ঝালকাঠিতে হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর রসের ঐতিহ্য ঝালকাঠিতে হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর রসের ঐতিহ্য - ajkerparibartan.com
ঝালকাঠিতে হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর রসের ঐতিহ্য

2:58 pm , December 13, 2020

 

রিয়াজুল ইসলাম বাচ্চু, ঝালকাঠি ॥ ঝালকাঠিতে হারিয়ে যাচ্ছে সুস্বাদু খেজুর রসের ঐতিহ্য। গৌরব আর ঐতিহ্যের প্রতীক মধু বৃক্ষ এই খেজুর গাছ। দক্ষিণ অঞ্চলে কয়েক দিন ধরে বেশ শীত পড়তে শুরু করেছে। কিন্তু এখন আর শীতের মৌসুম শুরু হতে না হতেই আবহমান গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য খেজুরের রস আহরণে গ্রামে গ্রামে গাছিরা খেজুর গাছ প্রস্তুত করতে দেখা যাচ্ছে না। যারা খেজুরের রস সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বিশেষভাবে গাছ কাটায় পারদর্শী স্থানীয় ভাষায় তাদেরকে গাছি বলা হয়। এ গাছিরা হাতে দা নিয়ে ও কোমরে দড়ি বেঁধে নিপুণ হাতে গাছ চাঁচাছোলা ও নলি বসানোর কাজ করে রস আহরণ করে থাকে। এক সময় শীত মৌসুম এলেই ঝালকাঠির পল্লী অঞ্চলে গাছিদের মাঝে খেজুর গাছ কাটার ধুম পড়ে যেত। শীত মৌসুম এলেই এ অঞ্চলের সর্বত্র শীত উদযাপনের নতুন আয়োজন শুরু হয়ে যেত। খেজুরের রস আহরণ ও গুড় তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে যেতেন এ অঞ্চলের গাছিরা। তাদের মুখে ফুটে ওঠতো রসালো হাসি। শীতের সকালে বাড়ির উঠানে বসে সূর্যের তাপ নিতে নিতে খেজুরের মিষ্টি রস যে পান করেছে, তার স্বাদ কোনো দিন সে ভুলতে পারবে না। শুধু খেজুরের রসই নয় এর থেকে তৈরি হয় সুস্বাদু পাটালি, গুড় ও প্রাকৃতিক ভিনেগার। খেজুর গুড় বাঙ্গালির সংস্কৃতির একটা অঙ্গ। খেজুর গুড় ছাড়া আমাদের শীতকালীন উৎসব ভাবাই যায় না। শীতের দিন মানেই গ্রামাঞ্চলে খেজুর রস ও নলেন গুড়ের ম-ম গন্ধ। শীতের সকালে খেজুরের তাজা রস যে কতটা তৃপ্তিকর তা বলে বোঝানো যায় না। আর খেজুর রসের পিঠা এবং পায়েসতো খুবই মজাদার। এ কারণে শীত মৌসুমের শুরুতেই গ্রামাঞ্চলে খেজুর রসের ক্ষির, পায়েস ও পিঠে খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। গ্রামীণ জীবনের শীতের উৎসব শুরু হতো খেজুর গাছের রস দিয়ে। শীতের শুরুতেই অযন্ত আর অবহেলায় বেড়ে ওঠা খেজুর গাছের কদর বেড়ে যেত। কিন্তু সেই চিত্রএখন আর চোখে পড়ে না। ঝালকাঠির গ্রামাঞ্চলের দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। এখন আর আগের মত খেজুরের রসও নেই এবং পিঠে পায়েসও নেই। ঝালকাঠি সদর, রাজাপুর, নলছিটি ও কাঠালিয়ায় অঞ্চলে সুস্বাদু এই খেজুরের রস আগুনে জ্বাল দিয়ে বানানো হতো বিভিন্ন রকমের গুড়ের পাটালি ও নালি গুড়। গাছিরা প্রতিদিন বিকেলে খেজুর গাছের সাদা অংশ পরিষ্কার করে ছোট-বড় কলসি (মাটির পাত্র) রসের জন্য বেঁধে রেখে, পরদিন সকালে কাঁচা রস সংগ্রহ করে মাটির হাড়িতে নিয়ে এসে হাট-বাজারে বিক্রি করতো। সেই সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকজন এসে খেজুর গাছ বর্গা নিয়ে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করতো। ফলে সেসময় খেজুর গাছের কদরও ছিল বেশি। খেজুর গাছের সুমিষ্টি রসের মৌ-মৌ ঘ্রাণে ভরে উঠতো গ্রামাঞ্চল। পুরো শীত মৌসুম চলতো সু-স্বাদু পিঠা, পায়েস আর পুলিসহ নানান রকমের পিঠা খাওয়ার আয়োজন। বাড়িতে-বাড়িতে জামাই, মেয়ে, নাতি-নাতনীদের নিয়ে চলতো শীত উৎসব। তৈরি করা হতো নানান প্রকারের পিঠা। সেসব এখন অনেকটাই স্মৃতি।আজ রোববার সকালে ঝালকাঠি জেলার গাভা রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের বীরমহল গ্রামের গিয়ে দেখা যায়, এক গাছি খেজুর গাছের ছাল পরিস্কার করে তাতে মাটির হাড়ি বেঁধে দিচ্ছেন।এ সময় কথা হলে গাছি ফজর আলী (৫৫) জানান, আগে আমার কদর ছিল, এখন আর কেউ ডাকে না। খেজুর গাছও তেমন নেই। আর লোকজনও তেমন খেজুর গাছের রস সংগ্রহ করতে চায় না।
তিনি আরো জানান, আগে সকাল বেলা খেজুরের রস সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করতাম। আয়ও হতো ভালো। গ্রামে-গ্রামে খেজুর গাছের মাথায় মাটির হাড়ি বেঁধে রাখা দেখে মন জুড়িয়ে যেত। খেজুর গাছ দিন দিন হারিয়ে গেলে এক সময় খেজুর রসের ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে। এজন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বেশি বেশি খেজুর গাছ রোপণ করার দাবি জানান তিনি।ঝালকাঠির উপজেলাগুলোতে শীতের সকালে এক দশক আগেও চোখে পড়তো রসের হাড়ি ও খেজুর গাছ কাটার সরঞ্জামসহ গাছির ব্যস্ততার দৃশ্য। সাত সকালে খেজুরের রস নিয়ে গাছিরা বাড়ি বাড়ি হাকডাক দিতেন। এছাড়া খেজুরের রস দিয়ে তৈরি ঝোলা গুড়ের নাম রয়েছে বরিশালব্যাপী। তবে গ্রামবাংলার এ দৃশ্য এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। এর প্রধান কারণ ইট ভাটার জ্বালানীর কারণে খেজুর গাছ নিধন। এতে দিনে দিনে ঝালকাঠির কমছে খেজুরের গাছ। দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে খেজুরের রসও। “বিশিষ্ট কৃষিবিদ ড. চিত্ত রঞ্জন সরকার বলেন, মাটির নীচের জল এবং মাটির আদ্রতা কমে যাওয়ায় খেজুর গাছে আগের তুরনায় রস কম সংগ্রহ হচ্ছে। যত্রতত্র ইট ভাটা গড়ে ওঠায়, ভূপৃষ্ঠের রুপ পরিবর্তন ও জলবায়ূ পরিবর্তনের ফলে পানির স্তর নীচে নেমে যাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, খেজুর গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিছু অসাধু লোক মুনাফা লাভের আশায় ইটভাটায় খেজুর গাছ জ্বালানী হিসেবে সরবরাহ করছে। তিনি বলেন সরকারী উদ্যোগে খেজুর গাছের চাস বাড়াতে হবে। গাছিদের প্রশিক্ষ ও স্বল্প সুদে ঋণ সহায়তা দিয়ে খেজুর রস আহরণে উৎসাহিত করতে হবে।”জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র এ তথ্য জানিয়ে বলেছে, দিনে দিনে ঝালকাঠি খেজুর গাছ কমতে থাকলেও হারিয়ে যায়নি। সুস্বাদ ও পিঠাপুলির জন্য অতি আবশ্যক উপকরণ হওয়ায় এখনও খেজুর রসের চাহিদা রয়েছে। তবে আগের মত খেজুরের রস ও গুড় পাওয়া যায় না। পেলেও আগের চেয়ে ১০ গুন বেশি দাম দিয়ে কিনতে হয়। গ্রামের মাঠে আর মেঠোপথের ধারে কিছু গাছ দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য এই খেজুরগাছ আজ অস্তিত্ব সঙ্কটে। যে হারে খেজুরগাছ নিধন হচ্ছে সে তুলনায় রোপণ করা হয় না।সদর উপজেলার উপজেলার নবগ্রাম গ্রামের আমিন উদ্দিন (৭৫) বলেন, কাঁচা রসের পায়েস খাওয়ার কথা এখনো ভুলতে পারি না। আমাদের নাতি-নাতনীরা তো আর সেই দুধচিতই, পুলি-পায়েস খেতে পায় না। তবুও ছিটেফোঁটা তাদেরও কিছু দিতে হয়। তাই যে কয়টি খেজুর গাছ আছে তা থেকেই রস, গুড়, পিঠাপুলির আয়োজন করা হয়। সদর উপজেলার রমজানকাঠি গ্রামের মামুনা বেগম জানান, গাছের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। এক সময় উপজেলা খেজুর রসের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। এখন গাছ যেমন কমে গেছে তেমনি কমে গেছে গাছির সংখ্যাও। ফলে প্রকৃতিগত সুস্বাদু সে রস এখন আর তেমন নেই। তবুও কয়েকটা গাছের পরিচর্যা করে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে চেষ্টা করে যাচ্ছি। ঝালকাঠির বর্ডারের কাচাবালিয়া গ্রামের গাছি বাবুল সরদার জানান, খেজুরের গাছ কমে যাওয়ায় তাদের চাহিদাও কমে গেছে। একসময় এই কাজ করে ভালোভাবেই সংসার চালাতেন। এমনকি আগে যে আয় রোজগার হতো তাতে সঞ্চয়ও থাকতো, যা দিয়ে বছরের আরো কয়েক মাস সংসারের খরচ চলতো। গ্রামে যে কয়েকটা খেজুর গাছ আছে তা বুড়ো হয়ে যাওয়ায় রস তেমন পাওয়া যায় না। রস বাজারে বিক্রির মতো আগের সেই অবস্থা নেই। তিনি জানান, এইতো কয়েক বছর আগে এক হাড়ি খেজুর রস বিক্রি করতাম ২০ টাকা। এখন খেজুর গাছ না থাকায় সে রসের দাম বেড়ে হয়েছে ২০০ টাকা।জানা গেছে, ইটের ভাটায় ব্যাপকভাবে খেজুর গাছ ব্যবহার করায় এ গাছ কমে গেছে। খেজুর গাছ সস্তা হওয়ায় ইটের ভাটায় এই গাছই বেশি পোড়ানো হয়। এছাড়া অনেক সময় ঘরবাড়ি নির্মাণ করার জন্য খেজুরের গাছ কেটে ফেলা হয়। ফলে দিন দিন খেজুর গাছ কমে যাচ্ছে।

এই বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT