‘হে আমার গুরু দক্ষিণা‘

মুরাদ আহমেদ ॥ শিক্ষকদের নিয়ে আব্রাহাম লিংকনের একটা লেখা পড়ছিলাম, স্মরণ করলাম বাদশা আলমগীরের শিক্ষক ভক্তির উক্তি আর ভাবছিলাম সোমবার রাতে বরিশাল শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে শিক্ষকের মা-বোন তুলে প্রকাশ্যে গালাগালের কথা। নিজ কানে শুনেছি এগুলো, লজ্জা পেয়েছি। কেন যেন শিক্ষকদের নিয়ে অশ্লিলতা ধাচে সয়না। ক’ বছর আগে বিএম কলেজে যোগদান করার সময় অধ্যক্ষ শংকর স্যারকে যখন প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করা হয়েছিলো তখনো থেমে থাকতে পারিনি। প্রতিবাদ করেছিলাম সমানে। কেননা এ সব দেখলে মনে পড়ে যায় আমাকে যারা মানুষ করেছেন সেই গুরুদের কথা। আজ পর্যন্ত নিয়মিত প্রার্থনায় মা বাবার সাথে যাদের জন্য স্বর্গের চাওয়াটা চাই সে জয়ন্ত স্যার, পিকে সেন, সন্তোস মূখার্জি, মেছের আহমেদ, দেব কুমার, সূর্য্যবাবুর মত আমার সব স্যারদের কথা। আমাকে খুব বড় মাপের ছাত্র হয়তো তারা গড়তে পারেননি, কোন মেডিকেল কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে হয়তো চান্স পাইনি। কিন্তু শিক্ষক মর্যাদার জন্য অমৃত্যু লড়ে যাবার মতো মানুষ হয়েছি তাদের আদর্শে, এটুকু অন্তত বলতে পারি।
ছাত্র রাজনীতিতে মারামারি হবে, আহত নিহত হবে, এটা চলমান যুগে অনেকটাই সহনীয়। গতরাত সাড়ে ১১টায় বরিশাল মেডিকেলে ছাত্র লীগের বিবাদমান দু গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা চলছে শুনে ক্যাম্পাসে গিয়েছি স্বাভাবিক নিয়মেই। দেখলাম কলেজের ১ নং হোস্টেলের ছাত্র লীগকে নেতৃত্ব দিচ্ছে ইমরান হোসেন আর ২ নং হোস্টেলে নের্তৃত্ব দিচ্ছে অনুপ সরকার। যারা নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং যারা ক্ষুব্ধ সবাই অত্যন্ত মেধাবি ছাত্র এতে কোন সন্দেহ নেই। তা না হলে এরা মেডিকেলে চান্স পেত না। এদের কাছ থেকে পরবর্তি প্রজন্মের অনেক শেখার আছে, এটাই স্বভাবিক হওয়া উচিত।
কিন্তু রাত ১২টা ৫০ মিনিটে অনুপ গ্রুপের কয়েকজন অনুসারি বাংলা ভাষার যত অশ্রাব্য গালী আছে তা দিতে দিতে যেভাবে লাঠি সোটা নিয়ে নেমে এলো তা মনে পড়লে গা শিউরে ওঠে। কেন যে আমরা বস্তির ছেলেমেয়েদের গালি-গালাজের জন্য দোষ দেই বুঝি না। এদের গালি বাংলার যে কোন সভ্যতাকে লজ্জা দিয়েছে। মেধাবিদের ভান্ডার এমন এক কলেজের এক ভাই অন্য ভাইয়ের মা বোন তুলে এতো নোংরা ভাষা ব্যবহার করতে পারে তা রীতিমত দেখলাম এবং শুনলাম। এরপর এরা এক নং হোস্টেলে এলো ভাংচুর করলো। রাত ১টা ৫ মিনিটে পালটা ধাওয়া করে বের হলো ইমরান গ্রুপ। সমানে গালি চললো এখানেও। এরাও হোস্টেলে গিয়ে তান্ডব করল। এরপর গালির মহড়া চললো রাত ৩টা পর্যন্ত। তবে