দখিনের লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে পানি ॥ গৃহবন্দি লাখো মানুষ | Ajker Paribartan
Ajker Paribartan

দখিনের লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে পানি ॥ গৃহবন্দি লাখো মানুষ

রুবেল খান/ভোলা অফিস, মেহেন্দিগঞ্জ, পিরোজপুর ও রাজাপুর প্রতিবেদক ॥ উত্তরাঞ্চল থেকে পানি নামতে শুরু করায় দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীতে পানির স্তর অস্বাভাবিক পরিমানে বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। সেই সঙ্গে জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়ে পড়ছে নি¤œাঞ্চল। এতে গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে দখিনের উপকূলীয় এলাকার লাখ লাখ মানুষ। তাছাড়া পানির তীব্র স্রোতে বরিশাল নগরী সহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা উপজেলার কয়েক একর জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। নদী ভাঙ্গনে ঘর বাড়ি এবং ভিটা মাটি হারিয়ে পথে বসার উপক্রম ঘটেছে বহু পরিবারের।

বিশেষ করে বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া, চরকাউয়া, বেলতলা, চরআবদানী, চরমোনাই এবং কর্ণকাঠি গ্রামের ১৫টির উপর বসত ঘর নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙ্গন আতংকে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে বসত বাড়ি, গাছ-পালা এবং গবাদী পশু। নগরীর উপকন্ঠ কালিজিরা, চরজাগুয়া, রসুলপুর, পলাশপুর, মোহাম্মদপুর, চাঁদমারীর বস্তিগুলোও তলিয়ে গেছে।

এছাড়া বাবুগঞ্জ, বাকেরগঞ্জ, উজিরপুর, মেহেন্দিগঞ্জ, হিজলা, মুলাদীর পাশাপাশি বরিশাল জেলার বাইরে পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বরগুনা এবং ভোলার উপকূলীয় অঞ্চলে নদীর পানি স্বাভাবিকের তুলনায় বৃদ্ধি পাওয়ায় নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। নদী ভাঙ্গনের পাশাপাশি গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। এসব এলাকার আশপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কীর্তনখোলা, মেঘনা, সন্ধ্যা, পায়রা, নয়াভাঙ্গলী, কালাবদর, তেতুলিয়া সহ অন্যান্য নদীগুলোর পানি বর্তমানে স্বাভাবিকের তুলনায় সর্বনি¤œ ৪ থেকে ৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ। এসকল এলাকাগুলোতে নদী ভাঙ্গনে মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কবরস্থান, মসজিদ, বাজার, দর্শনীয় স্থান এবং পাকা রাস্তাঘাট সহ বিভিন্ন স্থাপনা।

এদিকে নদী ভাঙ্গন কবলিত এলাকা এবং নদী গর্ভে ঘর বাড়ি বিলীন হওয়া পরিবারগুলোর খোঁজ খবর নিতে শুরু করেছেন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। জোয়ারের পানিতে প্লাবিত এলাকা পরির্দশনের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে ক্ষতি পূরণের আশ্বাস দিচ্ছেন তারা। বিশেষ করে গতকাল বৃহস্পতিবার বরিশাল জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান স্পীডবোট যোগে নদী ভাঙ্গন ও জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হওয়া বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উত্তরাঞ্চলের পানি নামতে শুরু করার পর থেকেই বাড়তে শুরু করেছে বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলের নদ নদীর পানি। যার বৃদ্ধির পরিমান গত দু’দিনে বিপদ সীমা অতিক্রম করেছে। বুধবার রাত থেকে জোয়ারের পানি অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধির সাথে সাথে নদী ভাঙ্গনে বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া এবং চরকাউয়া এলাকার আনিচ হাওলাদার, দেলোয়ার খলিফা, শুক্কুর হাওলাদার, আমজাদ হাওলাদার, মোখলেছ হাওলাদার, জব্বার ও আশরাফ হাওলাদারের ঘর বাড়ি সহ ১৫টির উপরে বসত ঘর নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

ভাঙ্গনের তীব্রতায় সদর উপজেলার চরআবদানী গ্রামের গাছ-পালা কেটে নিয়ে যাচ্ছে সেখানকার বাসিন্দারা। একের পর এক বসত ঘর নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চিত্রও দেখা গেছে। গ্রামের বাসিন্দাদের দাবী, তিন একর ফসলি জমিও গ্রাস করেছে কীর্তনখোলা নদী। ভাঙ্গন কবলিত এবং জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হওয়া গ্রামের মানুষ জানিয়েছে, হঠাৎ করেই উত্তরাঞ্চলের বন্যার পানি নামতে শুরু করায় কীর্তনখোলা, মেঘনা, সন্ধ্যা, পায়রা, নয়াভাঙ্গলী, কালাবদর, তেতুলিয়া সহ অন্যান্য নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে ¯্রােতের গতীবেগ বেড়ে গেছে। নদীর দুই প্রান্তের লোকালয়-জনপদ প্লাবিত হয়েছে।

বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাইড্রোলজী বিভাগের গেজ রিডার আব্দুর রহমান জানান, প্রতিটি নদীর পানি ২২ সেন্টিমিটারের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এজন্য বরিশাল নগরী সহ আশেপাশের উপজেলার মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, কীর্তনখোলা নদীর পানির স্তর গত মঙ্গলবার ছিলো ২ দশমিক ৯ মিটার। বুধবার তা বেড়ে প্রায় ৩ মিটারের কাছাকাছি পৌছায়। তাছাড়া বৃহস্পতিবার দুপুরে জোয়ার শুরুর পর এর স্তর উঠে আসে ৩ দশমিক ২ মিটারে। উত্তর অঞ্চলের পানি নামতে শুরু করায় দক্ষিণাঞ্চলের নদ নদীতে পানির চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে বরিশাল আবহাওয়া অফিসের উচ্চ পর্যবেক্ষক মিলন হাওলাদার পরিবর্তনকে জানান, গত কয়েকদিন ধরেই বরিশালে বন্যার পূর্বাভাস রয়েছে। সেই সঙ্গে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিও হচ্ছে এই অঞ্চলে।

যে কারণে এখানকার নদী বন্দর সমূহকে ১নং ও সমুদ্র বন্দরকে ৩ নম্বর সর্তকতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এছাড়া আগামী ২৪ ঘন্টায় হাল্কা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাতের আভাসও রয়েছে। সাগরে নি¤œচাপ এবং উত্তরঞ্চলের পানি নামতে শুরু করায় নদ-নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন বরিশালের এই আবহাওয়াবীদ।

এদিকে বরিশাল নগরীর ২৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফিরোজ আহম্মেদ, ১১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. মজিবুর রহমান, চরকাউয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম ছবি, চরবাড়িয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান খোকন জানিয়েছেন, নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় রূপাতলী, চাঁদমারী বস্তি, রসুলপুর, চরকাউয়া এবং চরআবদানী, বেলতলা ও ভাটিখানার একাংশ সহ বেশ কয়েকটি নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

এসব এলাকার মধ্যে নদী ভাঙ্গনের আশংকায় চরবাড়িয়া ও সায়েস্তাবাদ এলাকায় বিসিসি’র ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরের বাড়ি ও একটি স্কুল সহ বেশ কয়েটি স্থাপনা হুমকির মুখে রয়েছে।

এছাড়া চরকাউয়ায় ভাঙ্গনের আশংকায় রয়েছে একটি মাদ্রাসা, ইউনিয়ন পরিষদ, বাস টার্মিনাল সহ বেশ কয়েকটি বসত ভিটা। এর বাইরে সন্ধ্যা নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে ভাঙ্গনের আশংকায় রয়েছে দোয়ারিকা শিকারপুর সেতু, বাবুগঞ্জের আবুল কালাম ডিগ্রি কলেজ সহ বাকেরগঞ্জ, হিজলা ও মুলাদীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

এ প্রসঙ্গে বরিশাল জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান বলেন, ভাঙ্গনের সংবাদ পেয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি ভাঙ্গন এলাকা এবং জলাবদ্ধ এলাকাগুলো পরিদর্শন করেছেন। দুর্ভোগের শিকার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন তাদের সহায়তার জন্য।

তিনি বলেন- চরকাউয়া, চরবাড়িয়া ও মুলাদীতে বেশ কয়েকটি ঘর নদী ভাঙ্গনে বিলীন হওয়ার কথা শুনেছি। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করার জন্য সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানদের বলা হয়েছে। তাছাড়া ১০ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাদের নদী ভাঙ্গন এবং জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়া গ্রাম ও এলাকার খোঁজ খবর নিয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এবং পানি বন্দিদের সাহায্য সহযোগিতার জন্য পর্যাপ্ত অনুদান রয়েছে জেলা প্রশাসনের ত্রাণ শাখায়। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা পেলে তাদের চাল এবং টিন সহ আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে বরিশালের বাইরে ভোলা জেলা সদর, চরফ্যাশন, বোরহান উদ্দিন, মনপুরা এবং চর কুকড়ি-মুকড়ি এলাকা সংলগ্ন মেঘনা নদীতে পানি বৃদ্ধির কারণে নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ইতিপূর্বেই এসব অঞ্চলের প্রায় অর্ধশত ঘর বাড়ি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে।

ভোলা অফিস জানিয়েছে দেশের উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও জোয়ারের পানিতে ভাসছে দ্বীপজেলা ভোলাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তৃর্ণ এলাকা। বিদপসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়া মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর অতি জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে ভোলার চার উপজেলার কমপক্ষে ৪০টি গ্রাম। এসব এলাকার ঘরবাড়ি, হাট-বাজার ও রাস্তাঘাট পানির নিচে। এতে গত তিনদিন ধরে পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর অবস্থায় জীবন যাপন করছে লক্ষাধিক মানুষ। প্লাবিত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। এদিকে তীব্র ঢেউয়ের আঘাতে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে উত্তর ভোলার রাজাপুর, পূর্ব ইলিশা ও মনপুরা ইউনিয়নে।

অপরদিকে বানবাসী মানুষের সাহায্যে জরুরী ভিত্তিতে ৮ মে.টন চাল ও নগদ ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছে জেলা প্রশাসন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনে ত্রাণ বাড়ানো প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক মোহাং সেলিম উদ্দিন। এছাড়া বন্যা কবলী মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে ৯২টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন ডা. ফরিদ আহম্মেদ। তিনি আরো জানান, দুর্গতদের জন্য প্রয়োজনীয় ঔষধ মজুদ রাখা হয়েছে।

উজান থেকে পানি নামতে শুরু করায় মঙ্গলবার বিকাল থেকে ভোলার মেঘনা তেঁতুলিয়া নদীর বাড়তে শুরু করে। বুধবার বিকালের স্বাভাবিকের চেয়ে ৪৮ সে.মি উচ্চতায় জোয়ারের পানি প্রবাহিত হওয়ায় সদর উপজেলার রাজাপুর ও পূর্ব ইলিশা ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা তলিয়ে যায়। এছাড়া তজুমদ্দিন উপজেলার চাঁদপুর, সোনাপুর, বড় মলংচড়া, চরফ্যাশন উপজেলার নজরুল নগর, চর মাদরাজ ও মনপুরা ইউনিয়নের ৪০ গ্রাম জোয়ারের পানিতে সয়লাব। এতে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার ঘরবাড়ি, দোকানপাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মসজিদ-মাদরাসা। প্লাবিত এলাকার মানুষের রান্না-বান্নাসহ দৈনন্দিন সকল কাজ-কর্ম বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে রাস্তা ও বেড়িবাঁধে এসে আশ্রয় নিয়েছে। তৃতীয় দিনের মধ্যে এ অবস্থা চলতে থাকায় সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। রোয়ানুতে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ পুনঃনির্মাণ না করায় সবচেয়ে বেশি দূর্ভোগে পড়েছে মেঘনা পাড়ের উপজেলা মনপুরার বাসিন্দারা। জোয়ারের পানিতে উপজেলা সদর সহ পার্শ্ববর্তী ২টি ইউনিয়নে বাসিন্দারা প্রতিদিন ২বার প্লাবিত হচ্ছে। স্থানীয়রা জানিয়েছে, দেশের উত্তর অঞ্চলের প্লাবিত পানি মেঘনা- তেঁতুলিয়া নদী দিয়ে সাগরে নামছে। এতে পানির ¯্রােত ও উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে গেছে। এ অবস্থা আরো কয়েকদিন চলবে।

তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. বাবুল আখতার জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো নির্মাণ করে জোয়ারের পানি ঢোকা বন্ধ করার চেষ্টা চলছে। রাজাপুর ও ইলিশা ইউনিয়নের ৭০০ মিটার এলাকা উন্মুক্ত রয়েছে। আর পানি উন্নয়ন বোর্ড-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী, মো. কাইছাল আলম জানিয়েছেন, উন্মুক্ত অনেক বাঁধ ইতোমধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে। প্রবল ¯্রােত ও জোয়ারের পানির কারণে কিছু এলাকার কাজে ব্যাহত হচ্ছে।

এদিকে আমাদের মেহেন্দিগঞ্জ প্রতিবেদক জানান, মেহেন্দিগঞ্জে জোয়ারের পানির চাপ ও নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে উলানিয়া ইউনিয়নের পূর্ব সুলতানী গ্রামে কয়েকদিন ধরে ভয়াবহ ভাঙ্গনে নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে প্রায় ২’শ ঘর-বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। গতকাল সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীর ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে পূর্ব সুলতানী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনটি। শত বছরের উলানিয়া করোনেশন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, উলানিয়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্লাস রুমে পানিতে তলিয়ে গেছে। উলানিয়া বাজারের অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পানিতে তলিয়ে রয়েছে। এবিষয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন সাংবাদিকদের জানান, আমার ইউনিয়নে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে একাধিক মানুষ পানিবন্দী রয়েছে। আমি তাদেরকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় দেওয়ার জন্য হাজিরহাট সরকারী সাইক্লোন সেন্টারে ব্যবস্থা করা হয়েছে। উলানিয়া অস্থায়ী ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়েও থাকার ব্যবস্থা করে রেখেছি এবং অসহায় গরীবদের জন্য শুকনা খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি আরো জানান, গত ২/৩ দিনের পানির চাপ বেশী থাকায় পুকুরে থাকা মাছ, পানের বরজ, কৃষকের ধানের বীজ সহ কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। আমি আমার ইউনিয়নের নদী ভাঙ্গন পানিবন্দী অসহায় মানুষের দুঃখ কষ্টের কথা স্থানীয় এমপি পংকজ নাথ ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সহ নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিষয়টি অবহিত করেছি। এবিষয়ে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম ভুলু জানান, ভাঙ্গন কবলিত ও পানিবন্দী অসহায় গরীবদের মাঝে ২/১ দিনের ভিতরে আর্থিক অনুদান প্রদান করা হবে।

পিরোজপুর প্রতিবেদক জানান, কাউখালীতে পূর্ণিমার জোয়ারে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে জোয়ারের প্রভাবে কচা ও সন্ধ্যা নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে চার থেকে পাঁচ ফুট ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় উপজেলার নদী তীরবর্তী ৫ ইউনিয়নের অন্তত ২০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ১৫ হাজার মানুষ। জোয়ারের স্রোতে বসতঘর পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। আমরাজুড়ি, আশোয়া, জব্দকাঠী, কুমিয়ান, সোনাকুর, রঘুনাথপুর, ধাবরী, মেঘপাল, বেকুটিয়া, সুবিদপুর, নিলতী, পাঙ্গাসিয়া, জোলাগাতী, শিয়ালকাঠী, চিরাপাড়া, বিড়ালজুরি, আসপদ্দি, জয়কুল, বৌলকান্দা, বাশুরীসহ আরও কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পূর্ণিমার জোয়ার ও বৃষ্টির ফলে জেলার খেটে খাওয়া মানুষগুলো চরম বিপাকে পড়েছেন।

