হত্যা মামলার আসামি হয়েও বানারীপাড়ায় ইউপি চেয়ারম্যান মিন্টু বহাল তবিয়তে

রুবেল খান ॥ নির্বাচনী আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে অজানা শক্তিতে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া বানারীপাড়ার সলিয়াবাকপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিয়াউল হক মিন্টু রয়েছেন বহাল তবিয়তে। জাসদ নেতা সৈয়দ হুমায়ুন কবির হত্যা মামলার চার্জশীটভূক্ত আসামী মিন্টু সেই অজানা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দাবড়ে বেড়াচ্ছে তার ইউনিয়ন থেকে শুরু করে বানারীপাড়া উপজেলা পর্যন্ত। আর মিন্টুর অজানা শক্তির কারণে সে যা বলছে তা নিশ্চুপ মেনে নিচ্ছেন এলাকাবাসী। এলাকার একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ২৩ অক্টোবর জাসদ নেতা কবির হত্যা মামলার হত্যা মামলায় আদালতে চার্জশীট দাখিল করে পুলিশ। তার মধ্যেই নির্বাচনী বিধি ভঙ্গ করে গত মার্চ মাসে ইউপি নির্বাচনে প্রার্র্থী হন তিনি। অজানা শক্তি এবং জাল-জালিয়াতি ও ভোট কারচুপির মাধ্যমে জয়লাভ করে চেয়ারম্যান বনে যান মিন্টু। পরবর্তীতে প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীরা মিন্টুর তথ্য গোপনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মহলে অভিযোগ দিলেও কোন কাজ হয়নি। ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় মিন্টু রয়েছেন দাপুটে চেয়ারম্যান হয়ে। জানা গেছে, ২০১৩ সালে বানারীপাড়া উপজেলার সলিয়াবাকপুর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান এবং সর্বহারা দলের অন্যতম নেতা জিয়াউল হক মিন্টু এবং চাখার ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মজিবুল ইসলাম টুকু’র নেতৃত্বে খুন হয় উপজেলা জাসদের সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ হুমায়ুন কবির। ঐ ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই সৈয়দ তরিকুল ইসলাম আপু বাদী হয়ে বানারীপাড়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ঐ মামলায় জিয়াউল হক মিন্টু এবং মজিবুল ইসলাম টুকুসহ তাদের নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যদের আসামি করা হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বানারীপাড়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সঞ্জিৎ চন্দ্র শীল ঘটনার প্রায় তিন মাসের মাথায় আদালতের কাছে মিন্টুসহ ১০ জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এর মধ্যে চাখার ইউপি’র সাবেক চেয়ারম্যান মজিবুল হক টুকুকে প্রধান ঘাতক হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। এরপর মজিবুল হক টুকু এবং জিয়াউল ইসলাম মিন্টু উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে চার্জশীটভূক্ত অন্যান্য আসামিদের নিয়ে বাদী এবং তার পরিবারকে নানাভাবে হুমকি ধামকি দিয়ে আসছে।
চলতি বছরের মার্চে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে উপজেলার সলিয়াবাকপুর এবং চাখার ইউনিয়ন থেকে প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন হত্যা মামলার দুই আলোচিত এবং চার্জশীটভূক্ত আসামি জিয়াউল হক মিন্টু এবং মজিবুল ইসলাম টুকু। কিন্তু এদের মধ্যে চাখার ইউপি’র সাবেক চেয়ারম্যান মজিবুল ইসলাম টুকুর বিরুদ্ধে জাসদ নেতা হত্যা মামলার চার্জশীট থাকায় তার মনোনয়ন পান নি। তবে একই মামলার চার্জশীটভূক্ত ১০নং আসামি হওয়া সত্বেও রহস্যজনকভাবে টিকে যায় জিয়াউল হক মিন্টুর মনোনয়নপত্র। অবশ্য নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেন, নির্বাচনকালীন আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতার আশীর্বাদ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে চার্জশীটভূক্ত আসামি মিন্টুর মনোনয়নপত্রটি বৈধতা পায়। এমনকি ভোট জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে যান বলে অভিযোগ উঠেছে।
অপরদিকে বানারীপাড়া থানার একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, জাসদ নেতা হত্যাকান্ডের সময় জিয়াউল হক মিন্টু এবং মজিবুল ইসলাম টুকু দু’জনই সলিয়াবাকপুর এবং চাখার ইউপি’র চেয়ারম্যান ছিলেন। তখনকার সময় হত্যা মামলায় এই দুই চেয়ারম্যান বেশ কিছুদিন জেল খাটেন। পরবর্তীতে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে জামিনে মুক্তি পায়। তাছাড়া সর্বহারা দলের এই দুই ক্যাডারের বিরুদ্ধে ২০১৩  সালের ২৩ অক্টোবর ৩০২/৩৪/১১৪ দন্ড বিধি মোতাবেক আদালতে চার্জশীট দাখিল করে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। যার অভিযোগপত্র নম্বর ১১৭। অভিযোগপত্রটি ২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বর আদালত গ্রহণ করেন।