রাত আড়াইটায় ইমরান সমর্থকরা কলেজ অধ্যক্ষের অপসারণে স্লোগান দিতে শুরু করলো। হতেই পারে, ওরা দুঃখ পেয়েছে তাই এমন দাবি অমূলক না। বোধকরি কলেজ অধ্যক্ষ ডাক্তার ভাস্কর সাহাও আমার এ বক্তব্যের সাথে বিভক্ত হবেন না। রাত ২টা ৪০ মিনিটে অধ্যক্ষ ভাস্করের উপস্থিতিতে তার গালে তালে তালে জুতা মারার স্লোগান শুরু হয়, এর পর তারই উপস্থিতিতে তার মা ও বোনকে তুলে অশ্রাব্য ভাষায় শুরু হয় গালিগালাজ। ছাত্ররা ওদের ভাস্কর স্যারকে ‘ভাস্কর, তুই,’ ইত্যাদি বললো প্রকাশ্যে। বরিশালের সভ্য সমভ্রান্ত পরিবারের মেধাবি সন্তান ভাস্কর তার চাকুরির দায় শোধ করলেন নিশ্চুপ থেকে। ভাস্কর স্যারের চোখে তখন বেদনার অশ্রু। অসহায়ের মতো তাকিয়ে দেখলাম সর্বোচ্চ মেধাবি গড়ার এক কারিগরের নির্মম দৃশ্যপট। মনে হলো যেন ‘আজ হতে চির অবনত হলো শিক্ষা গুরুর শির, সত্যি তোমরা ভিষণ মেধাবি, মেডিকেলের শ্রেষ্ঠ বীর’।
বরিশাল মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্র লীগের বিবাদ নিয়ে ইমরান ও অনুপ এবং ওদের অনুসারিদের কাছে যতোই যুক্তি থাকুকনা কেনো শিক্ষক অসন্মানের দায় আমরা কেউই এড়াতে পারি না। রাগ, ক্ষোভ, অন্দোলন, ধর্মঘট, মিছিল, মারামারি ছিলো আছে এবং থাকবেই। তবে তার সাথে থাকতে দিতে হয় শিক্ষকের মর্যাদাকে। তা না হলে সামাজ আর সভ্যতা থাকবে না। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক আজ যারা আছেন তাদেরও সামনে আগানো উচিত।
এ দুঃখের কথা যখন লিখছিলাম তখন মাত্র সেদিনের একটা কথা খুব মনে পড়ছিলো। মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন পত্র ফাঁস হয়েছে দাবি করে অনেক মেধাবিকে দেখেছে বৃস্টিতে ভিজে, রাস্তায় রক্ত ঢেলে প্রতিবাদ করেছে। সোমবার রাতে বরিশাল মেডিকেল ক্যাপাসে যে গালি শুনেছি আর শিক্ষকের মা-বোন তুলে যে অশ্রাব্য ভাষার প্রকাশ্য ব্যবহার দেখেছি তাতে সেই সব মেধাবি যারা ভর্তির জন্য রাস্তায় প্রতিবাদ করেছে তাদের উদ্দেশ্যে একটা কথাই বলার অবশিষ্ট রইল এবং তা হলো, ‘ হে আমার সন্তানেরা, তোমরা বেচে গেছো, অশ্রাব্য গালাগাল আর শিক্ষক অমর্যাদার এমন ক্ষেত্র থেকে সৃষ্টি কর্তা তোমাদের দূরে রেখে তোমাদের জন্যই মঙ্গল করেছেন, এমন উচ্চ শিক্ষা তোমাদের দরকার নেই যেখানে শিক্ষাকের মর্যাদা কাঁদে’।
ইমরান আর অনুপের কাছে অনুরোধ থাকবে ছাত্র রাজনীতির সমস্যার সমাধান শিক্ষকদের কাছে থাকে না। বরিশালের রাজনীতিবীদদের বলবো আসুন আমরা শিক্ষক মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখি। শিক্ষকদের বলবো আপনারা ছাত্ররাজনীতিকে ব্যবহার করা থেকে দূরে থাকুন। আমার সন্তানদের বলবো তোমরা অবশ্যই রাজনীতি করবে তবে শিক্ষাগুরুকে পদদলীত করে নয়।