বিলুপ্ত হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণি নিরবে চলছে মৎস্য রেনু পাচার! নিরব প্রশাসন! বিলুপ্ত হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণি নিরবে চলছে মৎস্য রেনু পাচার! নিরব প্রশাসন! - ajkerparibartan.com
বিলুপ্ত হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণি নিরবে চলছে মৎস্য রেনু পাচার! নিরব প্রশাসন!

3:11 pm , April 7, 2019

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ বরিশাল বিভাগকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে নিরবে চলছে মৎস্য রেনু পাচার। প্রতি বছর প্রশাসন লোক দেখানো কিছু অভিযান পরিচালনা করতো। কিন্তু এ বছর সেই অভিযান হয় না। রহস্যজনক কারনে এবার মৎস্য বিভাগসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরব ভূমিকা পালন করছে। ওপেন সিক্রেটভাবে চলছে রেনু পাচার। যার কারনে বন্ধ হচ্ছে না রেনু শিকার। প্রশাসনের মদদে পাচারকারী চক্র অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ছে। ধরা ছোয়ার বাইরে থাকা চক্রের মুল হোতারা বহাল তবিয়তে গত ৬ বছর ধরে প্রশাসন ম্যানেজ, রুট পরিবর্তন ও বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে অবৈধভাবে মৎস্য রেনু পাচার করছে। অভিযোগ রয়েছে গুটি কয়েক রাজনৈতিক ব্যক্তি ও কথিত কয়েকজন সাংবাদিকও মাসোয়ারা নিয়ে পাচারকারীদের সহযোগিতা করছেন। গত বছর সদর উপজেলার নেহালগঞ্জ ফেরীঘাটে গভীর রাতে ট্রলার ও ট্রাক সহ একদল পাচারকারীকে আটক করে বিক্ষুদ্ধ স্থানীয় জনতা। এরপর বন্দর থানা পুলিশকে খবর দেয়া হলে পুলিশের সহযোাগতায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় পাচারকারী চক্র। এরপর নগর পুলিশের উর্ধ্বতন কতৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করেন। পরবর্তীতে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোন শাস্তি মূলক ব্যবস্থাও নেয়া হয়নি। তবে জনরোষ থেকে বাচতে এবার রুট পরিবর্তন করেছে ঐ পাচারকারী চক্র। চলতি বছর প্রায় দেড় মাস ধরে বাকেরগঞ্জ উপজেলার কবাই এলাকার লক্ষীপাশা ফেরীঘাট ও নলছিটি ফেরীঘাটকে পাচারের ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ দুই পয়েন্ট থেকে ট্রাকে রেনু পোনা ভর্তি করে ঝালকাঠি-পিরোজপুর রুটে আবার কখনো ঝালকাঠি-স্বরুপকাঠী-বানারীপারা এবং সরাসরি বরিশাল হয়ে রেনু পাচার করা হচ্ছে বিভিন্ন গন্তব্যে। গত বছর গ্রেপ্তার হওয়ার পরেও এবারও অবৈধ পচারের সিন্ডিকেটের প্রধান হোতা গোপালগঞ্জের বাসিন্দা টুলু মিয়া ও নগরীর সদর রোডের বাসিন্দা বিপ্লব, হারুন ওরফে পাতিল হারুন ও রনি। তারাই রেনু পাচার কার্যক্রমের নেতৃত্ব দেয়।
অনুসন্ধানে জানাগেছে ইতিপূর্বে নগরী থেকে এক প্রভাবশালী যুবলীগ নেতা ও তার ভাইয়ের নেতৃত্বে রাতের আধারে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার রেনু পেনা পাচার হতো। রাজনৈতিক পালা বদলের সাথে সাথে পাচারকারীরাদের ক্ষমতাবানদের সাইবোর্ড বদলে যায়। পরিবর্তন করা হয় পাচারের রুট । গত ৬ বছরে নগরীর লঞ্চঘাট থেকে বেলতলা এরপর চরকাউয়া, বাবুগঞ্জ, লাহারহাট, সাহেবেরহাট, নেহালগঞ্জ হয়ে এখন নতুন স্থান নির্ধারন করা হয়েছে বাকেরগঞ্জ উপজেলার কবাই এলাকার লক্ষীপাশা ও নলছিটি ফেরীঘাট।
এ চক্রটি পুলিশ ও মৎস্য বিভাগের কিছু অসাধূ ব্যক্তিকে ম্যানেজ করে বিপুল কালো টাকার মালিক বনে গেছেন। নগরীতে গড়ে তুলেছেন বহুতল অট্টালিকা। খোজ নিয়ে জানাগেছে ভোলা, লক্ষীপুর, নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রেনু পোনা সংগ্রহ করে নদীপথে ট্রলার যোগে বরিশাল নিয়ে এসে নির্জন এলাকা থেকে ট্রাকে করে খুলনা, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ ও ঝিনাইদহসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তা পাচার করা হচ্ছে। মৌসুমে প্রতি গভীর রাত ৩ টা থেকে ভোর ৬ টার মধ্যে রেনু বোঝাই ট্রাক পাচারের ট্রানজিট পথ অতিক্রম করে । রেনু সংগ্রহ, সংরক্ষন পাচার সম্পূর্ন নিষিদ্ধ হলেও প্রভাবশালী রানৈতিক ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় প্রশাসনের অসাধূ কর্মকর্তা ও কয়েকজন কথিত সাংবাদিককে ম্যানেজ করে চলছে অবৈধ এ ব্যবসা। তবে পূর্বে কোস্ট গার্ড ও র‌্যাবের হাতে ছোট খাটো চালান আটক হলেও এবার অদৃশ্য কারনে তাও হচ্ছেনা। সূত্র জানায়, প্রতিবছর মার্চের শেষ দিক থেকে ভোলা, লক্ষীপুর, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন উপকুলীয় অঞ্চল থেকে মশারী জালের মাধ্যমে রেণু পোনা সংগ্রহ ও বিক্রির কাজ শুরু হয়। রেনু সংগ্রহ ও বিক্রির কাজ চলে জুন মাসের শেষ সময় পর্যন্ত। জেলেদের সংগ্রহকৃত এসব রেনু পেনা পাচারের জন্য বরিশালকে রুট হিসেবে ব্যবহার করছে একাধিক চক্র। এর মধ্যে বরিশালের ট্রানজিটটি পরিচালনা করেন গোপালগঞ্জের বাসিন্দা টুলু মিয়া ও নগরীরর বাসিন্দা বিপ্লব। এছাড়া রেনু ট্রলার থেকে ট্রাকে উঠানো ও চাঁদা সরবরাহের দায়িত্ব পালন করেন হারুন ওরফে পাতিল হারুন এবং রনি। সাম্প্রতি প্রশাসনের নীরবতার সুযোগে রনি রেনু পাচারের সঙ্গে মাদক পাচার শুরু করেছেন বলেও জানা গেছে। প্রতিদিন পূর্ব নির্ধারিত স্থানে ভোলা লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগৃহীত রেনু ট্রলার যোগে নিয়ে আসা হয়। প্রতিদিন এখানে ৮০ থেকে ৯০ পাতিল রেনু ট্রাকযোগে বাগেরহাটের ফকিরহাট, বটতলা, খুলনার ফুলতলা, বড়ঘাট ও চুকনগর এবং গোপালগঞ্জ ও ঝিনাইদহের বিভিন্ন এলাকায় পাচার হচ্ছে। প্রতি পাতিলে কমপক্ষে ২০ হাজার রেনু পোনা থাকে বলে জানান একাধিক সূত্র। এসব রেনু প্রতিপিচ ৫ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। এ হিসেবে বরিশাল ঘাট থেকে প্রতিদিন ৮০ থেকে ৯০ লাখ টাকার রেনু পাচার করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এ সব নিষিদ্ধ রেনু পোনা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে ম্যানেজ করে নিরাপদ হিসেবে সড়ক ও নদী পথ দিয়ে বড় বড় ড্রাম কিংবা পাতিল ভর্তি করে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে চালান করছে একটি প্রভাবশালী দালাল চক্র। ফলে জলজ প্রাণির ওপর মারাত্মক প্রভাব ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, একটি চিংড়ির রেনু পোনা ধরার জন্য অন্য প্রজাতির নয় থেকে ১২টি রেনু পোনা ধ্বংস করা হচ্ছে। এরমধ্যে দুই হাজার প্রজাতির মাছ ও বিভিন্ন প্রকারের জলজপ্রাণি প্রতিদিন ধ্বংস হচ্ছে। যে কারনে মেঘনা, তেঁতুলিয়াসহ দখিনের নদীতে অন্য প্রজাতির মাছ ও জলজপ্রাণির ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণেই সরকার বাগদা ও গলদা প্রজাতির রেনু পোনা আহরণ ও সংরক্ষণ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। খোজ নিয়ে জানা গেছে