৮ দিন আটকে রেখে পঞ্চম শ্রেনীর ছাত্রীকে ধর্ষন ॥ ৩০ হাজার টাকায় দফারফার চেষ্টা

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ অপহরনের পর আট দিন আটকে রেখে নির্যাতনের শিকার এক স্কুল ছাত্রীকে উদ্ধার করেছে কোতয়ালী মডেল থানা পুলিশ। ঘটনাটি জানাজানি হলে আত্মগোপন করেছে ধর্ষক মহসিন । সে নগরীর ২২ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আনম সাইফুল আহসান আজিমের কর্মচারী । ধর্ষক মহসিন সাবেক কাউন্সিলর আজিমের মাধ্যমে ৩০ হাজার টাকায় ঘটনাটি রফাদফার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে । কিন্তু বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে তাদের সেই চেস্টা ব্যর্থ হয়। গতকাল শনিবার বিকালে মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) গোলাম আব্দুর রউফ খান এর উপস্থিতিতে নগরীর সিন্ডবি রোড টিটিসি এলাকা থেকে ধর্ষিতা স্কুল ছাত্রীকে উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে কিশোরীকে নগরীর ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে রাখা হয়েছে। তবে ধর্ষক এবং সাবেক কাউন্সিলর সহ সংশ্লিষ্টরা সবাই আত্মগোপনে রয়েছে। রাতে এই ঘটনায় কিশোরীর মা বাদি হয়ে মডেল থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। মাদারীপুরের নতুন বাস স্ট্যান্ড এলাকায় ধর্ষক মহসিনের বাড়ী। তবে সে তার স্ত্রীকে নিয়ে বরিশাল নগরীর কাজীপাড়া মুন্সিবাড়ি এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছিলো।
পুলিশকে দেয়া জবানবন্দিতে সিএন্ডবি রোডস্থ টিটিসি এলাকার বাসিন্দা চায়ের দোকানী মনির হোসেনের ৫ম শ্রেণিতে পড়–য়া ১২ বছর বয়সি মেয়ে মালিহা জানায়, সাবেক কাউন্সিলর আ.ন.ম সাইফুল আহসান আজিম এর গ্যাস সিলিন্ডার ভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পিকাপ চালক মহসিন । মহসিনের হেলপার মাসুদের স্ত্রী মালিহা’র সঙ্গে এক সাথে পড়াশোনা করে । সেই সুবাধে মহসিন এর সাথে তার পরিচয় হয়। কিশোরী জানায়, গত ২ ডিসেম্বর শুক্রবার সন্ধ্যায় আরবী পড়া শেষে বাসায় ফিরছিলো সে। পথিমধ্যে এক সন্তানের জনক মহসিন তার পথরোধ করে একটি আচার কিনে দেয়। আচার খেয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললে একটি বাস যোগে কিশোরীকে মাদারীপুরে নিয়ে যায় মহসিন। পরদিন দুপুরে জ্ঞান ফিরলে সে জানতে পারে মাদারীপুরে মহাসিন এর বোনের বাড়িতে আছে সে।
ধর্ষিতা কিশোরী জানায়, জ্ঞান ফিরলে বাড়িতে পৌছে দেবার জন্য মহসিনকে অনুরোধ জানান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে আটকে রেখে ব্যাপক ভাবে শারীরিক এবং পাশবিক নির্যাতন করে মহসিন। বিষয়টি জানতে পেরে মহসিন এর স্ত্রী ছালমা মাদারীপুরে তার স্বামী এবং কিশোরীকে হাতে নাতে ধরে ফেলে। তবে স্বামীর বিরুদ্ধে কোন প্রকার ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো কিশোরীকে নানা ভাবে ভয় ভিতি প্রদর্শন করে।
কিশোরী আরো জানায়, ছালমা তাকে তার স্বামী মহসিন এর সঙ্গে বিয়ে দেয়ার প্রলোভন দেখায়। কিন্তু তাকে ধর্ষন কিংবা অপহরনের বিষয়টি কাউকে বলতে নিষেধ করে। এর পর গত ৯ ডিসেম্বর শুক্রবার কিশোরীকে বরিশালে তার বাসায় পৌছে দিয়ে যায় মহসিন এর স্ত্রী ছালমা।
