বাংলাদেশী দুই বিজ্ঞানীর সফলতা ॥ প্লাস্টিক-পলিথিন থেকে হবে ডিজেল ও কেরোসিন বাংলাদেশী দুই বিজ্ঞানীর সফলতা ॥ প্লাস্টিক-পলিথিন থেকে হবে ডিজেল ও কেরোসিন - ajkerparibartan.com
বাংলাদেশী দুই বিজ্ঞানীর সফলতা ॥ প্লাস্টিক-পলিথিন থেকে হবে ডিজেল ও কেরোসিন

5:54 pm , October 6, 2018

সাঈদ পান্থ ॥ ধ্বংস হয় না প্লাস্টিক ও পলিথিন। আধুনিক জীবনযাত্রার অন্যতম এই পদার্থ একদিকে আমাদের জীবনযাত্রাকে উন্নত করছে। অন্যদিকে বিষিয়ে তুলছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র। তবে ফেলে দেয়া প্লাস্টিক ও পলিথিন থেকেও মুক্তি পাওয়ার সুযোগ এসেছে বরিশালবাসীর। বরিশালের কৃতি সন্তান আমেরিকা প্রবাসী বিজ্ঞানী আনজুমান আরা ও তার স্বামী বিজ্ঞানী ড. মইনউদ্দিন সরকার বাদল প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি তেল (ডিজেল) উৎপাদন করছেন। বরিশাল সিটিসহ দেশের ৪ সিটিতে এই প্রযুক্তির প্রয়োগ করতে চান এই বিজ্ঞানী দম্পত্তি। বিশেষ করে বরিশালের সন্তান হিসেবে আনজুমান আরা এই নগরীকে “গ্রীণ এন্ড ক্লিন” হিসেবে দেখতে চান।

আমেরিকা প্রবাসী বিজ্ঞানী আনজুমান আরা বরিশালের আলো বাতাসে বেড়ে উঠেছেন। তিনি নগরীর অক্সফোর্ড মিশন রোডের বাসিন্দা আলাউদ্দিন মিয়ার বড় মেয়ে। বরিশাল জিলা স্কুলের শিক্ষক ছিলেন আলাউদ্দিন মিয়া। তিনি অবসরে গিয়েছেন নৌ পরিবহন মন্ত্রনালয়ের ডেপুটি কমিশনার হিসেবে। বিজ্ঞানী আনজুমান আরা বরিশাল সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন।

জানা গেছে, প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সাথে সাথে টিভি, ফ্রিজ, মাইক্রো ওভেন, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, এয়ারকন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিন, ডিভিডি প্লেয়ার, সিএফএল বাল্ব, পানির বোতল, খেলনা, ব্যাগসহ প্লাস্টিকের বহু পণ্য ব্যবহার হচ্ছে আমাদের প্রতিদিনকার জীবনে। কয়েক বছর ব্যবহারের পর যখন এসব পণ্যের কর্মক্ষমতা শেষ হয় তখন তাদের ঠিকানা হয় ডাস্টবিনে। বিভিন্ন আবর্জনা ফেলার স্থান হিসেবে আমাদের দেশের নদী-নালা, ডোবা এমনকি উন্মুক্ত স্থানও ব্যবহার করা হয়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কোনো কোনো বর্জ্য থেকে লোহা অংশ রেখে বাকিটা ফেলে দেন। বাংলাদেশে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে দেশে প্রতি বছর ১০ মিলিয়ন মেট্রিক টন ইলেকট্রনিক্স ওয়েস্ট ও প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। একইভাবে শুধু মাত্র বরিশাল সিটিতে প্রতি বছর ২৭ মেট্রিকটন বর্জ্য (ইলেকট্রনিক্স ওয়েস্ট ও প্লাস্টিক) তৈরি হয়। ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে দেশের চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি তৈরি সম্ভব বলে মনে করেন বিজ্ঞানী ড. মইনউদ্দিন সরকার বাদল ও আনজুমান আরা। প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি তেল উৎপাদন করে ইতিহাস সৃস্টি করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এই দুই বিজ্ঞানী।

