বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের ৩৫ কিলোমিটার সড়ক এখন মরণ ফাঁদ

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কে মরণ ফাঁদে পরিনত হওয়া বড় বড় গর্ত ঈদের আগেই মেরামতের দাবী জানিয়েছে বাস মালিকরা। অন্যথায় ঈদের এক সপ্তাহ পর ধর্মঘটের যাওয়ার ঘোষনা দিয়েছে তারা। এর আগে একই দাবীতে মানববন্ধন, প্রতিকী সড়ক অবরোধ ও সড়ক ভবন ঘেরাও কর্মসুচী পালন করা হবে। গতকাল শনিবার সংবাদ সম্মেলন করে দাবী জানানোসহ কর্মসুচী ঘোষনা দিয়েছে বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপ।
নগরীর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল নথুল্লাবাদে সংগঠনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে ঘোষিত কর্মসুচীর মধ্যে রয়েছে, আজ (রোববার) নগরীর নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় মানববন্ধন, বৃহস্পতিবার (২৪ আগষ্ট) প্রতিকী সড়ক অবরোধ এবং আগামী রোববার (২৭ আগষ্ট) বরিশালের সড়ক ভবন ঘেরাও। এরপরেও মহাসড়কের খানাখন্দ মেরামত না হলে, ঈদ-উল-আযহার সাত দিন পরেই বাস চলাচল বন্ধ রাখা হবে। সংগঠনটির সভাপতি আফতাব হোসেন জানান, মহাসড়কের জয়শ্রী থেকে ভুরঘাটা পর্যন্ত প্রায় ৩৫ কিলোমিটার রাস্তা এখন মরণ ফাঁদে পরিনত হয়েছে। পুরো রাস্তা জুড়ে বড় বড় গর্তের কারনে ঘটছে একের পর এক দুর্ঘটনা। এসব গর্তে বাস- ট্রাক আটকে পড়ে। এতে দীর্ঘ সময় ধরে অন্যান্য যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। যানবাহনের দীর্ঘ সারি দুর্ঘটনাস্থল পার হতে অপেক্ষায় থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা। আর কয়েকদিন পর ঈদ। যাত্রীর সাথে সাথে যানবাহন বাড়বে কয়েকগুন। চলাচল অনুপযোগী মহাসড়কে খানাখন্দের কারণে বড় ধরণের দুর্ঘটনার সম্ভাবনা রয়েছে। এ থেকে রক্ষায় বরিশালে এসে মহাসড়ক মেরামতের নির্দেশ দিয়েছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। দ্রুত কাজ শুরু করা না হলে চাকুরিচ্যুতর হুশিয়ারী উচ্চারন করেছিলেন মন্ত্রী। নির্দেশের পনের দিন পেরিয়ে গেলেও কাজ শুরু করা হয়নি। বর্ষার অজুহাতে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। বাস মালিকরা এই জন্য দায়ী করছেন সড়ক ও জনপদ বিভাগ এবং ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে। তাই যাত্রী স্বার্থরক্ষা ও পরিবহনের ক্ষতি এড়াতে আপাতত আল্টিমেটাম দিয়ে তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষনা দেয়া হয়েছে। বরিশাল সড়ক ও জনপদ বিভাগ সূত্রে জানাগেছে, প্রায় বছর খানেক পূর্বে ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক’র দুই পাশে ৬ ফুট বাড়ানোসহ মেরামতের দরপত্র আহ্বান করা হয়। দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে কাজ সম্পন্নের কার্যাদেশ পেয়েছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এমএম বিল্ডার্স ও এমএসএএমপি জেভি লিমিটেড। কার্যাদেশ পাওয়ার প্রায় এক মাসের মাথায় মহাসড়কের নগরীর কাশিপুর থেকে ভুরঘাটা পর্যন্ত মেরামত এবং বর্ধিতকরন কার্যক্রম শুরু করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। নগরীর কাশিপুর থেকে রহমতপুর পর্যন্ত একাংশের কাজ সম্পন্ন হলেও চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়া উজিরপুরের জয়শ্রী থেকে ভুরঘাটা পর্যন্ত বাকি রয়েছে। তবে দুই পাশের বর্ধিত করা শেষ হয়েছে। মেরামতের কাজ শুরু না করায় বড় বড় খানাখন্দ সৃষ্টি হয়ে মরণ ফাঁদে পরিনত হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের জবাবে বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি আলহাজ্ব মো. আফতাব আহমেদ বলেন, দীর্ঘ দিন ধরেই মহাসড়কে সংস্কার কাজ বন্ধ হয়ে আছে। তার মধ্যে টানা বৃষ্টির কারনে রাস্তার ঢালাই উঠে গিয়ে বড় বড় খানাখন্দের সৃষ্টি হওয়ায় বিশাল অংশের এই সড়কটি এখন যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। চলাচলে যানবাহনের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। সেই সাথে দুর্ঘটনাও বেড়ে গেছে।
