বানারীপাড়ায় রহস্যময় ট্রিপল মার্ডার বানারীপাড়ায় রহস্যময় ট্রিপল মার্ডার - ajkerparibartan.com
বানারীপাড়ায় রহস্যময় ট্রিপল মার্ডার

3:15 pm , December 7, 2019

 

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ বানারীপাড়ায় কুয়েত প্রবাসীর পরিবারের তিন সদস্যর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল শনিবার প্রবাসীর মা, খালাতো ভাই ও ভগ্নিপতির লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সাথে ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে রাজমিস্ত্রিকে আটক করা হয়েছে। উপজেলার সলিয়াবাকপুর গ্রামের কুয়েত প্রবাসী হাফেজ আব্দুর রবের বাসায় চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। তবে একই বাসায় রাত্রিযাপন করা পরিবারের বাকি চারজনের সবাই অক্ষত রয়েছেন। তারা সবাই নারী। বাসার তিন সদস্য হত্যা হলেও বিষয়টি কেউ টের পাননি বলে দাবি করেছেন বেঁচে যাওয়া চার নারী। হত্যার শিকার হয়েছেন প্রবাসীর মা মরিয়ম বেগম (৭০), খালাতো ভাই ইউসুফ হোসেন (২২) ও মেঝ বোন মমতাজ বেগমের স্বামী অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক শফিকুল আলমের (৬০)। আটক রাজমিস্ত্রি হলো- জাকির হোসেন (৩৫)। নলছিটি উপজেলার সিদ্ধকাঠী ইউনিয়নের উত্তর রাজপাশা গ্রামের চুন্নু হাওলাদারের ছেলে। অক্ষত প্রবাসীর স্ত্রী ও ভাইয়ে কন্যা কলেজ ছাত্রীর বক্তব্যে চাঞ্চল্যকর ওই ট্রিপল মার্ডারে ঘটনা পরকিয়া প্রেমের কারনে হয়েছে। রাজমিস্ত্রি জাকির হত্যাকান্ডের মুলহোতা। এতে প্রবাসীর স্ত্রী ও ভাইয়ের কন্যা কলেজ ছাত্রীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। জড়িত রয়েছে এক গ্রাম্য কবিরাজ। এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন
করেছেন অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এহসানউল্ল্যাহ, পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলামসহ র‌্যাব, পুলিশ, সিআইডি (পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ), পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনসহ (পিবিআই) আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট।
স্বজনেরদ বরাত দিয়ে বানারীপাড়া থানার ওসি শিশির কুমার পাল জানান, হাফেজ আবদুর রব কুয়েতের একটি মসজিদে ইমামতি করেন। শনিবার ভোরে তার বাসার বেলকনী থেকে বৃদ্ধা মা মারিয়া বেগমের এবং অপর একটি কক্ষ থেকে ভগ্নিপতি শফিকুল আলম’র মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া বাড়ির পেছনে পুকুর থেকে ভ্যানগাড়ি চালক খালাতো ভাই ইউসুফের হাত-পা বাধা লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, ‘শুক্রবার রাত ৯টার দিকে বাড়িতে থাকা সাত সদস্য ঘুমাতে যায়। নিহতের স্বজনরা জানিয়েছেন, ‘মাত্র দু’দিন আগেই শফিকুল ইসলাম নিজ বাড়ি স্বরুপকাঠি থেকে বানারীপাড়ায় শ্বশুর বাড়িতে বেড়াতে আসেন। তাছাড়া পার্শ্ববর্তী দাড়ালিয়া এলাকা থেকে রাতে থাকার জন্য এসেছিলো ইউসুফ।
নিহত মরিয়ম বেগমের পুত্রবধূ মিশরাত জানান, শুক্রবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে রাতের খাবার খেয়ে সকলে ঘুমিয়ে পড়েন। তিনি, কন্যা নুরজাহান (৪) ও ইশফাত (৯) ও দেবর হারুন-অর রশিদের মেয়ে চাখার সরকারী ফজলুল হক কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্রী আছিয়া আক্তার ওরফে আফিয়া এক ঘরেই ছিলেন। ভোরে ফজরের নামাজ পড়তে উঠে বারান্দায় মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। তবে কিভাবে এবং কেন এই হত্যাকান্ড সে সম্পর্কে কিছু জানে না বলে দাবি করেছেন তিনি।
আফিয়া বলেন, ভোরে ফজরের নামাজ পড়ার জন্য ঘুম থেকে উঠে দাদিকে জাগাতে যান। তখন গিয়ে দাদির রুমের বারান্দার দরজা খোলা এবং তার নিথর দেহ বারান্দায় পরে রয়েছে। এরপর চিৎকার দিলে বাড়ির সবাই আসেন কিন্তু ফুপা শফিকুল আলম ও চাচা ইউসুফকে দেখতে না পেয়ে তাদের খুজতে থাকি। তখন ঘরের অন্য একটি কক্ষে গিয়ে ফুপার লাশ দেখতে পাই। পরে চাচা ইউসুফকে খুজতে ছাদের দিক গেলে সেখানে দরজা খোলা পাই, তবে কারো দেখা মেলেনি। এরপর বাড়ির বাহিরে খোঁজা শুরু করলে চাচা ইউসুফকে পুকুরের ঘাটলায় হাত-পা বাঁধা অবস্থায় লাশ দেখতে পাই। ওই পরিবারের দাবি, ঘরের ভেতরের একটি আলমিরা থেকে কিছু অলংকার খোয়া গেছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আব্দুর রকিব জানান, জাকির হোসেন ওই বাসায় রাজমিস্ত্রির কাজ করতো। তাই পরিবারের সকলের সাথে সুসম্পর্ক ছিল। তাই বিভিন্ন কাজে ওই বাড়িতে প্রায়ই আসতো। যার ধারাবাহিকতায় শুক্রবার রাতেও সে এসেছিল। পরে আবার চলে যায়। তাই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য জাকিরকে আটক করা হয়েছে।
পুলিশ সুপার মোঃ সাইফুল ইসলাম জানান, ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত বেশ কিছু আলামত উদ্ধার করেছে। তিনি আরও জানান, নিহতদের পরিবারের স্বজনদের সাথে কথা বলে পুরো ঘটনা হত্যাকান্ড বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। তিনি বলেন, তিনজনের মৃতদেহের নাক ও কান থেকে রক্তক্ষরণ হয়েছে। তাদের খাবারে বিষাক্ত কিছু মেশানো ছিল। পরে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ কিংবা আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার। তিনি বলেন, হত্যার রহস্য উদঘাটন ও জড়িতদের গ্রেফতারে র‌্যাব, পিবিআই ও সিআইডি সহ সম্মিলিতভাবে কাজ করছে পুলিশ। দ্রুতই এ মামলার অগ্রগতি জানানো হবে।
জিজ্ঞাসাবাদে প্রবাসীর স্ত্রী মিশু জানিয়েছে তার কক্ষের স্টিলের আলমিরার ড্রয়ার থেকে বেশ কিছু স্বর্নালঙ্কার ও তিনটি মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ওই তিনটি মোবাইলের মধ্যে একটি তার ও অপর দু’টি হত্যাকান্ডের শিকার হওয়া শাশুড়ি ও ননদ জামাতার। স্বর্নালঙ্কার ও মোবাইল ফোন নিয়ে গিয়ে হত্যাকান্ডের বিষয়টি ডাকাতি প্রমানের চেষ্টা করা হয়েছে বলে পুলিশ ধারনা করছে।
পুলিশকে আফিয়া জানিয়েছে রাতে বিল্ডিংয়ের সব দরজা বন্ধ করে ঘুমানো হলেও ভোরে মূল দরজা ও ছাদের চিলে কোঠার দরজা খোলা পেয়েছে। তার এ বক্তব্য সঠিক হলে ধারণা করা হচ্ছে শুক্রবার গভীর রাতে দরজা খুলে দিয়ে ঘাতকদের ভিতরে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে বলে ধারনা করছে পুলিশ।
জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে মিশু ও আছিয়া জানিয়েছে, শুক্রবার রাতে রাজমিস্ত্রি জাকির হোসেন ও অপর এক বেটে মতো দাড়িওয়ালা ব্যক্তি তাদের ঘুম থেকে জাগিয়েছে। এ সময় মিশুকে বিবস্ত্র করে জাকির হোসেন আপত্তিকর ছবিধারন করে। তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিকে দিয়ে জাকির হোসেন বিবস্ত্র মিশুকে জড়িয়ে ধরা অবস্থায় বেশ কিছু আপত্তিকর ছবিধারন করেছে। হত্যাকান্ডের বিষয়ে মুখ খুললে ওই ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছে রাজমিস্ত্রি জাকির। এছাড়াও তাদের দু’জনকে কোরআন শরীফ স্পর্শ করিয়ে এ বিষয় কাউকে না বলার জন্য কসম কাটানো হয়। এ হত্যাকান্ডের বিষয় কাউকে জানালে জ্বীন ও পরীর মাধ্যমে তাদের ক্ষতি করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়। বিশেষ করে মিশুর দুই শিশু সন্তানের বড় ধরণের ক্ষতি হবে বলেনও হুশিয়ারী দেওয়া হয়।
আছিয়া আক্তার আরও জানান বিয়ে হলেও তার কখনও সন্তান হবে না এবং মিশু জানান তার লিভার রোগ রয়েছে জানিয়ে জিনের বাদশা দাবীদার জাকির হোসেন এর আগে তাদের দু’জনকে বিভিন্ন তদবির দেন। পুলিশ ওই বাসা থেকে তদবির দেওয়া তাবিজ কবচ ও পাটা-পুতা উদ্ধার করেছে। জ্বীন-পরীর ভয় দেখিয়ে ওই পরিবারটিকে গত তিন বছর পর্যন্ত জিম্মি করে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদিকে শুক্রব্রা ভোর রাত ৪টায় প্রবাসীর স্ত্রী মিশু তার ব্যক্তিগত বিকাশ একাউন্ট থেকে রাজমিস্ত্রি জাকির হোসেনের কাছে ৫ হাজার টাকা পাঠিয়েছে। যা নিয়ে রহস্য আরও ঘণীভূত হয়। ফলে এ ট্রিপল হত্যাকান্ডে পরকীয়া প্রেম রয়েছে। আলোচিত এ হত্যাকান্ডে প্রবাসীর স্ত্রী মিশরাত জাহান মিশু ও কলেজ ছাত্রী আছিয়া আক্তারের কোন সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তাদের দু’জনকে জিঙ্গাসাবাদের জন্য আটকও করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এদিকে এ ঘটনার রহস্য উদঘাটনে ওই বিল্ডিংয়ের নির্মাণ শ্রমিক (রাজমিস্ত্রি) জাকির হোসেনকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও সে মুখ খুলছে না। শুক্রবার রাতে সে বরিশাল নগরীর সাগরদী এলাকায় ভাগ্নে তরিকুলের বাসায় ছিলো বলে দাবী করেন। তবে তরিকুল জানান, তার মামা জাকির ওই দিন রাতে তার কাছে ছিলেন না। এদিকে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জাকির হোসেনকে নিয়ে র‌্যাব-পুলিশ বরিশাল শহর সহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছেন।
অপরদিকে শনিবার সকাল থেকে বাড়িটিকে ঘিরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি গ্রামবাসী অবস্থান করছে। তিনজনের একসাথে নিহতের ঘটনায় শোকাহত স্বজনসহ গ্রামবাসী।

এই বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT