2:47 pm , October 16, 2019
নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ রোগীর দালালদের দৌরত্ব কিংবা বেসরকারি এ্যাম্বুলেন্সে রোগী জিম্মী করে সিন্ডিকেট বানিজ্য বেশ নিয়ন্ত্রনে রয়েছে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে। কিন্তু হঠাৎ করেই ভয়াবহ রুপ নিয়েছে বৈদেশিক সাবান, শ্যাম্পু ও কৌটা বানিজ্যের একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। ডাক্তার ও বেশ কিছু ফার্মেসীর আশ্রয় প্রশ্রয়ে মহাবেপরোয়া এই সিন্ডিকেটটি দৈনিক অন্তত দেড় থেকে দুই লাখ টাকা এবং মাসে ৫০ লাখ টাকার অধিক অবৈধ বানিজ্য করছে। যে কারনে রোগীকে যেমন তার সামর্থ্যরে বাইরে গিয়ে ঔষধ কিনে সর্বশান্ত হতে হচ্ছে তেমনি এই সব গুনগতমানহীন ঔষধ সেবন করে পড়তে হচ্ছে চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে। গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে ১১ টা। গোপন খবর পেয়ে হাসপাতালটির প্রধান ফটকে ফার্মেসীর সামনে অবস্থান এই প্রতিবেদকের। হাসপাতাল থেকে ডাক্তার দেখিয়ে আসলেন নগরীর ধান গবেষনা রোডের বাসিন্দা গৃহবধূ শাহিনুর। ব্যবস্থাপত্র নিয়ে ফার্মেসীতে আসা মাত্রই এক ব্যাক্তি ওই রোগীর হাত থেকে ব্যবস্থাপত্র ছিনিয়ে নেয়ার স্টাইলে টান দিলেন। হাতে নিয়ে বললেন এ ঔষধ এই ফার্মেসীতে পাওয়া যাবে না আমার সাথে আসেন। ওই রোগীকে নিয়ে অন্য ফার্মেসীর দিকে রওনা হলেন। কিছুক্ষন পরে আবার আসলেন এক রোগীর স্বজন। মামুন নামের ওই ছেলেটি তার মাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন চর্ম রোগের জন্য। হাসপাতালের বহিঃবিভাগে দেখানোর পর ব্যবস্থাপত্রে ৫ ধরনের ঔষধ লিখে দিলেন ডাক্তার। অর্থ সংকটের কারনে ফার্মেসীতে এসে আগেই জানতে চাইলেন ঔষধগুলোর দাম কত হবে। ফার্মাসিষ্ট দাম বলতে শুরু করা মাত্রই আবার এক মধ্য বয়সী যুবক এসে ব্যবস্থাপত্র হাতে নিয়ে ওই রোগীর স্বজনকে বললেন এখানে এই ঔষধটি (ডাক্তার ও কোম্পানীর সাথে চুক্তিবদ্ধ বিদেশী শ্যাম্পু) প্রধান ঔষধ। অন্যগুলো না নিলেও চলবে। কিন্তু এটা না নিলে আপনার ডাক্তার দেখানোই বৃথা যাবে। ছেলেটি ওই দালালের কথা শুনে টাকার সমস্যার কারনে অন্য ৪ টি ঔষধ না নিয়ে ৭৫০ টাকা দিয়ে এঙ বোয়ার নামের শ্যাম্পুটি নিয়ে চলে গেলেন। দালালদের এই রোগী ধরা চিত্র দেখে বিস্তারিত তথ্যের জন্য খোজখবর নিয়ে পাওয়া গেল ভয়াবহ সব তথ্য। জানা গেছে বিদেশী এসব ভিটামিন কৌটা,সাবান ও শ্যাম্পু বানিজ্যে রয়েছে ১০/১২ জনের একটি সংঘবদ্ধ শক্তিশালী সিন্ডিকেট চক্র। যারা শেবাচিম হাসপাতালের আউটডোরে (বহিঃবিভাগ) রোগী দেখা শুরু হওয়া মাত্র হাসপাতালের সামনে অবস্থিত ফার্মেসী গুলোতে অবস্থান নেয়। এদের টিম লিডার হিসাবে কাজ করছে আক্কাস নামের এক যুবক। তার সাথে রয়েছে শাহীন,সোহেল মিঠু,জাকিরসহ বেশ কয়েকজন। এদের অপর একটি চক্র একই ভাবে কাজ করে নগরীর সদর রোডের বিভিন্ন ফার্মেসীতে। এদের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন শেবাচিম হাসপাতালের মানসী বৈদ্য ও হাসেম নামের দুজন চর্ম ও যৌন রোগের চিকিৎসক মেডিকেল অফিসার) এবং একাধিক মেডিসিন রোগের চিকিৎসক। যারা প্রত্যেক রোগীর ব্যবস্থাপত্রে কমপক্ষে একটি করে কমিশন বানিজ্যের ওই ঔষধ লিখে থাকেন।
জানা গেছে, এই দালালেরা নিজ উদ্যোগে কিংবা কোন মাধ্যমে এসব বিদেশী কৌটা ভিটামিন, সাবান,শ্যাম্পু ফার্মেসীগুলোতে সরবরাহ করে থাকে। অনেকে আবার কোন মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি কোম্পানীর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে এসব ঔষধ সামগ্রী সরবারহ করে থাকে। তবে পদ্ধতি যাই হোক এর পিছনে রয়েছে বড় অংকের কমিশন বানিজ্য। জানা গেছে কোম্পানী-দালাল-চিকিৎসক-ফার্মেসী এই ৪ ভাগে ভাগ হয় কমিশন। আর যে সব দালাল সরাসরি নিজেরা এসব ঔষধ সরবরাহ করে তাদের কমিশন দিতে হয় শুধু ডাক্তার ও ফার্মেসীকে। বিভিন্ন সুত্রে জানা গেছে বাজার মুল্যের ৩০ থেকে ৫০ ভাগ কমিশনের চুক্তিতে ওই সব কোম্পানী বা দালাল ডাক্তারের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন। যিনি রোগীর ব্যবস্থাপত্রে তাদের সরবারহকৃত ঔষধগুলো লিখবেন। খোজঁ নিয়ে জানা গেছে,বিদেশী সাবান ও শ্যাম্পু রোগীর ব্যবস্থাপত্রে লিখে থাকেন চর্ম ও যৌন রোগের চিকিৎসক। আর ভিটামিন কৌটা বেশির ভাগ লিখে থাকেন মেডিসিন রোগের চিকিৎসক। এসব ঔষধ ঝুঁকিপূর্ন ও কার্যকারীতা প্রশ্ন বিদ্ধকর উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও বরিশাল স্বাস্থ্য বিভাগীয় অফিসের সাবেক সহকারী পরিচালক ডাঃ মুসতাক আল মেহেদী বলেন, কিছু মুনাফা লোভী ডাক্তারদের সাথে চুক্তি করে একটি চক্র হরহামেশা এই বিদেশী ঔষধের বানিজ্য করে থাকে। পরীক্ষা-নিরীক্ষাহীন এসব ঔষধ এক দিকে যেমন রোগীর জন্য চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকির তেমনি অর্থ গচ্ছার কারণ। এই একই দেশী ঔষধ ৪/৫ ভাগ কম মুল্যে দেশীয় কোম্পানী বাজারজাত করছে। সব বিষয় নিয়ে আলাপকালে শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ মোঃ বাকির হোসেন বিদেশী এসব ঔষুধের সিডিন্ডেকেট ও বানিজ্যের কথা শুনে অবাক হন। বলেন ডাক্তারদের নৈতিকতা যতদিনে ঠিক না হবে তত দিনে এ সমস্যা কম বেশী থেকেই যাবে। দ্রুতই এ বিষয়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করে অভিযান পরিচালনা করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন সংশ্লিষ্ট অভিযুক্ত চিকিৎসকদেরও এ বিষয়ে সর্তক করা হবে।