দুই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে তৎকালীন সময় আইনগত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট একটি পত্র প্রেরণ করেন বানারীপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) গোলাম সরোয়ার। যার স্মারক নম্বর ৫২২৯ এবং তারিখ ২০১৩ সালের ১ নভেম্বর। এর পরিপ্রেক্ষিতে একই বছরের ২ ডিসেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইয়েদ এ.জেড মোরশেদ আলী বরিশাল জেলা প্রশাসক বরাবর একটি পত্র প্রেরণ করেন। যার স্মরক নং উনিঅ/বানারী/২০১৩/১৭২(২)। স্মারকে বলা হয়, সলিয়াবাকপুর ইউপি চেয়ারম্যান জিয়াউল হক মিন্টু এবং চাখার ইউপি চেয়ারম্যান মজিবুল হক টুকু’র বিরুদ্ধে বানারীপাড়া থানায় হত্যা মামলা এবং আদালতে চার্জশীট রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে উক্ত চেয়ারম্যানদ্বয় উপজেলা পরিষদের সভাসহ ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রমে অংশ গ্রহণ করতে পারবে কি না সে মর্মে আইনগত নির্দেশনা প্রদান পূর্বক পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানানো হয়। বরিশাল জেলা প্রশাসকের বরাবর দেয়া এই পত্রের অনুলিপি দেয়া হয়েছে স্থানীয় সরকার পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বরিশালের স্থানীয় সরকারকে। পরবর্তীতে এই চিঠি জেলা পরিষদ থেকে মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে কিনা সে বিষয়টি আপাতত অবগত নন বর্তমান জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান। এদিকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চিঠি চালাচালির পরেও বিগত সময়ে জাসদ নেতা হত্যাকারী সন্ত্রাসী ও সর্বহারা নেতা জিয়াউল হক মিন্টুকে বরখাস্ত করা হয়নি। সে পূর্ণ সময়ে বহাল তবিয়তে থেকে চেয়ারম্যানি পদে টিকে যান। অভিযোগ রয়েছে সর্বহারা বাহিনীর অবৈধ অস্ত্রের জিম্মাদার ছিলেন মিন্টু। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয় সর্বহারা দলের প্রধান মোয়াজ্জেম হোসেন রিপন। পরবর্তীতে সু-কৌশলে প্রকাশ্যে আসে মিন্টু। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের তকমা লাগিয়ে পুনরায় সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে মেতে ওঠে। এমনকি সর্বহারা দলের বাকী সদস্য নিয়ে পুনরায় বাহিনী গড়ে তোলে তারা দু’জন। আর সেই বাহিনী নিয়েই নির্মমভাবে পিটিয়ে এবং কুপিয়ে হত্যা করে বানারীপাড়া উপজেলা জাসদ নেতা সৈয়দ হুমায়ুন কবিরকে। এ প্রসঙ্গে বরিশাল জেলা নির্বাচন অফিসার আব্দুল হালিক খান এর সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, হত্যা মামলার চার্জশীট হলেই যে নির্বাচনে প্রার্থীতা করতে পারবে না তা ঠিক নয়। কেননা মামলা হলে পুলিশ পক্ষে বিপক্ষে অভিযোগপত্র দিবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সাজাপ্রাপ্ত কিংবা পালাতক আসামির ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। এ ধরনের কেউ থাকলে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। তবে বরখাস্তের বিষয় থাকলে তা স্থানীয় সরকার বিভাগ দেখবে। বরিশাল জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান বলেন, স্থানীয় সরকার বিভাগ অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে জনপ্রতিনিধিদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধি স্থায়ী এবং অস্থায়ীভাবে বরখাস্ত হতে পারে। তবে কোন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে ফৌজধারী মামলার চার্জশীট থাকলে সে সাময়িকভাবে বরখাস্ত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়গুলো মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তর থেকে প্রেরিত পত্রের বিষয়ে তিনি বলেন, ২০১৩ সালের ঘটনা বিধায় বিষয়টি তার জানা নেই। তবে এমন কোন চিঠি প্রেরণ করা হলে তা জেলা প্রশাসন কার্যালয় থেকে মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ না করার কোন সুযোগ নেই। তারপরেও বিষয়টি তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে জানিয়েছেন। উল্লেখ্য বরিশালের প্যানেল মেয়র আলহাজ¦ কে এম শহিদুল্লাহ অস্ত্র মামলায় চার্জশীটভূক্ত হলে তাকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি বহিষ্কার করা হয়। সারাদেশে অনেক জায়গায়ই এ ধরণের আইন প্রয়োগ করা হলেও সলিয়াবাকপুর ইউপি চেয়ারম্যান মিন্টুর বেলায় এই আইন প্রয়োগ করা হয়নি।