2:32 pm , January 29, 2020
হেলাল উদ্দিন ॥ আপ্যায়নের ক্ষেত্রে মিষ্টি একটি অপরিহার্য উপাদান। বাসা বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া হোক কিংবা বিয়ে শাদী অথবা কোন আনন্দের উপলক্ষ, যাই হোক না কেন, মিষ্টি নিয়ে যাওয়া আর মিষ্টি খাওয়ানোর রেওয়াজ চালু রয়েছে বহুকাল আগে থেকেই। কিন্তু মিষ্টির নামে কি খাচ্ছি আমরা? কিভাবে তৈরি হচ্ছে রসে ভরা, সুস্বাদু এসব মিষ্টি। তা শুনলে অনেকেই হয়ত মিষ্টি খাওয়াই ছেড়ে দিবেন। পরিবর্তনের অনুসন্ধানে বেড়িয়ে এসেছে বরিশাল নগরীর অভিজাত সব প্রতিষ্ঠানে মিষ্টি তৈরীর চিত্র।
মিষ্টির প্রসঙ্গ আসলেই চলে আসে নগরীর হক মিষ্টান্ন, শশী মিষ্টান্ন, গৌরনদী মিষ্টান্ন, নিতাই, বনফুল মিষ্টান্ন ভান্ডারের নাম। এছাড়াও রয়েছে প্রসিদ্ধ আরো দোকান বা প্রতিষ্ঠানের নাম। কিন্তু ঐতিহ্য আর খ্যাতী যাই হোক কোন প্রতিষ্ঠানই স্বাস্থ্য সম্মত ভাবে তৈরী করছে আপ্যায়নের প্রধান উপাদান এই মিষ্টি। তবে নিজেদের পক্ষে সাফাই গেয়ে এসব প্রতিষ্ঠান ভেজাল বা ক্ষতিকর দ্রব্য দিয়ে মিষ্টি তৈরীর কথা অস্বীকার করেছেন।
মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকর মেডিসিন ঃ শুধু নোংরা আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই যে মিষ্টি তৈরি হচ্ছে তাই নয় এই মিষ্টিতেই মেশানো হচ্ছে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর মেডিসিন। বর্তমান সময়ে সব খাদ্যের মত মিষ্টিতেও পাল্লা দিয়ে মেশানে হচ্ছে মানবদেহের ক্ষতিকারক সব উপাদান। জেনে হোক আর না জেনেই হোক আমরা প্রতিদিন পেটপুরে খাচ্ছি এসব ভেজাল ও বিষাক্ত মিষ্টি।
কয়েকজন মিষ্টির সাবেক ও বর্তমান কারিগরের সাথে কথা বলে জানা গেছে,মিষ্টি, রসমালাই তৈরির প্রধান উপাদান দুধ ও চিনি। আর এই দুটি উপাদানেই মেশানো হচ্ছে ভেজাল। উদাহরন হিসাবে তারা বলেন, দুধের দাম বৃদ্ধির ফলে অনেক মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী গরুর দুধের ছানার পরিবর্তে ভেজাল গুড়ো দুধ মিশ্রিত ভেজাল ও নি¤œ মানের ছানা সংগ্রহ করে। আর তা দিয়েই তৈরী করে ফেলে মিষ্টি। তাছাড়া মিষ্টি বানাতে প্যাকেটের ময়দার পরিবর্তে বাজারের নিম্নমানের খোলা ময়দা ব্যবহার করা হয়। যদিও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) অনেক প্যাকেটজাত তরল দুধের কোম্পানিকে মানসম্মত বলে সার্টিফিকেট দিয়েছে। একইভাবে চিনির মান নির্ণয় করে চিনি কোম্পানিকেও অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তবুও চিনিতে চক পাউডার ও ইউরিয়া এবং দুধে ফরমালিন মেশানো হচ্ছে। আর চক পাউডার ও ইউরিয়া মিশ্রিত দুধের ছানা দিয়েই তৈরি হচ্ছে মজার মজার মিষ্টি। যা গর্ভবতী মা ও শিশুদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। নাম করা বেশ কয়েকটি মিষ্টির কারখানায় খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, এসব