এদিকে কিশোরী নিখোঁজের ঘটনার ২ দিন পরে তার মা মঞ্জুরা বেগম বাদী হয়ে কোতয়ালী মডেল থানায় একটি সাধারন ডায়েরী করেন। কিন্তু কিশোরীকে খুঁজে পেলেও অর্থ লোভী স্বামী মনির হোসেনের নিষেধ থাকায় বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করতে পরেনি তার মা। তাছাড়া ঘটনাটি ধামা চাপা দেয়ার জন্য সাবেক কাউন্সিলর আ.ন.ম সাইফুল আহসান আজিম কিশোরীদের ভাড়া বাসার মালিক দুলাল মৃধা এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী মিজানুর রহমানকে নিয়ে তার (আজিম) ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানে সালিশ মিমাংসা করে। তখন ধর্ষিতার ক্ষতিপূরণ বাবদ ৫০ হাজার টাকা দাবী করে তার বাবা। কিন্তু ধর্ষক মহসিন ৩০ হাজার টাকা দিতে সম্মতি প্রকাশ করে। বিনিময়ে এই ঘটনায় মামলা না করার শর্তে কিশোরীর বাবার কাছ থেকে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর রাখে সাবেক কাউন্সিলর আজিম। ফলে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
এদিকে ঘটনাটি জানাজানি হলে গতকাল শনিবার দুপুরের দিকে সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে গেলে বিষয়টি পুরোপুরি ভাবে এড়িয়ে যান সাবেক কাউন্সিলর আ.ন.ম সাইফুল আহসান আজিম। তখন তিনি দাবী করে সাংবাদিকদের বলেন, আমি কোন সালিশ মিমাংসা করিনি। স্থানীয় কিছু যুবক ঘটনাটিকে পুঁজি করে চাঁদাবাজী করতে চেয়েছিলো। তাতে বাঁধা দেয়ায় তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে শুরু করেছে বলে অভিযোগ ছুড়ে দেন তিনি।
অপরদিকে সকাল থেকেই বিষয়টি নিয়ে এলাকাজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে। কিন্তু কোতয়ালী মডেল থানা পুলিশের এসএই মমিনুল ইসলাম ঘটনাস্থলে গিয়ে কোন প্রকার ব্যবস্থা না নিয়ে চলে আসেন। তবে তার দাবী তিনি ঘটনাস্থলে গেলে মেয়ের বাবা এই ঘটনায় কোন মামলা করবে বলে জানালে তিনি ঘটনাস্থল থেকে চলে আসেন। শুধু তাই নয়, জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ঘটনাটি জেনেও রহস্যজনক কারনে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেন। তবে পরবর্তীতে সাংবাদিকদের মাধ্যমে জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তাকে ঘটনাস্থলে প্রেরন করেন। তাছাড়া খবর পেয়ে মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার আব্দুর রউফ খান-পিপিএম এবং মডেল থানার ওসি (তদন্ত) আতাউর রহমান সহ পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে এসে ধর্ষিতা কিশোরীর জবানবন্দি গ্রহন করেন। পরবর্তীতে তাকে উদ্ধার করে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে প্রেরন করেন তারা।
এ বিষয়ে উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) আব্দুর রউফ খান পিপিএম বলেন, আইন সবার জন্য সমান। সে যেই হোক। ধর্ষক সহ ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত সকলকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হবে। তাছাড়া ধর্ষিতা ও তার পরিবারকে এ বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতা করবে বলে জানিয়েছেন নগর পুলিশের এই উর্ধ্বতন কর্মকর্তা।