3:24 pm , April 18, 2019
খান রুবেল ॥ বরিশাল বগুরা রোড এলাকার বাসিন্দা সালেহীন সানী। যিনি পরিবারের তিন ভাই-বোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়েই বৈবাহিক জীবনে আবদ্ধ হন তিনি। একদিকে সংসারের বোঝা, অন্য দিকে নিজের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন। ক্রমশই যেন সবকিছু অন্ধকারে। কিন্তু তার সেই স্বপ্নে পূরন হয় ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিং দিয়ে। ২০১৫ সালের শুরুর দিকে ডিজিটাল বাংলাদেশের ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যবহার করে অর্থ উপার্জনে নেমে পড়েন তিনি। দেখেছেন সফলতার মুখও। এক সময়ের বেকার ও হতাশাগ্রস্থ জীবন নিয়ে ঘুরে বেড়ানো সালেহীন প্রায় চার বছরে আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে ঘরে বসেই আয় করেছেন প্রায় ৬০ হাজার ইউএস ডলার। বাংলাদেশী ঢাকায় যার পরিমান প্রায় ৫০ লাখ টাকা। আর বর্তমানে আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে প্রতি মাসে তার আয় সর্বনি¤œ ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত। শুধু তাই নয়, বিশে^র অন্যতম ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস ফ্রিল্যান্সারে টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সারের জায়গাটাও দখল করে নিয়েছেন তিনি। এসব করে শুধু অর্থ উপার্জনই নয়, তিনি সরকারের কাছ থেকে পেয়েছেন বিশেষ সম্মাননাও। অনলাইনে সেবা প্রদান ও ফ্রিল্যান্সিংএ
সফলতা অর্জনে ২০১৮ সালে বিভাগীয় ডিজিটাল উদ্ভাবনী মেলায় তরুন উদ্ভাবক হিসেবে দ্বিতীয় ও জেলা পর্যায়ে একমাত্র সফল ও শ্রেষ্ঠ তরুন উদ্ভাবকের সম্মাননা পেয়েছেন সালেহীন সানী। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের এ-টু-আই তাকে এই সম্মাননা প্রদান করেছেন। আর তাই এখন ফ্রিল্যান্সিং বা আউট সোর্সিংকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি। শুধুমাত্র সালেহীন নয়, তার মত আরো অনেক শিক্ষিত বেকার যুব সমাজ এখন ঘরে বসেই ডিজিটাল বাংলাদেশের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আউটসোর্সিং করে অর্থ উপার্জন করছেন। আলাপকালে সালেহীন সানী বলেন, ‘উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর পরই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলাম। কিন্তু তখনও লেখা পড়ার খরচ পরিবারের কাছ থেকেই নিতে হয়েছে। নিজের বৈবাহিক জীবনে চাহিদা মেটানো সম্ভব ছিলো না। তাই ২০১৪ সালে বরিশালে আইটি প্রতিষ্ঠান সাতরং সিস্টেমস’র বিজ্ঞাপন দেখে তাদের কাছে ছুটে যাই। সেখানে আউটসোর্সিং এর ওপর তিন মাস প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও আরো তিন মাস ইন্টার্নশিপ করেছি। তিনি বলেন, ‘মুলত ২০১৫ সালের মে মাস থেকে আমি অনলাইন মার্কেটপ্লেসে প্রফেশনাল আউটসোর্সিং এর কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত ইউএস, ইউকে, ইউএই, ফ্রান্স, জাপান সহ বিভিন্ন দেশের ৩০০টির বেশি কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করেছি। যার মাধ্যমে গত প্রায় চার বছরে ৬০ হাজার মার্কিন ডলার আয় করেছি। এতে করে শুধুমাত্র আমার নিজের উপার্জনই নয়, বরং বিদেশ থেকে বাংলাদেশ অনেক রেমিটেন্সও পাচ্ছে। তিনি বলেন, “বর্তমানে আমার নিজের ‘বাংলাটেক সিস্টেম্স’ নামক একটি আইটি ট্রেনিং, ডিজাইন ও প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এখানে ফ্রিল্যান্সিং এর কোর্স করানো হচ্ছে এবং বর্তমানে ২০ জন আউটসোর্সিংয়ের কাজ করছেন। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এরই মধ্যে ২৫০ জনের বেশি শিক্ষার্থীকে ফ্রিল্যান্সিং এর প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। যার অনেকেই এখন আউটসোর্সিং করে হাজার হাজার টাকা উপার্জন করছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের ‘বরিশাল ফ্রিলান্সিং ফাউন্ডেশন ও অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং কমিউনিটি’ রয়েছে। যার মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সারদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান ও সহযোগিতা করা হচ্ছে। সালেহীন বলেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশের কারনেই আমি আমার স্বপ্নকে বাচিয়ে তুলতে পেরেছি। আমার স্বপ্ন পুরন হয়েছে। আমি নিজের পায়ে দাড়াতে সক্ষম হয়েছি। অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি লেখা পড়াও চালিয়ে যাচ্ছি। ফ্রিল্যান্সিংকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছি বিধায় এ বিষয়ে আরো অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য অনলাইনে ওপেন ইউনিভার্সিটি ইউকে থেকে ডিসটেন্স লার্নিং কোর্স করছি। আমার স্ত্রীও বরিশাল বিশ^বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছে। সেও ফ্রিল্যান্সিং এর ব্যাপারে ধারণা অর্জন করে আমার কাজে সহযোগিতা করছে। এদিকে সালেহীন সানিকে আউটসোর্সিং এর প্রশিক্ষণ দেয়া বেসরকারি আইটি প্রশিক্ষণ সেন্টার সাতরং সিস্টেমস’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক আযাদ আলাউদ্দীন বলেন, ‘সালেহীন আমাদের থেকে ‘সন্ধ্যান যন্ত্র নিখুতকরণ’
(এসইও) প্রশিক্ষণ গ্রহন করেছে। এসইও আউটসোর্সিং
জগতে জনপ্রিয়। বর্তমানে এ কাজের মাধ্যমে ভালো আয় করা যায়। তাই অনেক শিক্ষার্থী এবং চাকুরিজীবিরা তাদের কাজের পাশাপাশি এসইও কাজের প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘২০১৪ নালের ১ জানুয়ারি থেকে আমাদের সাতরং সিস্টেমস’র কার্যক্রম শুরু হয়। এ পর্যন্ত আউটসোর্সিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন সহ ১৬টি কম্পিউটার কোর্সে ২৫০টি ব্যাচে মোট ২১১৫ জন প্রশিক্ষণ গ্রহন করেছেন। যার মধ্যে আউটসোর্সিং কোর্স করেছে প্রায় তিনশ জন এবং গ্রাফিক্স ডিজাইনারের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ৩৬৭ জন। এরমধ্যে অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী অনলাইন ও গ্রাফিক্স ডিজাইনের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করছে। যাদের মধ্যে সালেহীন সানী একজন। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মান ও বর্তমান সরকারের আইটি বিষয়ে ব্যাপকতার কারনেই প্রযুক্তির ব্যবহার এবং এর মাধ্যমে আয়ের উৎস বেরিয়ে আসছে বলে মনে করেন তিনি। এদিকে শুধুমাত্র এই একটি প্রতিষ্ঠানই নয়, ‘দেশের ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং এর মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে সরকারিভাবেও বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। যেখান থেকে আউটসোর্সিং সহ আইটি প্রশিক্ষণ নিয়ে আয়ের পথ বেছে নিচ্ছে যুব সমাজ। এ প্রসঙ্গে বরিশালের জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান বলেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের কোন বিকল্প নেই। কেননা বাংলাদেশের শিক্ষিত যুবসমাজকে এখন আর বেকার হয়ে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে না। তারা ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখন ঘরে বসেই ফ্রিল্যান্সিং করে অর্থ উপার্যন করতে পারছে। নিঃশন্দেহে এটি ভালো কাজ। এ কাজের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান তৈরী হচ্ছে, উদ্যোক্তা তৈরী হচ্ছে। আমরা এদেরকে উৎসাহিত করে থাকি। তাদের এই কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশে নতুন সেতুবন্ধন তৈরী হয়েছে। পাশাপাশি এ প্রযুক্তিই এক সময় ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মানে সহায়ক ভুমিকা রাখবে।