কারখানায় সাদা মিষ্টি, লালচে মিষ্টি, কালো জাম, চমচমসহ বিভিন্ন ফ্লেভারের মিষ্টি তৈরি করা হয়। মিষ্টি তৈরি করার জন্য ময়দা, চিনি এবং ছানা মিক্স করার সময় তাতে খাওয়ার সোডা দেয়া হয়। এতে মিষ্টি স্বাভাবিকের চেয়ে ফুলে যায়। অনেক সময় মিষ্টিকে টেকসই করতে ব্যবহার করা হয় শালটু হাইড্রোয়েট ও বেকিং পাউডার। এছাড়া মিষ্টিকে লালচে বা বিভিন্ন রংয়ের করতে ব্যবহার করা হয় ট্রিপল ফাইভ (৫৫৫) নামের মেডিসিন। এই ৫৫৫ এবং শালটু হাইড্রোয়েট নামের মেডিসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এতই বেশি যে, তা মানব স্বাস্থ্যের জন্য খুবই মারাত্মক ক্ষতিকর। বিশেষ করে ছোট শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য এই মেডিসিন খুবই ক্ষতিকর।
মিষ্টি তৈরির এক কারিগর বলেন, শালটু ও ৫৫৫ মেডিসিন যদিও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তবুও সুস্বাদের জন্য মিষ্টিতে এসব মেডিসিন ব্যবহার করা হয়। তিনি বলেন,আগে আমরা এসব ব্যবহার করতাম। ইদানিং বিভিন্ন মিষ্টি কারখানায় অভিযান চালানো এবং জেল-জরিমানা করার ভয়ে তা ব্যবহার করা হয় না। এখন শুধু খাওয়ার সোডা ব্যবহার করি। কিন্তু অনেক কারখানায় মিষ্টির খামিতে ভেজাল মেশানোর পাশাপাশি মিষ্টি তৈরির উপাদান এতই কম দেয়া হয় যে, তা মিষ্টি না হয়ে ময়দার চাকে পরিণত হয়। আর এসব মিষ্টি স্বাস্থ্যের জন্য উপকার তো হয়ই না আরও ক্ষতি করে। আর এক কারিগর বলেন মিষ্টিতে টিস্যু দেয়ার একটা কথা সাধারন মানুষের মধ্যে কথিত আছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে পূর্বে এর ব্যবহার ছিলো কিন্তু এখন নেই। কারন একটি টিস্যু ভিজালে যে পরিমান হবে তাতে টাকার এখন আর পোষে না তাই এক্ষেত্রে এখন আটা ময়দাই বেশী ব্যবহৃত হয়।
নগরীর অভিজাত এসব দোকানের মিষ্টির সাথে পরিচিতি বা সখ্যতা রয়েছে এমন বেশ কয়েকজন বলেন পূর্বে নগরীর হক ও শশী মিষ্টি বেশ মানসম্মত ও সুস্বাদু ছিলো কিন্তু এখন আর সেই মানের নেই। একটা পরিচিতি পাওয়ার পর তারা এখন ব্যবসাকেই প্রধান্য দিচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে। এছাড়া অন্যান্য দোকানগুলোর মিষ্টির মান নেই বললেই চলে।
বরিশাল জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ মনোয়ার হোসেন বলেন এক কথায় ভেজাল মানেই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতির কারন। তিনি বলেন মেডিসিন দেয়া মিষ্টি, রসমালাই খেলে লিভার, কিডনীতে সমস্যা দেখা দিতে পারে। ভেজাল মেশানো এসব খাদ্য মাত্রাতিরিক্ত খেলে সিরোলেক্স নামে এক প্রকার রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাছাড়া, বাচ্চাদের ক্ষেত্রে মাথা ঘুড়ানো, বমি এবং পাতলা পায়খানা হয়ে থাকে। তাই ভেজাল মেশানো এসব মিষ্টি জাতীয় খাবার যতটুকু এড়িয়ে চলা যায় ততই ভাল বলে জানান তিনি।
