বর্ষণে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের বেহাল দশা ॥ নকশা পরিবর্তনে উন্নয়ন ও সংস্কার ব্যয় বাড়ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ সাম্প্রতিককালের ভয়াবহ প্রবল বর্ষনে দক্ষিণাঞ্চলের সাথে রাজধানী ঢাকা ও উত্তরবঙ্গ সহ সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ রক্ষাকারী বরিশাল-ফরিদপুর-ঢাকা জাতীয় মহাসড়কের বরিশাল-ভুরঘাটা অংশের প্রায় ৪৮ কিলোমিটার সড়কের বেশীরভাগ অংশই চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। গত বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত বরিশালে প্রায় আড়াইশ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে চলতি মাসে বরিশালে বৃষ্টিপাতের পরিমান দাড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৩শ মিলিমিটার যা স্বাভাবিকের প্রায় দেড়গুন। তবে বরিশাল সড়ক বিভাগ থেকে বৃষ্টি বন্ধ হবার সাথে গত রবিবার থেকেই মহাসড়কটির ক্ষতিগ্রস্থ অংশ জরুরী মেরামতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ শুরু করা হয়েছে। কিন্তু সড়কটির ক্ষয়ক্ষতি এতটাই বেশী যে তা যানবাহন চলাচল উপযোগী হলেও মোটেই নির্বিঘœ করা সম্ভব হচ্ছে না। অপরদিকে মহাসড়কটির ভুরঘাটা থেকে বরিশাল মহানগরী হয়ে পটুয়াখালী-কুয়াকাটামুখী লেবুখালী সেতুর সংযোগ সড়ক পর্যন্ত ৬০কিলোমিটর সড়কে যে ‘প্রশস্তকরন প্রকল্প’র কাজ চলছে তারও নকশা পরিবর্তন সহ ব্যয় বরাদ্দে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এবারের নজীরবিহীন বর্ষনে দক্ষিনাঞ্চলের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এ মহাসড়কটির ক্ষয়ক্ষতিও এ যাবতকালের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়।
তবে আগামী মার্চের আগেই পুরো সড়কটির অবকাঠামোর নতুন রূপ দেয়া সহ তা পরিপূর্ণ টেকসই প্রযুক্তিতে নির্মানের লক্ষ্যে কাজ করছে সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে প্রবল বর্ষনে মহাসড়কটির ক্ষতিগ্রস্থ অংশগুলো ভিন্ন ডিজাইনে সংস্কার সহ সড়কটির প্রশস্তকরনের কর্মপরিকল্পনা চুড়ান্ত করা হয়েছে। বরিশাল সড়ক বিভাগ, সড়ক সার্কেল ও সড়ক জোনের উর্ধতন প্রকৌশলীবৃন্দ ছাড়াও ঢাকার সড়ক ভবনের নিকশা সার্কেলের প্রকৌশলীগন পুরো সড়কটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে এর প্রশস্তকরন-উন্নয়ন কাজের নকশায় কিছু পরিবর্তন এনে নতুন প্রাক্কলন জমা দিয়েছেন। নতুন নকশা অনুযায়ী মহাসড়কটির ক্ষতিগ্রস্থ অংশের ‘ওভারলে’র কাজটি ৫০ মিলিমিটারের স্থলে কোন কোন স্থানে ৭০মিলিতে করা হবে। এছাড়াও প্রশস্তকরন কাজে ইতোপূর্বে মহাসড়কটির মূল অংশের বাইরে কোন মেরামত করার পরিকল্পনা ছিলনা। কিন্তু এবারের প্রবল বর্ষনে সড়কটির ক্ষয়ক্ষতি এতটাই মারাত্মক যে, তা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষন সহ পরিপূর্ণ মেরামত করেই ওভারলে এবং প্রশস্তকরন করতে হচ্ছে।
এজন্য মূল প্রকল্প ব্যয় ১০৪ কোটি থেকে প্রায় ১২১ কোটিতে উন্নীত হচ্ছে। ইতোমধ্যে নতুন প্রাক্কলন বরিশাল সড়ক সার্কেল ও জোন থেকে সড়ক অধিদফ্তরে প্রেরন করা হয়েছে। আজকের মধ্যে সড়ক অধিদফ্তরের প্রধান প্রকৌশলী তা অনুমোদন করে সড়ক ও সেতু মন্ত্রনালয়ে তা প্রেরন করার কথা রয়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে বরিশাল-ভুরঘাটা সড়কের প্রশস্তকরন প্রকল্পটির সংশোধিত প্রাক্কলন মন্ত্রণালয় অনুমোদন করলে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই পূর্ণোদ্যমে সড়কটির সংস্কার ও উন্নয়ন কাজ শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন বরিশাল সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলম। সড়ক ও সেতু মন্ত্রনালয়ের উর্ধতন মহল এ সড়কটির দূর্দশার বিষয়টি ইতোমধ্যে অবহিত হয়ে উন্নয়নে নতুন প্রাক্কলনের বিষয়েও নীতিগতভাবে একমত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
আবহাওয়া বিভাগের মতে, গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে দক্ষিনাঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে যথাক্রমে ১৫২% ও ১৬০%-এর মত বেশী বৃষ্টি হয়। মে মাসে বৃষ্টিপাতের পরিমান কিছুটা কম থাকলেও জুনমাসে তা ৫% বেশী হবার পরে জুলাই মাসে বরিশাল অঞ্চলে বৃষ্টি হয়েছে ৪০.২% বেশী । আগষ্ট মাসেও অতিরিক্ত বর্ষনের পরে সেপ্টেম্বরে তা প্রায় স্বাভাবিক থাকলেও চলতি মাসে বৃষ্টিপাতের পরিমান এপর্যন্ত স্বাভাবিকের প্রায় দেড়গুন।
ফলে দক্ষিনাঞ্চলের প্রায় সব সড়ক মহাসড়কগুলোরই এখন যথেষ্ঠ বেহলা দশা। তবে সড়ক পরিবহন মন্ত্রনালয় থেকে দক্ষিনাঞ্চলের ১১৪.১০ কিলোমিটার জাতীয় মহাড়ক, ৩৬৩ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক ও ১ হাজার ১৩২ কিলোমিটার জেলা সংযোগ সড়কের নিয়মিত রক্ষনাবেক্ষন নিয়ে এখনো কোন সুষ্ঠু কর্মপরিকল্পনা প্রনয়নের উদ্যোগ নেই। ফলে বর্ষা মৌসুম এলেই পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের আন্দোলনের হুমকি সহ নানামুখি বিড়ম্বনায় সড়ক বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের স্নায়ু চাপ বাড়ে। সারা দেশের মধ্যে এখনো বরিশাল-ফরিদপুর ও বরিশাল-পটুয়াখালী জাতীয় মহাসড়ক দুটি মাত্র ১৮ ফুট প্রশস্ত। অথচ এ মহাসড়কটি ৪ লেনে উন্নীত করার লক্ষ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের তহবিলে ‘সম্ভাব্যতা সমীক্ষা’ সহ ‘বিস্তারিত নকশা’ও প্রনয়ন করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ দিনেও কোন দাতা মেলেনি। অথচ পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হবার পরে রাজধানী ঢাকা সহ সারা দেশের সাথে সড়ক যোগাযোগ রক্ষাকারী বরিশাল-ফরিদপুর জাতীয় মহাসড়কটিতে যানবাহনের চাপ আরো বাড়বে। উপরন্তু পায়রা সমুদ্র বন্দর পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলেও সড়কটির গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু সে বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে এখনো কোন কর্মপরিকল্পনা নেই। তবে দেশীয় ১০৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ভুরঘাটা থেকে বরিশাল মহানগরী হয়ে লেবুখালী সেতু পর্যন্ত ৬০ কিলোমিটার মহাসড়ক ১৮ ফুট থেকে ২৪ ফুটে উন্নীত করা হচ্ছে।
১৯৬১ থেকে ’৬৪ সালের মধ্যে ১২ ফুট প্রশস্ততায় ৫ টন বহন ক্ষমতার যানবাহন চলাচলের জন্য নির্মিত বরিশাল-ফরিদপুর জাতীয় মহাসড়কে এখন ৩০-৩৫ টন পণ্যবাহী যানবাহনও চলছে। তবে ১৯৮৮’র বন্যার পরে মহাসড়কটি ১৮ ফুটে প্রশস্ত করা হয়। আর ১৯৯২-৯৪ সালের মধ্যে বরিশাল-ফরিদপুর পুরো মহাসড়কটির ১২৪ কিলোমিটার এলাকা পরিপূর্ণ ‘ওভার-লে’ করা ছাড়া আর কোন বড় ধরনের সংস্কার করা হয়নি। বর্তমানে মহাসড়কটির বরিশাল-ভুরঘাটা অংশের সম্প্রসারন সহ ওভার-লে’র যে প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে, সংশোধিত প্রাক্কলন অনুমোদন হলে আগামী মার্চের আগেই তা সম্পন্ন হবে বলে কতৃপক্ষ জানিয়েছেন। ডিপিপি অনুযায়ী আগামী জুনের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ হবার কথা। এবারে নজীরনবিহীন ভড়া বর্ষায় মহাসড়কটির বেশ কিছু অংশেই রাস্তা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। অথচ বর্ষা দীঘায়িত হওয়ায় ‘বিটুমিনাস কার্পেটিং’ সহ ‘ওভার-লে’র কাজ শুরু করাই সম্ভব হচ্ছেনা। উপরন্তু মূল সড়কের বেড সহ দুপাশে যে ৩ফুট করে প্রশস্ত করা হচ্ছে তার ম্যাকাডম অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।