তিনি বলেন, মহাসড়ক বর্ধিত করন কাজ শেষ হয়েছে অনেক আগে। তাতে মাটি এবং নামে মাত্র ঢালাই করা হয়েছে। যে কারনে বর্ষা মৌসুমে বর্ধিত অংশে বৃষ্টির পানি জমে ডোবায় পরিনত হয়েছে। ওই স্থানে বাস কিংবা ট্রাকের চাকা গেলেই তা দেবে গিয়ে যানবাহন আটকা পড়ছে। ঘন্টার পর ঘন্টা বরিশাল-ঢাকা রুটে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে থাকছে। বিশেষ করে উজিরপুরের জয়শ্রী, বামরাইল, বাটাজোর, মাহিলাড়া, বেজহার, কাসেমাবাদ, হ্যালিপ্যাড, আশোকাঠী, দক্ষিণ বিজয়পুর, গৌরনদী, কসবা, টরকী, সাউদেরখালপাড়, ইল¬া, বার্থী, কটকস্থল, ভূরঘাটা এলাকার বেহাল অবস্থা। এসব এলাকায় প্রতিদিনই ছোটখাট দুর্ঘটনা ঘটে আসছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বরিশাল জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারন সম্পাদক মো. ফরিদ হোসেন বলেন, গত ৯ আগস্ট সড়ক পরিবহন ও যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়েদুল কাদের এমপি মহাসড়ক পরিদর্শন করেছেন। এসময় তিনি সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে মহাসড়ক সংস্কার কাজ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এতে ব্যর্থ হলে সওজ এর সংশ্লিষ্টদের চাকুরীচ্যুত করার হুশিয়ারীও দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তার সেই আদেশের পক্ষকাল অতিক্রম হতে চললেও এখন পর্যন্ত তার বাস্তবায়ন ঘটাতে পারেননি সওজ বিভাগের কর্মকর্তারা। যে কারনে যানবাহন চলাচল করতে গিয়ে দুর্ঘটনার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।
এদিকে গৌরনদী হাইওয়ে থানার পরিদর্শক (ওসি) আব্দুর রউফ বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের সাথে ঢাকা, পঞ্চগড়, চট্রগগ্রাম, রংপুর, মেহেরপুর, যশোর, বেনাপোল, সিলেট, কুমিল্লা, রাজশাহীর সাথে যোগাযোগের একমাত্র সড়ক হচ্ছে বরিশাল থেকে ভুরঘাটা সড়কটি। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের এমন পরিনতি হওয়ায় দুর্ঘটনার আশংকা রয়েছে। তার মধ্যে আসছে ঈদের আগে পরে যাত্রীদের নিরাপদ যাত্রা নিয়েও আশংকা রয়েছে।
তিনি জানান, ইতিপূর্বে গত মঙ্গলবার রাতে বরিশাল থেকে ঢাকাগামী কাঠ বোঝাই একটি (ঢাকা মেট্রো-ট-১১-৭৩৫২) ট্রাক উজিরপুরের বামরাইল এলাকায় চাকা মহাসড়কের সম্প্রসারিত স্থানে পড়ে দেবে যায়। ওই অবস্থায় রাত ৯টার দিকে পাশ কাটিয়ে ডাব বোঝাই আরেকটি (ঢাকা মেট্রো-১৪-২০৯২) ট্রাক অতিক্রম কালে সেটিও রাস্তার পাশে গর্তে দেবে গিয়ে আটকে যায়। এর ফলে রাত ১২টা পর্যন্ত ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে যানবাহন চলাচল পুরোপুরি ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরে বরিশাল থেকে রেকার নিয়ে মহাসড়ক থেকে ট্রাক দুটি সরিয়ে নিলে রাত ১টার পর থেকে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়। এর পূর্বে রোববার রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঠিক একই অবস্থা হয়েছিলো গৌরনদীর ভুরঘাটা এলাকায়। দুটি ট্রাক একটি অপরটিকে সাইড দিতে গিয়ে রাস্তার পাশে দেবে গিয়ে প্রায় চার ঘন্টা যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিলো। এমন পরিস্থিতিতে সড়কটি দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন বলে মতামত ব্যক্ত করেন তিনি।
এদিকে গতকাল সকালে নথুল্লাবাদ বাস মালিক সমিতি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জেলা বাস মালিক গ্রুপের সাধারন সম্পাদক গোলাম মাসরেক বাবলু, যুগ্ম সাধারন সম্পাদক মো. সাঈদ খান, সাংগঠনিক সম্পাদক বাবু কিশোর কুমার দে, কোষাধ্যক্ষ নারায়ন চন্দ্র দে এবং বরিশাল জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারন সম্পাদক মো. ফরিদ হোসেন প্রমূখ।