বরিশালে শিশু হত্যাকারী গ্রেপ্তার রিকসা চালক বাবা ও মা-ভাইকে গুম করার হুমকি

কাওছার হোসেন, বানারীপাড়া ॥ আছাড় দিয়ে শিশু হত্যাকারী নারী নুপুর বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল শনিবার রাজধানী থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। নুপুর বেগম বানারীপাড়া পৌরসভার টিএন্ডটি মোড় এলাকায় বাবলা মৃধার স্ত্রী।
ফেয়ারী কুইন বিউটি পার্লারের মালিক নুপুর ভাড়াটিয়া রিকসা চালক মোঃ রিপন শেখের তিন বছর ৪ মাস বয়সী শিশু সন্তান হাফিজুল শেখ হত্যা মামলার একমাত্র আসামী।
বানারীপাড়া থানার ওসি জিয়াউল আহসান জানান, রাজধানীর গুলশান এলাকার স্কয়ার হাসপাতালের কর্মচারী হিসেবে কর্মরত রয়েছে স্বামী বাবলা মৃধা। তাই প্রযুক্তির ব্যবহার করে তার অবস্থান নিশ্চিত হয়ে শনিবার দুপুরে থানার এস আই মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে একটি দল অভিযান চালায়। অভিযানে স্কয়ার হাসপাতালের পিছন থেকে নুপুরকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে বানারীপাড়া থানায় পাঠানো হয়েছে বলেও জানায় ওসি জিয়াউল।
শিশুদের স্বভাব জাত “কান্না” সহ্য করতে না পেরে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নুপুর ভাড়াটিয়ার সন্তান হাফিজুলকে আছাড় দেয়।
শিশুর বাবা রিপন শেখ জানায়, পৌর শহরের ৯ নং ওয়ার্ডে ফেয়ারী কুইন বিউটি পার্লারের পিছনের বারান্দায় করা ঘর দেড় মাস পূর্বে ভাড়া নেয়। সেখানে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে বাস করে সে।
শিশু সন্তানদের “কান্না” নুপুরের পছন্দ ছিল না। ঘর ভাড়া নেয়ার পর সন্তানরা কাঁদলে ক্ষিপ্ত হয়ে নুপুর অগ্নিমূর্তি ধারন করে এসে হুংকার ছাড়তো। উচ্চ কন্ঠে বকাঝকা করে ঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বলতো। সন্তানদের কান্না বন্ধ রাখতে চোখ দিয়ে আগুন ঝরানো দৃষ্টিতে ভয় দেখাত। এছাড়াও মেরে ফেলার হুমকি দিত নুপুর।
এ কারণে অন্যত্র বাসা ঠিক করে রিপন। কিন্তু অর্থের অভাবে মাসের শুরুতে নতুন বাসায় যেতে পারেননি। শুক্রবার সেই বাসায় যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু একদিন পূর্বেই নুপুর পৈশাচিক কান্ড ঘটায়।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে রিপন বলেন, নুপুরের “কান্না” না করার নিষেধাজ্ঞা ও হুংকার মাত্র তিন বছর চার মাস বয়সী শিশু ছেলে হাফিজুল শেখের অপরিণত স্মৃতিতে ছিল না। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হাফিজুল কাঁদে। তখন অগ্নিমূর্তি ধারন করে ছুটে আসে নুপুর।
নুপুরের পিশাচিনী রূপ নজরে পড়ার সাথে সাথে আতংকে “কান্না” ভুলে যায় সে। পিশাচিনী নুপুরের থাবা থেকে নিজেকে রক্ষায় ভীত হাফিজুল শিশু সুলভ “চোখ” বন্ধ করে, দুই হাত দিয়ে “মুখ” ঢেকেও ফেলে।
সে তো জানতো না এভাবে পিশাচিনীর ছোবল থেকে রক্ষা পাওয়া যায় না। চিলের মত “ছো” মেরে শিশু হাফিজুলকে তুলে নেয় নুপুর।
পিশাচিনীর কাছ থেকে নাড়ী ছেড়া ধন সন্তানকে রক্ষায় এগিয়ে আসার সুযোগও পায়নি মা। কোন কিছু বুঝে ওঠার পূর্বে হাফিজুলকে খাটের উপর ছুড়ে ফেলে পিশাচিনী নুপুর।