বিজ্ঞানী আনজুমান আরা বলেন, ‘২০০৫ সালে মার্কিন সরকার আমাদের একনিষ্ঠ গবেষণার জন্য ব্রিজপোর্টে বরাদ্দ করে ৫৭ হাজার বর্গফুট জায়গা। প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা বিনিয়োগ পেয়েছি দেড় কোটি ডলার। এই অর্থ দিয়ে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও স্যানিটেশন কোম্পানির কাছ থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য কিনে সরাসরি তেল উৎপাদনে নেমে পরি আমরা।’ বিজ্ঞানী ড. মইনউদ্দিন সরকার বাদল জানান, প্লাস্টিক ছাড়া বর্তমান পৃথিবীর কথা ভাবা যায় না। একুশ শতকে পৃথিবীর ব্যাপক পরিবর্তন মানুষকে প্রযুক্তিনির্ভর করে ফেলেছে। তারা নিয়মিতভাবে সহজলভ্য প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করছে। আমরা গবেষণায় দেখেছি, বিশ শতকে পৃথিবীতে উৎপাদিত হয়েছে ৬০০ কোটি টন প্লাস্টিক। যে প্লাস্টিক মানুষ ব্যবহার করে তা পরিবেশের ঝুকি বাড়াচ্ছে। কারণ প্লাস্টিকের ক্ষয় হয়না, নষ্ট হয় না। ড্রেন, নালা, শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। এর ফলে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। প্লাস্টিক বর্জ্যের ঝুঁকি মোকাবিলা ও বিকল্প জ্বালানি তৈরি নিয়ে আমরা গবেষণা শুরু করি। আমরা সফল হয়েছি। প্লাস্টিক আসলে এক রকমের অশোধিত তেল। এই তেল ঠান্ডা করে যে কোনো আকৃতি দেওয়া যায় এবং সংরক্ষণ করা যায়। এর একটি অংশ দিয়ে শপিং ব্যাগ, পাত্র, খেলনা ও নানা রকমের শো-পিস তৈরি করা যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা নানা বাধাঁর সম্মুখীন হয়েছিলাম। সেসব বাধাঁ অতিক্রম করেছি। এখন আমাদের লক্ষ্য বছরে ২০ থেকে ৩০ কোটি ব্যারেল তেল উৎপাদন।

জানা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্লাস্টিক উৎপাদনের ১৩ শতাংশ কঠিন বর্জ্যে পরিণত হয়। সেখানকার পরিবেশ রক্ষা সংস্থার হিসেবে প্রতি বছর তৈরি হয় পাঁচ কোটি টন প্লাস্টিক সামগ্রী। তার তিন কোটি দুই লাখ টন একবার ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া হয়। এক শতাংশ পুনঃব্যবহারযোগ্য, বাকিটা সরাসরি পরিবেশ দূষিত করে। কিছু গিয়ে পড়ে সাগরে। বাংলাদেশের বরিশাল তথা সারা দেশের চিত্র বেশ উদ্বেগজনক। কারণ প্লাস্টিক বর্জ্যের বিকল্প ব্যবহার নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যা পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্থ করছে। পরিবেশের এই বিপুল ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া এবং প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে তেল উৎপাদনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক বিপর্যয় কিছুটা হলেও রোধ করা সম্ভব। প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে অপরিশোধিত তেলে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন ৭০৭ থেকে ৭৫২ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা। আর এ প্রক্রিয়ায় যে তেল উৎপাদন করা হবে, তা বাজারের অন্য জ্বালানি থেকে আলাদা নয়। বরং আরও উন্নত। এই জ্বালানি দিয়ে গাড়ি, জেনারেটরসহ সব রকমের ইঞ্জিন চালানো সম্ভব। আর প্রতি গ্যালন তেল তৈরিতে ব্যয় হবে মাত্র এক ডলার।

