2:50 pm , June 26, 2021
বয়স বাড়িয়ে যাবজ্জীবন দন্ড
নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ ১১ বছর বয়সী পিয়ারাকে ১৭ বছরের উল্লেখ করে দেয়া হয়েছিল যাবজ্জীবন কারাদন্ড। যার কারণে তার জীবন থেকে কেটে গেছে ২৬টি বছর। চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি ছিলেন এই পেয়ারা বেগম। গত ১০ জুন বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান পিয়ারা বেগম। তার এখন বয়স ৩৮ বছর। ১৯৯৭ সালের ২৪ এপ্রিল ১১ বছর বয়সে স্কুল থেকে তাকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। তখন পিয়ারা পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। এরপর পানিতে ডুবে চাচাতো বোনের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলায় তাকে আসামি করা হয়। অর্থের অভাবে পিয়ারা বেগমের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ সম্ভব ছিল না। রাষ্ট্রপক্ষের এক আইনজীবী থাকলেও পিয়ারা আক্তারের মামলায় তার গুরুত্ব ছিল না। ১৯৯৮ সালের ১১ নভেম্বর এ হত্যা মামলার রায়ে যাবজ্জীবন কারাদ- দেন আদালত। সেই থেকে কারাগারে যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করছিলেন পিয়ারা বেগম।
২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সদাচরণকারী বন্দিদের একটি তালিকা বরিশাল কারা কর্তৃপক্ষ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দারের সুপারিশে ওই তালিকায় পিয়ারা বেগমের নাম ছিল। কারাবাসকালে সদাচরণের জন্য বিশেষ বিবেচনায় পিয়ারাসহ কয়েজন বন্দির মুক্তির আবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মঞ্জুর করে। অবশেষে গত ১০ জুন বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান পিয়ারা। পিয়ারা আক্তার পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার মৃত আনিস মৃধার মেয়ে।
পিয়ারা বেগম বলেন, তার বাবা আনিস মৃধা নিজেদের জমিতে কৃষিকাজ করতেন। অভাব-অনটন ছিল না তাদের পরিবারে। পাঁচ বছর বয়সে বাবা মারা যান। এরপরই চাচা জিয়াউল হক আমাদের জমি দখলের চেষ্টা করেন। জমি দখলের জন্য আমাদের নানাভাবে হয়রানি শুরু করেন। চাচা জিয়াউল হকের ষড়যন্ত্র বোঝার বয়স ছিল পিয়ারার। পিয়ারা বলেন, ‘স্পষ্ট মনে আছে, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় পুলিশ পরিচয় দিয়ে সাদা পোশাকে থাকা এক ব্যক্তি স্কুল থেকে আমাকে ধরে নিয়ে যান। থানায় নিয়ে আমাকে বলেন, তোমার চাচাতো বোন মেজবিনকে সাঁকো থেকে ফেলে দিয়েছ বলে আদালতে জবানবন্দি দেবে। তাহলে আমাকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে আসবে। অন্যকথা বললে আমাকে জেলে দেয়া হবে বলে ভয় দেখানো হয়।’ পিয়ারা বলেন, ‘আমি ওই পুলিশ সদস্যের শিখিয়ে দেয়া কথামতো আদালতে জবানবন্দি দেই। আমাকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে না দিয়ে জেলে পাঠানো হয়। অর্থের অভাবে আমার পক্ষে আইনজীবী দেয়ার আর্থিক সামর্থ্য ছিল না। রাষ্ট্রপক্ষের একজন আইনজীবী ছিলেন। তিনি আমার মামলায় কখনো গুরুত্ব দেননি। ১৯৯৮ সালের ১১ নভেম্বর এ হত্যা মামলার রায়ে পিরোজপুরের একটি আদালত আমাকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেন। এরপর পিরোজপুর থেকে বরিশাল কারাগারে আমাকে স্থানান্তর করা হয়। এদিকে বৃহস্পতিবার পিয়ারার মতো আরও তিনজন জেলা প্রশাসকের সহায়তায় পেয়েছেন নতুন জীবনের সন্ধান। সম্প্রতি তারা কারামুক্তি পেয়ে জীবন-জীবিকা নিয়ে হতাশার মধ্যে ছিলেন। এখন তারাও জীবিকার সন্ধান পেয়েছে।
এ ব্যাপারে বরিশাল জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার জানান, ‘পিয়ারা বেগমের ঘটনা আমাকে নাড়া দিয়েছে। তার জীবনের কারাভোগের দীর্ঘ ২৬ বছর ফিরিয়ে দেয়া যাবে না। তার ভবিষ্যৎ জীবনের কথা বিবেচনা করে তাকে চাকরি দেয়ার পাশাপাশি একটি সেলাই মেশিন দেয়া হয়েছে। পিয়ারা বেগমের মতো আরও তিনজনকে ভ্যান ও সেলাই মেশিন দেয়া হয়েছে। এসব উপহার তুলে দেয়ার সময় তাদের মুখের হাসি আমাকে মুগ্ধ করেছে, অনুপ্রাণিত করেছে। সর্বোপরি দীর্ঘদিন কারাভোগ করে ফেরা চারজনের পরিবারের কিছুটা হলেও দুঃখ-কষ্ট লাঘব হবে। স্বাভাবিক জীবন যাপনে টিকে থাকতে তাদের দেয়া উপহার আশা করি কাজে লাগবে।’
