হিরন নেই, আছে তার স্মৃতি

ইচ্ছা করলেও যে কেউ উন্নয়নে শরিক হতে পারেন না। যিনি উন্নয়নের কারিগর হবেন তার স্বদিচ্ছা, একাগ্রতা, মানসিকতা ও নি:স্বার্থ মনোভাব থাকতে হবে। এর সাথে সরকারের সাপোর্ট থাকা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বরিশালে যখন যারা দায়িত্বে ছিলেন তারা তাদের সাধ্যমত উন্নয়ন করার চেষ্টা করেননি, এটা বলা পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে করি। তাই এক কথায় বলতে পারি উন্নয়ন একটা চলমান প্রক্রিয়া মাত্র।
বরিশালের মানুষ যারা এখানে থাকেন না অর্থাৎ বিদেশে থাকেন দীর্ঘ সময়ের পর বরিশালে আসেন, তারা বরিশালের উন্নয়ন দেখে বিষ্মিত হন। রাস্তা-ঘাট, প্রতিষ্ঠান, ক্লাব, পার্ক ইত্যাদি তাদের নজর কাড়ে। যখন উপলব্ধি করেন এর কারিগর মেয়র শওকত হোসেন হিরন ছাড়া আর কেউ নন, তখন তাদের অনুভূতি হৃদয়কে নাড়া দেয়, আনন্দিত হন। মহান আল¬াহ সকলের কপালে উন্নয়ন সাধিত করার সুযোগ ও ভাগ্য হয়তো দেননা। যিনি এ কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করার সৌভাগ্যবান হন তাকে বিধাতা আগে থেকেই তৈরী করেন এবং এজন্য তার সহ্য, ধৈর্য, সততা ও সহিষ্ণুতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয় আল¬াহ’র কাছে। হিরনকে জীবনে একাধিকবার অনেক রাজনৈতিক কালো থাবার আগ্রাসনে নিপতিত করার প্রচেষ্টার উদ্ভব হয়েছিল বলে শুনেছি। সবগুলো অধ্যায় তিনি অতিক্রম করে তার অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে হয়তো সক্ষম হয়েছিলেন কিন্তু এরকম কয়েকটি ঘটনা আজও আমার মনকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ১৯৮৬ সন, নভেম্বর মাস। বরিশাল পলিটেকনিকের সামনে আমার বাসা । পরিবার পরিজন নিয়ে একটা একতলা বিল্ডিং এ থাকি। বিকেল ৫টা হবে। বাসায় ফিরে দেখি ড্রইং রুমে হিরনের পত্মী জেবুন্নেছা আফরোজ (ভাবী) ও হিরনের ছোট বোন রুনা বসা। তাদের দেখে আমি ঘরের ভেতরে না গিয়ে ড্রইং রুমেই বসে পড়ি। কুশলাদি বিনিময়ের পর খবরাখবর জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেনা সদস্য ও পুলিশ হিরনের খোঁজে বাসায় গিয়েছিল। অবশ্য হিরন তখন বাসায় ছিলেন না। স্বাভাবিক ভাবেই তারা চিন্তিত। হিরনের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, নদীর ওপারে হিরন একটা ব্রিক ফিল্ড পরিচালনা করছেন। তাৎক্ষণিক আমি তার সামনেই কর্নেল আমজাদ, ডিএমএলএ বরিশাল (সার্কিট হাউজে থাকেন) কে টেলিফোন করলে স্টাফ অফিসার লে: সুফিয়ান আমাকে জানান, স্যার দুপুরে যশোরে ইউনিটে জরুরি কাজে গেছেন। পরশু আসবেন। আমি তখন জিজ্ঞাস করলাম আর কে আছেন? তিনি বললেন, মার্শাল কোর্টের চেয়ারম্যান মেজর আবুল আলম স্যার দায়িত্বে আছেন। আমি তাকে ফোনে চাইলাম। মেজর আলম সাহেবকে ফোনে সংযোগ দিলে প্রথমে সালাম বিনিময় করে হিরনের বিষয়টি তাকে বললাম। তিনি বললেন ডিএমএলএ সাহেব যশোর থেকে না