আনজুমান আরা ও ড. মইনউদ্দিন সরকার নিউ ইর্য়কের ব্রিজপোর্ট ও নিউজার্সিতে প্লান্ট গড়ে তুলেছেন। তার কোম্পানির নাম ডধংঃব ঞবপযহড়ষড়মরবং খখঈ (ডঞখ)। শুধু প্লাস্টিক থেকে তেল তৈরির কাজ করছে এই কোম্পানি। এই তেলের নাম এনএসআর ফুয়েল। ড. সরকার এই প্রতিষ্ঠানের ভাইস প্রেসিডেন্ট, উদ্ভাবক ও বিজ্ঞানীদের প্রধান এবং আনজুমান আরা প্রতিষ্ঠানের কো-ফাউন্ডার ও নির্বাহী পরিচালক। তাদের কোম্পানির পাশাপাশি এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তেল উৎপাদন করছে আরও একটি কোম্পানি। তবে সরকার জানান, এনএসআর ফুয়েলের বিশেষত্ব হচ্ছে এটি পরিবেশবান্ধব। এতে কোনো সালফার থাকবে না। অন্য যারা এই জ্বালানি তৈরি করছে তাতে সালফার রয়েছে। সালফার থাকার কারণে এগুলো যখন ব্যবহৃত হচ্ছে তখন বাতাসে সালফার-ডাই-অক্সাইড ছড়াচ্ছে। যা পরিবেশের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে উৎপন্ন ৯৫ শতাংশ তেল, বাকি ২ ভাগ হালকা গ্যাস, ৩ ভাগ অবশিষ্ট বর্জ্য থেকে যাবে। এই বর্জ্য যেন পরিবেশকে ক্ষতি না করে সে ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

মইনউদ্দিন সরকার বাদল ও আনজুমান আরা ১৯৯২ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে এমএসসি পাস করে বিদেশে পাড়ি জমান। বাদল ১৯৯৬ সালে লন্ডনের ম্যানচেস্টার ইন্সটিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে পিএইচডি লাভ করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল ‘হাই টেম্পারেচার সুপার কনডাক্টিং অক্সাইড’। তারা গবেষণা করেছেন যুক্তরাজ্যে (১৯৯১-১৯৯৬), তাইওয়ানে (১৯৯৬-১৯৯৯), বার্লিনে (১৯৯৯-২০০০) এবং ২০০১ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। কাজ করেছেন কানাডা, জার্মানি, নেদারল্যান্ডসে। তাইওয়ানে গবেষণার সময় বাদল সরকারের গবেষণার সঙ্গী ছিলেন রসায়নে নোবেলজয়ী ড. ইউয়ান লি। ২০১০ সালে প্লাস্টিক থেকে তেল উৎপাদনের পেটেন্ট করেন। তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত বেড়ে ওঠা প্রযুক্তিগুলোর অন্যতম। পুনঃব্যবহার বা রিসাইক্লিংয়ের জন্য বর্জ্য সংগ্রহ করার ফলে যেমন কর্মসংস্থান বাড়বে তেমনি প্রয়োজনীয় জ্বালানি তৈরি করা যাবে। এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে মানুষের প্রয়োজনীয় গ্রিন টেকনোলজির চাহিদাও পূরণ হবে। দিন দিন আমাদের প্লান্ট প্রসারিত হচ্ছে। সুযোগ হলে বাংলাদেশের ৪টি সিটি কর্পোরেশনে ও ইন্ডিয়ায় এ রকমের প্লান্ট করতে চাই। তাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা পাবে এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা সুরক্ষিত হবে।

আনজুমান আরা বলেন, এ ধরনের প্লান্ট বরিশালে স্থাপন করা গেলে পরিবেশ রক্ষা পাবে। হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃস্টি হবে। পাশাপাশি বরিশাল সিটি কর্পোরেশের জালানী তেলের অভাব লাঘব হবে। এতে করে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন একটি গ্রীন সিটিতে রূপান্তরিত হবে। ধারনা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালে সমুদ্রে মাছের চেয়ে প্লাস্টিকই বেশি থাকবে। তাহলে বুঝতেই পারছেন পৃথিবী কতোটা হুমকিতে। এই প্লাস্টিক দিয়ে মেশিনের একদিকে ডিজেল, আরেকদিকে গ্যাস, অন্যদিকে কেরোসিন গড়গড় করে বের হচ্ছে। এমন একটি প্রকল্প তাদের রয়েছে। যা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন বিজ্ঞানী ড. মঈনউদ্দীন সরকার বাদল ও আনজুমান আরা। নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ক গবেষণায় অবদান রাখায় স্বীকৃতিস্বরূপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল রেনেওয়াবেল এনার্জি ইনোভেটর অফ দা ইয়ার ২০১০ সালে এই প্রতিষ্ঠান পুরস্কৃত হয়েছে। এছাড়া একাধিক আন্তর্জাতিক সম্মান লাভ করেছে বরিশালের কৃতি সন্তান আনজুমান আরা ও ড. মঈনউদ্দীন সরকার বাদলের উদ্ভাবনী পণ্য।

এই বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১  
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT