যাদের ব্যবহার করে সুনাম সেই রোগীর বিরুদ্ধেই শেবাচিম হাসপাতালে আন্দোলন

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ যাদের ব্যবহার করে নাম-যশ অর্জন করছে সেই রোগীর বিরুদ্ধেই আন্দোলন করছে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা। শত শত রোগীকে সুস্থ করে তোলার পরিবর্তে নিরবে হত্যার পরেও নিজেদের দোষ ধামাচাঁপা দিতে অন্যকে ফাঁসানোর চেষ্টাও চালাচ্ছেন তারা। শুধু চলমান ঘটনাই নয়, ইতিপূর্বে এমন বহু ঘটনার জন্ম দিয়েছে শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা। কিন্তু এর কোনটিরই ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি কর্তৃপক্ষ। উল্টো তাদের অন্যায়কে প্রশয় দিয়ে আন্দোলনে সমর্থনও জানিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসকদের নীতি নির্ধারনী মহল। তাই শিক্ষানবিশ চিকিৎসক নামের উচ্ছৃঙ্খলদের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার পরে উল্টো হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এমনটি একটি ঘটনার নজির সৃষ্টি হয়েছে গত মঙ্গলবার রাতে শেবাচিম হাসপাতালে। চিকিৎসকদের হাতে মার খেয়ে তার প্রতিবাদ করতে গিয়ে উল্টো বরখাস্ত হতে হয়েছে কোতয়ালী মডেল থানা পুলিশের এএসআই মহিউদ্দিনকে।
জানা গেছে, গত মঙ্গলবার ভিড় বেশি হওয়াকে কেন্দ্র করে রোগীর স্বজনদের লাঞ্ছিত করে শেবাচিম হাসপাতালের উচ্ছৃঙ্খল শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা। এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা বেধড়ক পিটিয়ে গুরুতর আহত করে স্বজনদের। এ নিয়ে দুই পক্ষের মাঝে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে খবর পেয়ে রাতেই কোতয়ালী মডেল থানা পুলিশের বেশ কয়েকটি টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে। এসময় স্বজনদের হামলার হাত থেকে এক চিকিৎসককে রক্ষার চেষ্টা করলে মডেল থানার এএসআই মহিউদ্দিনের উপর হামলা চালায় চিকিৎসকরা। এর প্রতিবাদ করতে গেলে এএসআই মহিউদ্দিন সহ ৪ পুলিশ সদস্যকে বেধড়ক মারধর করে উচ্ছৃঙ্খল চিকিৎসকরা।
প্রত্যক্ষদর্শী হাসপাতালের একাধিক রোগী, স্বজন এবং কর্মচারীরা বলেন, মঙ্গলবার রাতে যে ঘটনা ঘটেছে সেই ঘটনার জন্য ইন্টার্ন চিকিৎসকরাই দায়ি। কেননা তারাই প্রথমত কোন উস্কানি ছাড়া রোগীর স্বজন এবং পুলিশের উপর হামলা করেছে। অবশ্য এর সাথে পুলিশের কিছু বাড়াবাড়ি ছিলো বলেও জানান সূত্রগুলো। যে কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে বাধ্য হয়ে এএসআই মহিউদ্দিনকে সাময়িকভাবে বহিস্কারের ঘোষণা দিয়ে আন্দোলন পরিস্থিতি শান্ত করেন পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
তারপরেও ক্ষ্যান্ত হয়নি শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা। তারা তাদের নিজেদের দোষ ঢাকতে উল্টো আন্দোলন শুরু করেছে। তবে তারা যে ৫টি দাবী আদায়ের জন্য আন্দোলন করছে তার মধ্যে কয়েকটি দাবীর যৌক্তিকতা রয়েছে। তা হলো হাসপাতালের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য আনসার সদস্য নিয়োগ, রোগীর সাথে সর্বোচ্চ ২ জন ভিজিটর থাকার যে দাবী তোলা হয়েছে তা সর্বস্থরের কাছেই সমর্থন পেয়েছে। কিন্তু পুলিশ এবং রোগীর স্বজনদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের যে দাবী তোলা হয়েছে তা নিয়ে অনেকটা হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে সাধারণ মহলে। কেননা রোগীর স্বজন এবং পুলিশের বিচার করতে হলে শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
এদিকে সংঘর্ষের ঘটনার জের ধরে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মবিরতি পালন করায় সাধারণ রোগীদের অনেকটা ভোগান্তিতে পড়তে হয়। তাৎক্ষনিকভাবে রোগীরা সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে দাবী রোগীর স্বজনদের।
তাছাড়া ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দাবী এবং আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে বুধবার প্রতিবাদ সভা করেছে চিকিৎসকদের পেশাজীবী সংগঠন বিএমএ’র নেতা-কর্মীরা। এসময় তারা তাদের পক্ষ থেকে ৫টি দাবী তুলে ধরেন। সেই সাথে দাবী আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবার জন্য ইন্টার্নদের উৎসাহ দেন।
তবে দুপুর ২টায় স্বাচিপ নেতাদের সাথে বৈঠকে মিলিত হয় ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। এসময় রোগীদের কথা চিন্তা করে মানবিক কারণে ধর্মঘট শিথিল করেন ইন্টার্নরা। হাসপাতালের যে ওয়ার্ডে ভর্তির তারিখ থাকবে শুধুমাত্র সেই ওয়ার্ডে ইন্টার্নদের দায়িত্ব পালনের সিদ্ধান্ত হয়।
এদিকে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের এমন অমানবিক এবং অযৌক্তিক আন্দোলন সাধারণ মহলকে ক্ষেপিয়ে তুলেছে। তাদের দাবী ইন্টার্ন চিকিৎসকরা চিকিৎসা শাস্ত্রের মূল দক্ষতাই অর্জন করে থাকেন রোগীর মাধ্যমে। শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগদানের পর তারা হাসপাতালে ভর্তি রোগীর চিকিৎসা করেই এক সময় বড় ডাক্তার হচ্ছেন। এমনকি নিজে শিখতে গিয়ে বহু রোগীকে নিরবে হত্যা করছেন। যার কোনটিরই বিচার আশা করেনি স্বজনরা। যেই বিচারের আশা কিংবা অবহেলার প্রতিবাদ করতে যাচ্ছে তাদের হামলা এবং নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে ইন্টার্নদের হাতে। আবার কিছু হলেই ধর্মঘটে যাবার হুমকি দিয়ে পার পেয়ে যায় চিকিৎসকরা। তাদের এমন আচরণ সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করে বলেও মনে করেন বিশেষ মহল।
অপরদিকে ঘটনার দু’দিন হয়ে গেলেও এ নিয়ে কোন প্রকার তদন্ত কমিটি গঠন করেনি পুলিশ বিভাগ কিংবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষনিকভাবে এএসআইকে বরখাস্তের যৌক্তিকতা তুলে ধরলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রয়েছে নির্বাক। তারা ইন্টার্ন এবং তাদের পরিচালনাকারী চিকিৎসক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের ভয়ে সকল অপরাধ ধামা চাপা দিয়ে দোষ অন্যের কাছে চাপাচ্ছেন।
এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ডা. এস.এম সিরাজুল ইসলাম বলেন, ইন্টার্নরা আমাদের সন্তান। তারা ছোট খাটো ভুল করলে সেগুলো মেনে নিয়েই কাজ করতে হয়।
তিনি বলেন, আমি এবং বিএমএ নেতৃবৃন্দ বিষয়টি নিয়ে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সাথে কথা বলেছি। তাদের অনুরোধ জানানো হয়েছে। অবশ্যই তারা কাজে যোগদান করবে বলে জানান তিনি।