শীত মৌসুম শেষে নদীতে পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে জেলার মেঘনা, তেঁতুলিয়াসহ দখিনের বিভিন্ন নদীতে অবাধে মশারি জাল, বিহুন্দী ও কারেন্ট জাল দিয়ে নির্বিচারে চিংড়ির রেনু পোনা (গলদা বাগদা চিংড়ি) নিধনের মহোৎসব চলছে। এসব রেনু পোনা ধরতে গিয়ে বিভিন্ন প্রজাতির অসংখ্য মাছের রেনু পোনা ধ্বংস হচ্ছে প্রতিদিন। জেলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর পাড়ে , জেলেরা মশারি জাল ও বিহুন্দী জাল দিয়ে রেনু পোনা (গলদা চিংড়ি) শিকার করছে। প্রতিবার জাল ফেলে সাত থেকে আটটি চিংড়ির রেনু পোনা পেলেও তার সাথে উঠে আসছে টেংরা, পোয়া, তপসিসহ অসংখ্য প্রজাতির মাছের পোনা। চিংড়ি পোনা আলাদা করে মাটি ও অন্যান্য পাত্রে জিইয়ে রাখলেও অন্য প্রজাতির মাছের পোনাগুলো ডাঙায় অথবা চরে ফেলে দেওয়ায় সেগুলো মারা যাচ্ছে। জেলেরা জানান, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে ম্যানেজ করে গোপালগঞ্জের জনৈক টুলুর ছত্রছায়ায় কতিপয় প্রভাবশালী দালাল ক্ষমতার দাপটে জেলেদের একপ্রকার জোরপূর্বক বাধ্য করে বিহুন্দী জাল, মশারী জাল ও কারেন্ট জাল দিয়ে রেনু পোনা নিধন করাচ্ছেন নির্বিচারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বরিশালের একাধিক রেনু ব্যবসায়ীরা বলেন, প্রভাবশালী টুলুর ছত্রছায়ায় প্রতিদিন ট্রাকভেদে ১৮ থেকে ৩০টি ড্রাম বহন করা হয়। একেকটি ড্রামে বা পাতিলে ১০-২০ হাজার করে রেনু বহন করা হয়। সে অনুযায়ী প্রতিটি ট্রাকে এক লাখ ৮০ হাজার থেকে তিন লাখ পোনা বহন করা হয়। সে হিসেবে প্রতিদিন গড়ে টুলুর মাধ্যমই ৬০ লাখ রেনু পোনা পাচার হচ্ছে। এছাড়া নদীপথে ট্রলারে পাতিল ভর্তি করে পাচার হয় আরও কমপক্ষে ৪০ লাখ রেনু পোনা। রেনু ব্যবসায়ীরা আরও বলেন, পাতিল কিংবা ড্রাম প্রতি ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের মাসে এক লাখ টাকা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীকে মাসিক কয়েক লাখ টাকা মাসোয়ারা দিয়েই ট্রাক ভর্তি করে রেনু পোনা পাচার করা হয়। মাঝে মধ্যে মাসিক টাকা দিতে বিলম্ব হলেই অভিযানের নামের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা রেনু পোনা ভর্তি ট্রাক আটক করে থাকেন।এ বিষয়ে সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সঞ্জিব দাস জানান, মোবাইল কোর্টের মাধ্যম রেনু পাচারকারীদের সাজা দেওয়া হলেও মূল পাচারকারীরা ধরা পরছে না। ফলে রেনু পাচার বন্ধ হচ্ছে না। আমরার মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছি। এ ব্যাপারে মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক ও মৎস্য বিজ্ঞানী ড. আমিনুল হক কলেন , নদী থেকে চিংড়ির রেনু ধরায় মৎস্য ভান্ডার বিরাট হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞ পর্যায় থেকে বিষয়টি দীর্ঘদিন থেকে সতর্ক করা হলেও এ বিষয়ে কার্যকরী কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় নদী থেকে চিংড়ির রেনু ধরা আজও বন্ধ হয়নি। এজন্য এখনই কৃত্রিম উপায়ে (হ্যাচারি পদ্ধতি) চিংড়ির রেণু উৎপাদন করা হলে নদী থেকে চিংড়ির রেনু ধরা অনেকটাই বন্ধ হবে। পাশাপাশি পাচাকারীদের ফেীজদারি মামলার মাধ্যমে দীর্ঘ মেয়াদে সাজা দেওয়া হলে মৎস্য রেনু রক্ষা পাবে।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT