৮ ডিসেম্বর বরিশাল মুক্ত দিবসে উন্মুক্ত হবে ৭১’র নিরব সাক্ষী ওয়াপদার টর্চার সেল ৮ ডিসেম্বর বরিশাল মুক্ত দিবসে উন্মুক্ত হবে ৭১’র নিরব সাক্ষী ওয়াপদার টর্চার সেল - ajkerparibartan.com
৮ ডিসেম্বর বরিশাল মুক্ত দিবসে উন্মুক্ত হবে ৭১’র নিরব সাক্ষী ওয়াপদার টর্চার সেল

2:58 pm , December 5, 2019

খান রুবেল ॥ মুক্তিযুদ্ধের নিরব সাক্ষী নগরীর ওয়াপদা কলোনীর টর্চার সেল। যেখানে বাঙালী মা-বোনদের ধরে এনে ধর্ষণ-নির্যাতন করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাসহ বাঙালীদের ব্রাশফায়ার করে গণহত্যার পর লাশ ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে ওয়াপদার পাশর্^বর্তী খালে। আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সেই টর্চার সেল, বাংকার আর বধ্যভূমির ব্রিজটি। যা স্মরন করিয়ে দেয় মুক্তিযুদ্ধের সেই রোমহর্ষক ঘটনা। যেখানে পা রাখতেই শিউরে উঠছে শরীর। তবে দীর্ঘ বছর অবহেলা আর অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকা মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজরিত সেই টর্চার সেল বা বধ্যভূমি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতি বরিশাল সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। তার নিরলস প্রচেষ্টায় ৭১’র নির্মম নির্যাতনের অবয়ব ফিরিয়ে আনতে নতুন আঙ্গিকে সাজানো হচ্ছে বধ্যভূমি। আর এতে সহযোগিতা করছে প্রত্মতত্ত্ব অধিদপ্তর ও মুক্তিযোদ্ধা জাদুঘর। মুক্তিযুদ্ধের অবয়ব সাজে সজ্জিত নতুন এই বধ্যভূমির উদ্বোধন এবং উন্মুক্ত হবে আগামী ৮ই ডিসেম্বর ‘বরিশাল হানাদার মুক্ত দিবসে’। যা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের’র উদ্বোধনের কথা রয়েছে। তাই বধ্যভূমি এলাকায় চলছে শেষ সময়ের মহা কর্মযজ্ঞ। ইতিহাস থেকে জানাগেছে, ‘একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিকামী বাঙালিদের ওপর গণহত্যা শুরু করে। তবে বরিশালে পাকিস্তানি বাহিনী প্রবেশ করে ২৫ এপ্রিল। ওই দিন গানবোট ও হেলিকপ্টারে করে হানাদার বাহিনীর একাধিক গ্রুপ স্টিমার ঘাট, বিসিক ও চরবাড়িয়া এলাকা দিয়ে শহরে প্রবেশ করে। চরবাড়িয়া থেকে আসা গ্রুপটি লাকুটিয়া সড়ক ধরে শহরে আসার পথে নির্বিচারে বাঙালিদের হত্যা করে। ওই গ্রুপটি সন্ধ্যায় এসে ওঠে নতুন বাজার পুলিশ ফাঁড়িতে। অন্য দুটি গ্রুপ দখল করে শহরের অশি^নী কুমার হল ও জিলা স্কুল। পাকিস্তানি সোনাদের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উঠে সার্কিট হাউসে। ২৯ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিপরিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওয়াপদা কলোনি দখল করে তাদের ক্যাম্প বানায়। ক্যাম্পের পশ্চিম দিকে সাগরদী খালের তীরে বাংকার তৈরি করে সশস্ত্র পাহারা বাসায় পাকিস্তানি সেনারা। যার দুটি বাংকার আজও পড়ে আছে। মুক্তিযোদ্ধারা জানিয়েছেন, ‘ওয়াপদা কলোনি ছিল অপেক্ষাকৃত নির্জন এলাকা। এ কারণে হানাদাররা সেখানে তাদের ক্যাম্প ও একাধিক ভবনে টর্চার সেল স্থাপন করে। আর ওয়াপদা কলোনীর এ ক্যাম্প থেকেই ঝালকাঠি, পটুয়াখালী ও ভোলায় অপারেশন চালাত পাকিস্তানিরা। তাছাড়া ওয়াপদা কলোনীর ২৫ নম্বর ভবনে শত শত বাঙালি মুক্তিকামী নারী-পুরুষকে ধরে নিয়ে গণহত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতন করা হয়। ক্যাম্পের পাশ ঘেষে বয়ে যাওয়া সাগরদী খালে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে অনেক মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিকামী মানুষের মৃতদেহ। যাদের মধ্যে শহীদ মজিবর রহমান কাঞ্চন, শহীদ আলমগীর ও শহীদ নজরুলের নাম জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা। এছাড়া স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক কাজী আজিজুল ইসলামকে ৭১’র ৫ মে ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানী সেনারা। ওয়াপদা কলোনির পেছনে দক্ষিণ পাশে খাদ্য বিভাগের কর্মচারীরা তার মরদেহ দাফন করেন। স্বাধীনতার দীর্ঘ বছর পরে জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল আলমের উদ্যোগে শহীদ কাজী আজিজুল ইসলামের সামাধি যথাযথ মর্যাদায় সঙ্গে সংরক্ষণ করা হয়েছে। বধ্যভূমির করুণ স্মৃতি ধরে রাখতে ওয়াপদা কলোনির দক্ষিণ পাশে কীর্তনখোলা নদীরতীরে বধ্যভূমি স্মৃতি ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানী বাহিনী ওয়াপদা কলোনির যেসব ভবনে বাঙালি নারী-পুরুষদের ধরে নিয়ে ভয়াবহ নির্যাতন চালাত, দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃৎ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সেই স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের উদ্যোগ নিচ্ছিলো না কেউ। যদিও তৎকালিন সিটি মরহুম শওকত হোসেন হিরনের আমলে এটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হলেও তার মৃত্যুতে সংরক্ষণ কার্যক্রম ভেস্তে যায়। এর পর বরিশালের মুক্তিযোদ্ধা এবং সুশীল সমাজের দীর্ঘ আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সাবেক মেয়র আহসান হাবিব কামাল বধ্যভূমি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। বিসিসি’র সাবেক প্যানেল মেয়র এবং বর্তমান কাউন্সিলর সংরক্ষণ কাজ করেন। কোন প্লান পরিকল্পনা ছাড়াই সংরক্ষণ কাজের নামে লুটপাটের অভিযোগ উঠে। তার পাশাপাশি বধ্যভূমি সংরক্ষণের নামে একটি মিনি পার্কের আদলে গড়ে তোলা হয় বধ্যভূমি। যা মুক্তিযোদ্ধা, সুশীল সমাজসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। যে কারনে বর্তমান মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ দায়িত্ব গ্রহনের পরে পূর্বের ঠিকাদারের বিল আটকে দেন। সেই সাথে নতুন করে বধ্যভূমি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন তিনি। বধ্যভূমি সংরক্ষণ কাজ পর্যবেক্ষণ এবং দেখভালের দায়িত্বে থাকা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ দুলাল বলেন, ‘বধ্যভূমির ব্যাপারে আমাদের মেয়র মহোদয় খুবই আন্তরিক। তার প্রচেষ্টার কারনেই আজ বধ্যভূমিতে মুক্তিযুদ্ধের অবয়ব ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে। পাশাপাশি সংরক্ষণের কারনে বধ্যভূমি ইতিহাসের দলিল হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, ‘বধ্যভূমিতে দুটি বিল্ডিং রয়েছে। যেখানে পাকিস্তানীদের ক্যাম্প এবং বাঙালী মুক্তিকামী নারীদের ধরে নিয়ে ধর্ষণ-নির্যাতন করা হতো। মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করা হতো। এ ভবন দুটি সংরক্ষণে চার দিক থাই গ্লাস দিয়ে আটকে দেয়া হবে। এরই মধ্যে এটি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। এছাড়া পাশেই থাকবে গ্যালারী নির্মান করা হচ্ছে। সেখানে মুক্তিযুদ্ধকালিন বধ্যভূমির বিভিন্ন নির্যাতনের দলিলপত্র প্রদর্শন করা হবে। ইতিহাসের বর্ণনামুলক ১৫টি ফলক, দুটি বাংকার রয়েছে, সে দুটিও সংরক্ষণ করা হয়েছে। ওয়াপদা কলোনির পাশে সাগরদী খালের উপর যে ব্রিজটি রয়েছে সেখানে ‘৭১ নামের একটি স্মৃতি ফলক’ নির্মান কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। যেখানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হবে। বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা বেলায়েত হাসান বাবলু বলেন, বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের বৃহৎ নির্যাতন কেন্দ্র বধ্যভূমি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যে বিসিসি’র অর্থায়নে ‘বধ্যভূমি সংরক্ষণ কাজ করা হচ্ছে। এর প্রাথমিক ব্যয় ৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা নির্ধারন করা হয়েছে। আগামী ৮ ডিসেম্বর বরিশাল মুক্ত দিবসে এ বধ্যভূমি উদ্বোধন করা হবে। যদিও বধ্যভূমি সংরক্ষণ কাজ পুরোপুরিভাবে শেষ হয়নি। আপাতত বধ্যভূমির ‘একাত্তর স্মৃতি ফলক ও ব্রিজের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়েছে। এ কারনে ‘৭১ স্মৃতি ফলকসহ একাংশের উদ্বোধন করা হবে ওই দিন। তিনি বলেন, ‘৮ ডিসেম্বর বরিশাল মুক্তি দিবস ছাড়াও ওই দিন মহানগর আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন। ওই সম্মেলনে প্রধান অতিথি থাকবেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের-এমপি। তাকে দিয়েই বধ্যভূমি উদ্বোধন করানো হতে পারে। তবে এ বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT