহাকার শুরু হয়। গোটা নগরীর হোটেল বন্ধ থাকায় তারা বিপাকে পড়েন। খাবারের জন্য হৈ-চৈ শুরু করে দেন। ঝুপরি চায়ের দোকানের রুটি-কলা মুহুর্তের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। স্বজনদের দূর্দাশা দেখে ৯ হোটেল মালিক একত্রিত হয়ে ৬ মন চাল-ডাল দিয়ে ৮টি ড্যাগে খিচুরী রান্না করে বিনামূল্যে বিতরণ করেন। রোগীদের স্বজনরা দীর্ঘ লাইনে দাড়িয়ে সকালের খাবার জোগার করেন। দুপুর থেকে পরবর্তী বেলার খাবারের অনিশ্চয়তা রোগী ও স্বজনদের রয়েই গেছে।
শেবাচিম হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আছেন বরগুনার আয়লা গ্রামের বাবুল হাওলাদার। হোটেল থেকে খাবার কিনে খান তারা। শনিবার সকালে হোটেল থেকে খাবার কিনতে না পেরে বাবুল হাওলাদারের কিশোরী মেয়ে জেসমিন আক্তারকেও লাইন দাড়িয়ে খিচুরী সংগ্রহ করতে হয়। সকালের খাবার সংগ্রহ হলেও দুপুর ও পরবর্তী বেলার খাবার উদ্বেগের কথা জানালের জেসমিন আক্তারসহ অসংখ্য রোগীর স্বজনরা। এব্যপারে শেবাচিম হাসপাতালের উপ পরিচালক ডা: আব্দুর রাজ্জাক বলেন, প্রশাসন হোটেল রেস্তোরা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জেলা প্রশাসক, সিটি মেয়র, বিভাগীয় কমিশনার এটি দেখছেন। আমাদের হাতে এক্ষেত্রে কিছুই করার নেই।
প্রশাসনের সিদ্ধান্তে খাবার হোটেল রোস্তরা বন্ধ থাকায় গতকাল এভাবেই ভোগান্তিতে পরে নগরীর শত শত নির্মান শ্রমিক, রিক্সা চালকসহ নানা ধরনের শ্রমজীবী। যাদেরকে অন্য কোন বেলা না হলেও দুপুরের খাবার সারা বছর হোটেলেই খেতে হয়। কিন্তু হোটেল বন্ধ থাকায় শনিবার এসব শ্রমিকদের পেটে ভাত জোটেনি।
পুলিশ কমিশনার মোঃ শাহবুদ্দিন খানের কাছে প্রশ্ন ছিলো যেখানে জাতীয় প্রজ্ঞাপনেও একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হোটেল খোলা রাখার নির্দেশনা রয়েছে। সেখানে বরিশালের ক্ষেত্রে কেন এমন সিদ্ধান্ত নিতে হলো এর উত্তরে তিনি বলেন এসব সিদ্ধান্ত সরকারের পক্ষে জেলা ও বিভাগীয় প্রশাসন নিয়ে থাকেন। আমরা পুলিশ প্রশাসন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহযোগীতা করে থাকি। তিনি বলেন, বরিশালে করোনা সংক্রমন অধিক মাত্রায় বেড়েও যাওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারন খাবার হোটেলের সাথে অনেক মানুষ সম্পৃক্ত। তাই হোটেল খোলা থাকলে অনৈক শ্রেনীর মানুষকে ঘরের বাহিরে বের হতে হবে। তবে হোটেল বন্ধ থাকায় শ্রমজীবী অনেক মানুষের খাওয়া দাওয়ায় কষ্ট হচ্ছে বলে স্বীকার করেন তিনি। এ বিষয়ে জানতে বরিশাল জেলা প্রশাসক কে ফোনে পাওয়া যায়নি।
প্রসঙ্গত, শুক্রবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও করোনা প্রতিরোধ জেলা কমিটির সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত বিশেষ সভায় বরিশালে সব ধরনের খাবার হোটেল রোস্তরা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়। বরিশাল জেলা প্রশাসক মোঃ জসীম উদ্দিন হায়দার ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT