বরিশালে আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত ৩৬ নেতার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

রুবেল খান ॥ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া এবং দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধাচরণের অভিযোগে বহিষ্কার হওয়া আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের ৩৬ নেতার সাময়িক বহিষ্কারাদেশ এখনো বহাল রয়েছে। আদৌ তাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার হবে কিনা সে বিষয়ে দলীয় ভাবে কোন প্রকার সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারেনি স্থানীয় পর্যায়ের নীতি নির্ধারকরা। তবে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের জন্য তদবির-লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন সাময়িকভাবে বহিষ্কার হওয়া আ’লীগ এবং অঙ্গ সংগঠনের নেতারা। অবশ্য আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ এ বিষয়ে কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের বাইরে যাবে না বলে জানিয়েছেন।
জানা গেছে, গত ২২ মার্চ প্রথম ধাপে বরিশাল জেলার ৭২টি ইউনিয়নে দলীয় প্রতীকে ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ড প্রতিটি ইউনিয়নে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন। সে অনুযায়ী ইউপি নির্বাচনে অংশ নেয় আওয়ামী লীগ দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থীরা। এ নির্বাচনে বরিশাল সদরে ১টি, বাবুগঞ্জ উপজেলার ১টি ও মুলাদী উপজেলার ১টি সহ ৬টি ইউপিতে বিদ্রোহী বাদে বাকি সবগুলোতেই আওয়ামী লীগের মনোনিত প্রার্থী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।
এদিকে নির্বাচনের পূর্বে দলীয় সিদ্ধান্ত এবং শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বরিশাল সদর সহ ১০ উপজেলার ৩৬ নেতা-কর্মীকে দল এবং পদ-পদবি থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়। গত ১৬ মার্চ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. তালুকদার মো. ইউনুস-এমপি স্বাক্ষরিত এক নোটিশের মাধ্যমে এদের বহিষ্কারাদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
সাময়িক বহিষ্কৃতরা হলো- বরিশাল সদর উপজেলার জাগুয়া ইউনিয়নে উপজেলা যুবলীগের সদস্য মোহাম্মদ হাসনাইন তালুকদার, চরকাউয়া ইউনিয়নের ওয়ার্ড আ’লীগের প্রাথমিক সদস্য মো. হাদিছুর রহমান বিশ্বাস, চাঁদপুরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মো. আব্দুল বারেক, একই ইউনিয়নের আ’লীগের সাবেক আহ্বায়ক এইচ.এম জাহিদ, টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়ন আ’লীগের সদস্য আলমগীর হোসেন ও মাশরুল আলম নাসির মিয়া।
আগৈলঝাড়া উপজেলা শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক এবং বাকাল ইউনিয়নের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী সোহেল ইমরোজ লিটন তালুকদার, রতœপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন আলম টেনু, একই ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মীর আশরাফ আলী।
গৌরনদী উপজেলার বাটাজোর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান ছোট্ট, উজিরপুর উপজেলার বরাকোঠা ইউনিয়ন আ’লীগের সভাপতি মো. শাহ আলম হাওলাদার, উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি উর্মিলা রানী বাড়ৈ।
বানারীপাড়া উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের বিদ্রোহী এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মো. তামেজ আলী হাওলাদার, বাইশারী ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি জিয়া উদ্দিন জুয়েল ফকির, জেলা আ’লীগের সদস্য এবং সৈয়দকাঠি ইউনিয়নের যুগ্ম আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম, বানারীপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক চাখার ইউনিয়নের বিদ্রোহী প্রার্থী সৈয়দ মজিবুল ইসলাম টুকু, উপজেলা কৃষক লীগের সভাপতি আব্দুল মালেক হাওলাদার।
হিজলা উপজেলার গুয়াবাড়িয়া ইউনিয়নের ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মুন্সি মোহাম্মদ ইসাহাক, নাজিরপুর ইউনিয়নে উপজেলা আ’লীগের সদস্য মো. মুজিবুর রহমান শরীফ।
মুলাদী উপজেলার শফিপুর ইউনিয়নে মুলাদী উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আবুল কালাম সিকদার, চরকালেখা ইউনিয়নে কেন্দ্রীয় আ’লীগ নেতা রিনা খান, মুলাদী ইউনিয়নে স্বেচ্ছাসেবক লীগ কেন্দ্রিয় সদস্য রফিকুল হাসান, কাজিরচর ইউনিয়নে মুলাদী উপজেলা আ’লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও বিদ্রোহী প্রার্থী প্রকৌশলী ইউসুফ আলী।
মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা আ’লীগের সহ-সভাপতি নিজাম উদ্দিন আহম্মেদ, চাঁনপুর ইউনিয়নে উপজেলা আ’লীগের সদস্য বাহাউদ্দিন ঢালী, চানপুর ইউনিয়ন আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু বক্কর সিদ্দিক, ভাষানচর ইউনিয়নে আ’লীগের কেন্দ্রিয় কমিটির সদস্য ও বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. মুজিবুর রহমান, স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের বিদ্রোহী প্রার্থী আ. কাদের ফরাজী, বিদ্যানন্দপুর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় চন্দ্র, দরিরচর খাজুরিয়া ইউনিয়নের সদস্য মোস্তফা রাঢ়ী।
বাকেরগঞ্জ উপজেলার ফরিদপুর ইউনিয়ন আ’লীগের সভাপতি মীর মোহাম্মদ মহসীন, নলুয়া ইউনিয়ন আ’লীগের সদস্য মো. আমিনুল হক, কলসকাঠি ইউনিয়নে উপজেলা তৃণমূল আওয়ামী লীগের সভাপতি এ.কে.এম মারুফ হাসান, ভরপাশা ইউনিয়নে উপজেলা যুবলীগ নেতা আশরাফ উজ্জামান খোকন এবং ইপি আ’লীগের সাবেক সভাপতি মো. কামাল হোসেন তালুকদার।
এদিকে প্রথম দফার নির্বাচন শেষ হয়ে দুই মাস হতে চললেও এদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার কিংবা স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে কিনা সে বিষয়ে কোন প্রকার সিদ্ধান্তে পৌছতে পারেনি জেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ। তবে সাময়িক বহিষ্কার হওয়াদের মধ্যে থেকে দলের আগাছা হিসেবে থাকা আ’লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের বেশ কয়েকজনকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার হতে পারে বলে আওয়ামী লীগের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছেন।
অবশ্য এদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. তালুকদার মো. ইউনুস-এমপি। তিনি বলেন, কেন্দ্রের নির্দেশ অনুযায়ী দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। আবার কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার কিংবা স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
তবে জেলা আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকটি সূত্র জানায়, যারা সাময়িকভাবে বহিষ্কার হয়েছেন তারা তাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করাতে বেশ লবিং-তদবির চালাচ্ছেন। বিশেষ করে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ্ব আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ-এমপি’র কাছে ধর্ণা দিচ্ছেন তারা। অনেকে আবার বহিষ্কারের পর রাজনৈতিক মতের পরিবর্তন করে নতুন নেতৃত্বের দিকে ছুটছেন। নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনিত’র বিষয়ে ভুল সিদ্ধান্তের অভিযোগ এনে তারা নতুন নেতার সন্ধানে ছুটছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে বরিশাল জেলার অধিনস্ত সংগঠনের নেতাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার কিংবা স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের বিষয়ে শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট জেলার নেতৃবৃন্দের হাতেই রয়েছে বলেও জানিয়েছেন দলের বেশ কয়েকন জ্যেষ্ঠ নেতা।