হরতাল-অবরোধে নগরীর বাণিজ্যিক খাতে ধস

রুবেল খান॥ বিএনপি-জামায়াত জোটের চলমান লাগাতার হরতাল-অবরোধে নগরীর বাণিজ্যিক খাতে ধস নেমে আসছে। হরতাল অবরোধের প্রভাবে প্রায় প্রতিদিনই কোটি টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। এমনকি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বরিশালের ইন্ডাস্ট্রিয়াল কোম্পানি সহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এর পাশাপাশি গত প্রায় দুই মাসে গড়ে বরিশালে শত কোটি টাকার লোকশান গুণতে হয়েছে বলেও দাবী করেছেন ব্যবসায়ীরা। যার ফলে হরতাল অবরোধ পরিহার করে দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দলকে একটি সুষ্ঠু সমাধানের দাবী জানিয়েছেন তারা। অন্যথায় ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ করে পথে বসতে হবে ব্যবসায়ীদের। এমন মন্তব্য করেছেন বরিশালের ব্যবসায়ী নেতারা।
সূত্র মতে, গত ৬ জানুয়ারি থেকে দেশব্যাপী বিএনপি-জামায়াত সহ ২০ দলীয় জোটের লাগাতার অবরোধ ও হরতাল কর্মসূচি চলে আসছে। এর ফলে দেশের প্রতিটি জেলা উপজেলার ন্যায় আর্থিক দৈণ্যদশা এবং বাণিজ্যিক খাতে ব্যাপক ভাবে পিছিয়ে পড়তে হয়েছে বরিশালকেও। কাঁচা বাজার থেকে শুরু করে ইন্ডাস্ট্রিয়াল কোম্পানি গুলোতে প্রতিদিন কোটি টাকার মত লোকশান গুণতে হচ্ছে। এমনকি কাঁচামাল সরবরাহের অজুহাতে ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে বরিশালের অন্যতম শিল্প প্রতিষ্ঠান সোনারগাঁও টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে গেছে। পথে বসতে হয়েছে সেখানকার শত শত শ্রমিক-কর্মচারীদের। এর পাশাপাশি আরো বেশ কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন এবং সরবরাহ কমে যাওয়ায় সেগুলোও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
বরিশাল নগরীর অন্যতম মার্কেট প্লেস চক বাজার। এখানে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টাকার কেনাবেচা হয়। কিন্তু হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি শুরুর পরে সব থেকে বড় এই মার্কেট প্লেসে বেচা বিক্রিতে ধস নেমে এসেছে। অনেকটা বন্ধ হয়ে গেছে সরবরাহ।
বরিশাল চক বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও সাবেক কাউন্সিলর শেখ আব্দুস সোবহান বলেন, আমরা ব্যবসায়ীরা ভালো নেই। মার্কেটে বেচা বিক্রির অবস্থা খুবই খারাপ।
তিনি বলেন, চক বাজার এলাকায় ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় তিনশ’র মত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। হরতাল-অবরোধ শুরুর পূর্বে এই মার্কেটটিতে প্রতিদিন এক কোটি টাকার লেনদেন হতো। কিন্তু হরতাল-অবরোধ শুরুর পরে গত প্রায় দুই মাসে বৃহত্তর এই মার্কেটে প্রতিদিনের লেনদেন নেমে এসেছে ১০ থেকে ১৫ লক্ষ টাকায়।
ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শেখ সোবাহান বলেন, বর্তমানে মার্কেটে ক্রেতা আসছে না। মৌসুমের পরিবর্তন ঘটলেও বেচা বিক্রির ধরণ পরিবর্তন হয়নি। কোটি কোটি টাকার মালামাল দোকানে পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তার মধ্যে বেচা বিক্রি না থাকলেও মাস গেলে কর্মচারিদের বেতন, দোকান ভাড়া এবং বিদ্যুৎ বিল বাধ্যতা মূলক ভাবে দিতেই হচ্ছে। এতে করে চক বাজারের ব্যবসায়ীরা খুবই খারাপ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। এজন্য দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলকে অহরতাল-অবরোধ পরিহার করে একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহবান জানান। অন্যথায় ব্যবসায়ীদের আত্মহত্যার কোন পথ থাকবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বরিশালের সর্ব বৃহৎ পাইকারী কাঁচাবার নগরীর ভাটার খাল বহুমুখী সিটি মার্কেট পাইকারী কাঁচা বাজার। এখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কাঁচা মাল আসছে। পাশাপাশি এখান থেকেই দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে পাইকাররা কাঁচা মাল কিনে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু হরতাল অবরোধ শুরুর পরে এই বাজারেরও একই পরিণতি প্রত্যক্ষ করা গেছে।
