১৫ বছরের কিশোরীর পেট থেকে বের হলো বিশাল আকৃতির টিউমার

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ জন্ম থেকেই একটু একটু করে বেড়ে ওঠা এক কিশোরী স্কুল ছাত্রীর পেট থেকে বের করা হয়েছে বিশাল আকারের একটি টিউমার। গতকাল সোমবার বিকাল ৪টা হতে ৫টা পর্যন্ত টানা এক ঘন্টা অস্ত্রপচার করে নারী আকৃতির এই টিউমারটি অপসারন করেছেন সার্জারী বিশেষজ্ঞ ডা. মনিরুল আহসান। বর্তমানে নাসরিন আক্তার (১৫) নামের কিশোরী নগরীর চাঁদমারী এলাকায় ইসলামিয়া ব্যাংক হাসপাতালের পোস্টঅপারেটিভ বিভাগে চিকিৎসাধীন রয়েছে। গতকাল সোমবার রাত ১১টা পর্যন্ত তার জ্ঞান ফেরেনি। নাসরিন বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার নাচনাপাড়া ইউনিয়নের মধ্য জ্ঞানপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ও কুয়াকাটার চরপটি বিক্রেতা লিটন ফরাজীর কণ্যা। এছাড়া নাসরিন নাসনাপাড়া পুড়িমাড়া মাদ্রাসার ৮ম শ্রেণির ছাত্রী। তার বাবা লিটন ফরাজী বলেন, পরিবারের চার সন্তানের মধ্যে নাসরিন মেঝ। জন্মের পর থেকেই সে শারীরিক ভাবে অসুস্থ এবং দুর্বল ছিলো। জন্মের পর থেকেই নাসরিনের নিয়মিত বাথরুম হতো না। বিভিন্ন উপায়ে তাকে বাথরুম করানো হতো। তাছাড়া সব সময় নাসরিনের পেট অস্বাভাবিক ভাবে ফুলা এবং প্রায়শই ব্যার্থ অনুভব করতো। এ নিয়ে গত ১৫ বছরে বিভিন্ন চিকিৎসক এর পরামর্শ নিয়েছি। কিন্তু কোন চিকিৎসকই তার পেটের সমস্যা সনাক্ত করতে পারছিলো না। বরিশাল এবং বরগুনার চিকিৎসকরা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে শুধু পেটে গ্যাস জমেছে বলেই আমাদের জানিয়ে আসছিলো।

লিটন বলেন, সম্প্রতি নাসরিন এর শারীরিক অবস্থার আরো অবনতী ঘটে। জন্য তাকে বরিশাল নগরীতে নিয়ে আসেন। সদর রোড এলাকায় ডা. গোলাম মোস্তফা’র কাছে নিয়ে যান। তিনি প্রায় ৭/৮ হাজার টাকার পরীক্ষা নিরীক্ষা করিয়ে রিপোর্ট দেখে বলেন নাসরিনের পেটে গ্যাস জমেছে। এজন্য কিছু অসুধ লিখে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। ওই ওষুধ খাওয়ানোর পরেও নাসরিন সুস্থ হচ্ছিলো না। সর্বশেষ গত রোববার সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে সোমবার তাকে বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে চারদিন চিকিৎসাধীন ছিলো। শুধু স্যালাইন আর ইনজেকশন দিয়ে ব্যাথা বন্ধের চেষ্টা করেছেন ইন্টার্নি চিকিৎসকরা। সিনিয়র কোন চিকিৎসক ওই চারদিনে রোগের ধারে কাছে ঘেসেনি। যে কারনে মেয়ের মুখের দিকে তাকে ওকে নিয়ে পুণরায় সদর রোডে বিবির পুকুর পাড় এলাকায় সিনিয়র চিকিৎসকদের চেম্বারের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলাম। এসময় এক অটোরিক্সা চালকের পরামর্শে নাসরিনকে গত বুধবার রাতে চাঁদমারী ইসলামিয়া ব্যাংক হাসপাতালে নিয়ে যাই।

লিটন বলেন, অটোরিক্সা চালক দালাল কিনা জানিনা। তবে তার কথা মতো ইসলামি ব্যাংক হাসপাতালে গিয়ে সেখানকার সার্জারী বিশেষজ্ঞ ডা. মনিরুল আহসান এর কাছে গেলে তিনি পূর্বের পরীক্ষা নিরীক্ষার রিপোর্ট দেখে নাসরিনের পেটের ভেতর বিশাল আকৃতির টিউমার থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হন। এমনকি তাৎক্ষনিক ভাবে অস্ত্রপচারের মাধ্যমে এটি অপসারনের পরামর্শদেন তিনি। তার কথা মতো তিন দিন অপেক্ষা করে গত রোববার মেয়েকে ওই হাসপাতালে ভর্তি করান। কিন্তু ইসলামি ব্যাংক হাসপাতালের অন্যান্য চিকিৎসকরা বার বারই মেয়েকে ভালো চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যাবার পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু একমাত্র ডা. মনিরুল আহসানই অস্ত্রপচারে রাজি ছিলেন। সে অনুযায়ী গতকাল সোমবার বিকাল ৪টায় ওই হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে নাসরিনের পেটে অস্ত্রপচার শুরু করা হয়।

বাবা লিটন জানায়, অস্ত্রপচার চলাকালে ডাক্তার আমাকে ওটি’র ভেতরে ডেকে নিয়ে যান। সেখানে বিশাল আকৃতির টিউমারটি কিভাবে পেটের ভেতরে ছিলো তা দেখিয়েছেন। পুরো পেট জুড়ে নারী এবং ফুশফুশ ও কলিজা পেচানো অবস্থায় টিউমারটি দেখতে পেয়েছি। অস্ত্রপচারের মাধ্যমে সেটিকে পেটের ভেতর থেকে অপসারন করে ফেলা হয়েছে। তবে অস্ত্রপচার শুরুর পর থেকে গতকাল সোমবার রাত পর্যন্ত কিশোরীর জ্ঞান ফেরেনি বলে জানিয়েছেন তার বাবা।

ডা. মনিরুল আহসান বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন। কেননা কিশোরী মায়ের পেট থেকেই টিউমার নিয়ে জন্মেছে। আর কিছুদিন হলে মেয়েটিকে বাঁচানো সম্ভব হতো না। টিউমারটি শরীরের ভেতরে থেকে রক্ত সোষন করে নিতো। তাই সব সময় কিশোরী অসুস্থ থাকতো। তাছাড়া টিউমারটির জন্যই তার নিয়মিত পায়খানা হতো না।

তিনি বলেন, বর্তমানে কিশোরী অচেতন অবস্থায় রয়েছে। তার জ্ঞান না ফেরা পর্যন্ত শারীরিক অবস্থার উন্নতি সম্পর্কে কিছু বলা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তিনি।