রাজাপুর প্রতিবেদক জানান, রাজাপুরের বড়ইয়া ও মঠবাড়ি ইউনিয়নের বিষখালি নদী তীরবর্তী প্রায় ১০ গ্রামের সহ¯্রাধিক পরিবার পূর্ণিমার জোয়ারের প্রভাবে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ভাটার সময় ওইসব এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন স্থানের বাঁধ ভেঙে অসংখ্য গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানি বৃদ্ধিতে বড়ইয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ বড়ইয়া, বড়ইয়া, পালট, নিজামিয়া ও চল্লিশ কাহনিয়া এবং মঠবাড়ি ইউনিয়নের নাপিতেরহাট, মানকি, ডহরশঙ্কর ও বাদুরতলা বাজার, পুখরিজানাসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানের সহ¯্রাধিক পরিবার পানি বন্দি হয়ে পড়েন। নদী তীরবর্তী দক্ষিণ বড়ইয়া নাসিমা খাতুন নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ অনেকগুলো বিদ্যালয় পানিতে তলিয়ে যায়। ভাটায় পানি কমায় বড়ইয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ বড়ইয়া, বড়ইয়া, পালট, নিজামিয়া ও চল্লিশ কাহনিয়া এবং মঠবাড়ি ইউনিয়নের নাপিতেরহাট, মানকি, ডহরশঙ্কর ও বাদুরতলা বাজার, পুখরিজানাসহ বিষখালি তীরবর্তী বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে সাইক্লোন সেন্টার, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার ও সরকারি স্থাপনা হুমকির মুখে পড়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে এসব এলাকায় বসবাসকৃত পরিবারগুলোকে পানি বন্দি দেখা গেছে। রোপা আমন ও বীজতলার ব্যাপক ক্ষতি আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। বুধবার রাতে দক্ষিণ বড়ইয়া, মানকি ও চল্লিশ কাহনিয়া ও বাদুরতলায় ভাঙনে ফসলি ও বাগানের গাছপালাসহ কয়েক একর জমি বিষখালি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এ পর্যন্ত বিষখালী নদীর তীরবর্তী মঠবাড়ি ও বড়ইয়া ইউনিয়নের বহু গ্রাম, শিক্ষা-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে দেড় হাজার একর আবাদি জমি। ভাঙ্গনরোধে সরকারি প্রতিশ্রুতি আজও বান্তবায়ন হয়নি। উপজেলার দক্ষিন বড়ইয়া ও দক্ষিণ পালট গ্রামের বাঁধ ভেঙে রোপা আমন ও আমনের বাজীতলাসহ নিমজ্জিত রয়েছে। কৃষকরা আমন বীজতলা রক্ষার জন্য নিজ উদ্যোগে ফসলি জমির মাটি কেটেই বাঁধ রক্ষার জন্য সংস্কারের চেষ্টা করলেও পানির স্রোতে তা রক্ষা করা যাচ্ছে না। ক্ষতিগ্রস্থরা জানান, ভাঙ্গনরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড এখন পর্যন্ত কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। বর্তমানে বন্যা পরিস্থিতি দেখা দেওয়ায় আতঙ্ক রয়েছে। উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্র জানান, বিষখালি নদীতে স্থায়ী বেড়িবাঁধ না থাকায় তীরবর্তী এলাকায় প্রতিবছরই মাছ ভেসে যায়। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ রিয়াজ উল্লাহ বাহাদুর জানান, বিভিন্ন ফসল ও ধান চাষে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। বড়ইয়া ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের (পালট) ইউপি সদস্য শাহাদাৎ হোসেন কাজল জানান, জোয়ারের সময় পানি বৃদ্ধিতে মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। এছাড়া নদীও ভাঙন দেখা দিয়েছে ভয়াবহ ভাবে। এ বিষয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মনিরউজ্জামান জানান, জরুরি ভিত্তিতে বিষখালি নদীতে বেড়িবাঁধ ও ভাঙ্গনরোধ প্রয়োজন। এ জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে আবেদন করা হয়েছে। দ্রুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে ভাঙনরোধ করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সকলের আশুহস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

এছাড়া পটুয়াখালী এবং বরগুনার উপকুলিয় অঞ্চল গত দু’দিন পূর্বে জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এসব অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ গৃহবন্ধি হয়ে পড়েছে। তাছাড়া নদী ভাঙ্গনের কারনে বহু গ্রামের বাড়ি ঘর এবং ফসলী জমি নদী গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

Share via email
Share