বহুমুখী সিটি মার্কেটের পাইকারী কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি দেলোয়ার হোসেন ভূঁয়া পরিবর্তনকে জানান, তাদের পাইকারী কাঁচা বাজারে ৭০টির মত আড়ৎ রয়েছে। এখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্রাক ও ট্রলার বোঝাই করে বিভিন্ন কাঁচামাল ও তরি তরকারী নিয়ে আসা হয়। কিন্তু বর্তমানে কাঁচাবাজার আমদানী অনেক কমে গেছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে ডাল সিজন। তার মধ্যে আবার সবজির ট্রাক আসছে না। ঈশ্বরদী থেকে প্রতিদিন হাতে গোনা ২/১টি ট্রাক আসছে। তাও অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে। তবে কোন কোন দিন ট্রাক আসছে না।
তিনি বলেন, সড়ক পথে কিছুটা সমস্যা থাকলেও নৌ পথে ট্রলারে বিভিন্ন স্থান থেকে কাঁচামাল সরবরাহ করা হচ্ছে। তাতে তাদের বাজার মোটা মুটি অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত ভাড়া এবং জ্বালানি খরচ বহন করে কাঁচা তরি তরকারি বরিশালে আনা হলেও বাজারে আসছে না ক্রেতারা। দুর দুরান্তের পাইকাররা না আসায় প্রতিদিন প্রায় ৫০ মনের মত নষ্ট কাঁচামাল ফেলে দিতে হচ্ছে নদীতে। এতে করে তাদের প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা ক্ষতি হচ্ছে। হরতাল অবরোধ না থাকলে তাদেরকে এমন লোকশান গুণতে হত না বলেও দাবী করেন ব্যবসায়ী নেতা দেলোয়ার হোসেন ভূঁয়া।
নগরীর অন্যতম বিপনী বিতান হাজি মোহাম্মদ মহসিন মার্কেট। এই মার্কেটের ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি সেখর দাস বলেন, তাদের মার্কেটে দুই শতাধিক পোশাকের দোকান রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন কম হলেও প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার লেনদেন হতো। কিন্তু হরতাল অবরোধের ফলে এখন আর তা সম্ভব হচ্ছে না। মৌসুমের পরিবর্তন হলেও ব্যবসায়ীরা নাশকতার আশংকায় ঢাকায় মাল আনতে যেতে পারছে না। সেখর দাস বলেন, দেশের এমন অবস্থা বজায় থাকলে ব্যবসায়ীদের দোকান পাট বন্ধ করে পথে বসতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এসব বিষয়ে আলাপকালে দি বরিশাল চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এর সভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু পরিবর্তনকে বলেন, হরতাল-অবরোধের মধ্যে সব থেকে বেশি ক্ষতি হচ্ছে বাণিজ্য ক্ষেত্রে। কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে পরিবহন শিল্প প্রর্যন্ত সব খানেই গত প্রায় দু-মাস ধরে শুধু লোকসান আর লোকসান। তিনি বলেন, হরতাল অবরোধের গত প্রায় দুই মাসে বরিশালে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে প্রায় এক কোটি টাকা করে গচ্ছা দিতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের। সে অনুযায়ী প্রায় দুই মাসে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে সম্ভাব্য শত কোটি টাকা লোকশান হয়েছে বলে জানান সাইদুর রহমান রিন্টু।
তবে তিনি বলেন, এই সমস্যা প্রথম দিকে প্রকট আকার ধারন করেছিলো। তবে বর্তমানে পূর্বের পরিস্থিতি থেকে আমরা কিছুটা সড়ে এসতে পারেছি। সরকার এবং প্রশাসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে বর্তমানে দেশ অনেকটা শান্ত হয়েছে। ফলে বরিশালের বাণিজ্য ক্ষেত্রেও অচলাবস্থা দূর হতে চলেছে। তবে পূর্বে যে ক্ষতি হয়েছে তা সারিয়ে উঠতে কিছুটা সময় লাগবে বলেও জানান এই ব্যবসায়ী নেতা।