ফিরলে এ বিষয় তিনি কিছু বলতে পারছেন না। প্রসঙ্গত বলতে হয় ডিএমএলএ কর্নেল আমজাদ, মেজর আলম ও লে: সুফিয়ান সবাই আমার পরিচিত এবং কর্নেল আমজাদ আমার বন্ধু। প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমি সার্কিট হাউজে যেতাম। রাতের খাবার সেখানে খেতাম। মাঝে মধ্যে বরিশালের ডিসি আজিজ আহাম্মেদ এবং এসপি সরোয়ার হোসেন থাকতেন। তাই মেজর আলমকে আমি অনুরোধ করলাম যে, ডিএমএলএ সাহেব যশোর থেকে না ফেরা পর্যন্ত হিরনকে হয়রানি না করার জন্য। তিনি আমাকে যশোরে ডিএমএলএর সাথে কথা বলতে বললেন। আমি তার কথামত যশোরে কর্নেল আমজাদ সাহেবের সাথে ফোনে সংক্ষেপে কথা বললাম এবং বিষয়টি তিনি বরিশালে না ফেরা পর্যন্ত স্থগিত রাখার অনুরোধ করলাম। তিনি আমার কথা মনে হয় শুনলেন। জেবুন্নেছা ভাবী ও রুনা বাসায় ফিরে গেলেন। গভীর রাতে একটা আকাশী রংয়ের ভেসপা মোটর সাইকেল নিয়ে হিরন আমার বাসায় আসলেন। অনেক কথা বার্তা হল, আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম। তাকে সাবধানে থাকার পরামর্শ দিলাম। কিন্তু হিরনের একটাই দাবী তাকে ডিএমএলএ’র সাথে দেখা করাতে হবে। আমি চেষ্টা করবো বললাম। কর্নেল আমজাদ বরিশালে ফিরলেন বিকেলে। রাতে দেখা হল। ভিসিআর/টিভি দেখলাম এক সাথে। অন্যরাও ছিলেন। রাতে খাবার টেবিলে হিরনের বিষয়টি তুললাম। তিনি বললেন ব্রিগেডিয়ার মতিয়ার রহমান এসজেডএমএলএ পর্যন্ত বিষয়টি গড়িয়েছে। তাই একটা প্রসেসে যেতে হবে। কর্নেল আমজাদ পরামর্শ দিলেন, এলাকা থেকে ১০০/২০০ লোকের স্বাক্ষর সম্বলিত একটা দরখাস্ত হিরনকে ভাল লোক দাবি করে আমার বরাবরে দিন। আমি হিরনের সাক্ষাতের বিষয়টিও বললাম। তিনি বললেন দরখাস্তটা আগে দিন। তার বিস্তারিত পরামর্শ মত একটা দরখাস্ত প্রস্তুত করে কাশীপুরের ১২৫ জন লোকের স্বাক্ষর করানোর পর হিরনকে দিলাম । হিরন আত্মগোপন থেকে প্রায় ১০০ জনের স্বাক্ষর সংগ্রহ করলেন আলেকান্দার। এরপর বরিশাল ডিএমএলএ অফিসে স্টাফ অফিসার লে: সুফিয়ানের কাছে জমা দিলাম। কপি এসজেডএমএলএ যশোর সেনা নিবাসের কাছে ডাক যোগে পাঠালাম। পরের দিন শুক্রবার যশোর থেকে ব্রিগেডিয়ার মতিয়ার রহমান এসজেডএমএলএ প্রশাসনিক কাজে বরিশাল এলে দুপুরে পুলিশ লাইনের পরেশ সাগর দিঘিতে বড়শি দিয়ে মাছ ধরার জন্য চার ফেললেন। আমি মাছ ধরার উপকরণগুলো যোগার করে দিলাম। বেলা ৩টায় আমি, ডিএমএলএ, এসপি ও ব্রিগেডিয়ার সাহেব মাছ ধরার মাচায় বসলাম। ব্রিগেডিয়ার মতিয়ার রহমান সাহেবের সাথে আমার আগেই পরিচয় হয়েছিল, পূর্ববর্তী ডিএমএলএ কর্নেল সিরাজ থাকাকালীন। ছোট বড় ৬টা রুই, মৃগেল মাছ বড়শিতে ধরা পড়লো। ব্রিগেডিয়ার সাহেব সবাইকে বন্টন করে দিলেন। রাতে সার্কিট হাউজে খাবার টেবিলে আমিও থাকি। খাবার চলাকালে ডিএমএলএ সাহেব ব্রিগেডিয়ার সাহেবকে বললেন, স্যার, হিরনের ব্যাপারে এলাকাবাসী তাকে ভাল লোক বলে দরখাস্ত দিয়েছে। কাজী সাহেব হিরনের ব্যাপারে সুপারিশ করেছেন। ব্রিগেডিয়ার সাহেব বললেন, দুইজন পদস্থ বেসামরিক কর্মকর্তা দিয়ে তদন্ত করে দেখুন। যেটা ন্যায় সেটাই আমরা করবো। তিনি বললেন, ওকে, স্যার। পরের দিন সকাল ১০টায় ডিএমএলএ সাহেব আমাকে সার্কিট হাউজে আসতে বললেন, আমি আগেই আসলাম। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন তদন্ত করতে কাদের দেব? আমি বললাম ডিএসবি’র ডিআই ওয়ান এবং জেলা দুর্নীতি দমন অফিসের কর্মকর্তা এএসপি নুরুল ইসলাম সাহেবকে দিলে সুষ্ঠু তদন্ত হবে। কারণ দুইজনই আমার বন্ধু। ন্যায় কাজ হবে। তারা ভাল অফিসার। তাদের ডাকা হল ফোনে। তারা আসলেন, নিরপেক্ষ তদন্ত করতে বললেন। প্রয়োজনে কাজী সাহেবের সাথে যোগাযোগ রাখবেন, তদন্তকাজে সহযোগিতা পাবেন জানালেন ডিএমএলএ । এদিকে হিরন আত্ম গোপনে। মাঝে মধ্যে বরিশালের একটি নির্দিষ্ট স্থানে রাতে আমাদের দেখা হত, কথা হত। কিন্তু হিরন খুবই উদ্বিগ্ন ডিএমএল’র সাথে দেখা করতে হবে। নাছোড়বান্দা। এই তার দাবী তাই ডিএমএলএ কে অনেক কথা বলে হিরনের সাথে দেখা করার জন্য রাজি করলাম। কিন্তু অফিসে না। কাশীপুরের তখনকার আমার গ্রামের বাড়িতে রাত ৯টায়। আমি বাড়িতে তাদের জন্য হাঁসের মাংস ও রুটি পিঠার আয়োজন করলাম। ডিএমএলএ’র সাথে মার্শাল কোর্টের চেয়ারম্যান মেজর আবুল আলম ও দুইজন দেহরক্ষী ছিলেন। হিরন সন্ধ্যা থেকে একটা চাদর গায়ে আমার বাড়িতে তাদের অপেক্ষায় ছিলেন। তাই যথারীতি খাবার টেবিলে দেখা হল। কথা হল ফাঁকে ফাঁকে। ডিএমএলএ এক পর্যায় বলেই দিলেন, ডোন্ট ওরি, ইউ ডু ইয়োর জব। কারণ কথা বার্তার সময় হিরন বলে ছিলেন, স্যার, আমি একটা ব্রিকফিল্ড চালাচ্ছি। সময় দিতে পারছিনা বলে অনেক আর্থিক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আমি দোষী হলে আমাকে শাস্তি দিবেন, আমি পালাবো না। কাজী সাহেব আমার জামিনদার হবেন। ডিএমএলএ হাসি দিয়ে বললেন, অল রাইট। পরের দিন হিরন আমার কাছে আকুতি জানায়। তাকে সার্কিট হাউজে নিয়ে যেতে হবে। আমি অনুমতি ছাড়াই হিরনকে সার্কিট হাউজে নিয়ে সামনের রুমে তাকে বসিয়ে রেখে ডিএমএলএর রুমে ঢুকে বললাম, হিরণকে নিয়ে আসছি। অন্তত এক কাপ চা খাওয়ান, স্যার। ডিএমএলএ হতচকিত। হাসি দিয়ে তিনি বললেন, আমি সামনের রুমে আসছি, ওখানে চা খাব সবাই। ভাবছি আমি সাকসেস্ফুলের দোরগোড়ায়। এভাবে হিরনের অনেক ক্রাইসিসের সাথে আমি সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলাম। হিরন সর্বক্ষেত্রে নির্দোষ থাকায় তার কোন ক্ষতি হয়নি মনে করি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে হিরনের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাই তাকে অযথা হয়রানির কাজে লিপ্ত ছিল। তাই বলতে হয়, আল্লাহই ভাল জানেন, কাকে দিয়ে তিনি জনগণের খেদমত করাবেন। আজ হিরণ নেই। রয়ে গেছে তার উন্নয়নের অসংখ্য ছোঁয়া ও স্মৃতি। আর মানুষের হৃদয় নিঙরানো অফুরন্ত ভালবাসা। আমরা সকলে গর্বিত এই মানুষটির জন্য।