আতংক ও ভয়ে নিজেকে লুকানোর চেষ্টা করা হাফিজুল পিশাচিনীর থাবায় গিয়েই তার ছোট্ট হৃদয়ের স্পন্দন থেমে যাওয়ার উপক্রম হয়। তার কাছ মুহূর্তের মুক্তিতে (আকস্মিকভাবে খাটে ছুড়ে ফেলা) নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি হাফিজুল। ছুড়ে ফেলার গতিতে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে উপুর হয়ে পড়ে গিয়ে বুকে ও মাথায় আঘাত পেয়েছে সে।
আঘাতে আহত শিশু হাফিজুলকে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু রাতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা।
তবে অর্থ সংকটের কারণে তাকে পুনরায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসে তার পরিবার। গভীর রাতে সেখানেই শিশু হাফিজুরের মৃত্যু হয়।
শুক্রবার সকালে শিশুর বাবা রিপন শেখ থানায় হত্যা মামলা করে।
শনিবার জোহর নামাজ বাদ পৌর শহরের কুন্দিহার জামে মসজিদের সামনে জানাযা নামাজ শেষে রিপন শেখের গ্রামের বাড়ী বিশারকান্দীর পারিবারিক গোরস্থানে শিশু হাফিজুলের লাশ দাফন করা হয়।
জানাযায় অংশ নেয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক, সমাজিক ও স্থানীয়রা বর্বরোচিত এই নির্মম হত্যা কান্ডের বিচার দাবী করেছে।
এদিকে গতকাল শনিবার দুপুরে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস শিশু হাফিজুলের বাসায় যান। তিনি পরিবারকে সমবেদনা জানিয়ে শিশু হত্যাকারী নূপুরের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের জন্য সহায়তার আশ্বাস দেন।
এ সময় তার সাথে ছিলেন পৌর মেয়র এ্যাডভোকেট সুভাষ চন্দ্র শীল, উপজেলা আ’লীগ সভাপতি গোলাম সালেহ মঞ্জু মোল্লা, সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. মাওলাদ হোসেন সানা, ওসি জিয়াউল আহসান এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ অলিউল আলম।
এছাড়াও রোববার শিশুর হত্যাকারী নূপুরের ফাঁসির দাবীতে বানারীপাড়া প্রেসক্লাব, মানবাধিকার কমিশন, নতুনমুখ সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদ, খেলাঘর আসর, উপজেলা মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি ও উপজেলা রিকসা শ্রমিক ইউনিয়নের উদ্যোগে মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান ও প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে।
অপরদিকে নিহত হাফিজুলের বাবা রিপন শেখ জানান, ঘটনার পর থেকে অপরিচিত নম্বর দিয়ে তাকে হুমকি দেয়া হয়েছে। থানায় মামলা করে নূপুরকে বিপদে ফেললে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিশেষ বাহিনীর মাধ্যমে ক্রসফায়ারে পরিবারের তিন সদস্যকে মারা হবে। পরে গুম করা হবে বলে হুমকি দিচ্ছে। গত দুই দিনে ২০ থেকে ২৫টি নম্বর দিয়ে তাকে একই ধরনের হুমকি দেয়া হচ্ছে বলে রিপন শেখ জানান।
তাই তিনি সহজে অপরিচিত কোন নম্বর রিসিভ করছে না।
ওসি জিয়াউল আহসান বলেন, হাফিজুলের পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের দেয়া হুমকির বিষয়ে কোন অভিযোগ এখন পর্যন্ত করেনি। তার পরেও নিহতর বাবা রিপন শেখের সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।