হতভাগ্য শ্রমিকদের অবিস্মরণীয় ঘটনা অন্তরাল হয়েই রইল

ফাতিমা পারভীন ॥ প্রতিটি বিষয়েরই থাকে অতীত। হোক তা আনন্দের বা বিষাদময়। পৃথিবীর বুকে এমনি এক বিষাদময় দিবস হচ্ছে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। যা সচরাচর মে দিবস নামে অভিহিত প্রতি বছর ১লা মে তারিখে বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়। মূলত এটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের উদযাপন দিবস। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শ্রমজীবী মানুষ এবং শ্রমিক সংগঠন সমূহ রাজপথে সংগঠিতভাবে মিছিল ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে দিবসটি পালন করে থাকে। বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে ১লা মে জাতীয় ছুটির দিন। আরো অনেক দেশে এটি বেসরকারি ভাবে পালিত হয়। ইতিহাস ১৮৮৬ সালে আমোরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের ম্যাসাকার শহিদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে পালিত হয়। সেদিন দৈনিক আটঘন্টার কাজের দাবীতে শ্রমিকরা হে মার্কেটে জমায়েত হয়েছিল। তাদেরকে ঘিরে থাকা পুলিশের প্রতি এক অজ্ঞাতনামার বোমা নিক্ষেপের পর পুলিশ শ্রমিকদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। ফলে প্রায় ১০-১২জন শ্রমিক ও পুলিশ নিহত হয়। এর পরপরই ১৮৯৪ সালের মে দিবসের
দাঙ্গারঘটনা ঘটে। পরে, ১৯০৪ সালে আমস্টারডাম শহরে অনুষ্ঠিত সমাজতন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই উপলক্ষে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবে দৈনিক আটঘন্টা কাজের সময় নির্ধারণের দাবী আদায়ের জন্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বজুড়ে পয়লা মে তারিখে মিছিল ও শোভাযাত্রা আয়োজনের সকল সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল এবং শ্রমিক সংঘের (ট্রেড ইউনিয়ন) প্রতি আহবান জানানো হয়। সেই সম্মেলনে “শ্রমিকদের হতাহতের সম্ভাবনা না থাকলে বিশ্বজুড়ে সকল শ্রমিক সংগঠন মে’র ১ তারিখে “বাধ্যতামূলকভাবে কাজ না করার” সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই দিবসটি নিয়ে রয়েছে বিশাল ইতিহাস।
অবশ্যি এই ইতিহাস কম বেশি অনেকেই জানে। যাহোক আমি সেদিকে যাবনা। তবে শ্রমিক দিবসে সকল শ্রমিকদের নিয়ে লিখতে ইচ্ছে করে কিন্তু আজ সুনির্দিষ্ট করে পোশাক শ্রমিকদের নিয়ে লিখতে ইচ্ছে করছে। তাই আমার ইচ্ছেটাকে দমন করতে পারি নি।
আমাদের সমাজ/ রাষ্ট্রে স্বার্থান্বেষী কান্ডজ্ঞানহীন মানুষের কারণে পূর্বেও হাজারো শ্রমিকদের জীবন দিতে হয়েছে। দেশের শীর্ষ মহলের সজাগ দৃষ্টি না থাকায় গত ২০১৩ সালের ২৪ শে এপ্রিল সাভারে রানা প্লাজা ধসে পড়লে সেখানে থাকা পাঁচটি তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকসহ ১১০০ জনের বেশি প্রাণ হারায়। আহত হন হাজারের বেশি মানুষ।
বিষয়টি যেমন ছিল দুঃখজনক তেমনি ছিল ক্ষতিগ্রন্থ। একটু পিছনে ফিরলে দেখা যায় শ্রমিকদের উপরে কতটা ট্রাজেডি নেমে আসছে। গত ২০০৫ সালের ১১ই এপ্রিল গভীর রাতে সাভারের পলাশ বাড়ির শাহরিয়ার ফেব্রিক্স ইন্ডাসট্রিজ লিমিটেড ও স্পেকজাম সোয়েটার ইন্ডাসট্রিজ লিমিটেড আটতলা ভবনটি ধসে পড়ে। এই সময় মারা যায় ৬২জন শ্রমিক। আহত হন ও পঙ্গুত্ব বরণ করেন আরো শতাধিক ব্যক্তি। ২০১০ সালের ১জুন রাত ১২টার দিকে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার বেগুন বাড়ির পোস্ট অফিস গলির ১৮নম্বরের ৪ তলা ভবন ধসে পড়ে পাশের তিনতলা বিশিষ্ট কাঠের পাঠাতনের ঘরের ওপর। এতে নিচে থাকা টিনশেড বাড়িগুলো দুমড়ে-মুছড়ে যায় এবং কয়েকশ মানুষ বন্দি হয়ে পড়ে। মুহুর্তে ২৫ জন মানুষ প্রাণ হারায়।
বারবার এভাবে ভয়াবহ ধ্বংস স্তুপে প্রাণ হারান এবং পঙ্গুত্বে বরণ করেন গ্রাম্য সরলতায় উদ্ভাসিত শ্রমিকরা। ‘হতভাগ্য এই শ্রমিকদের মধ্যে বেশিরভাগ নারী শ্রমিক। নারী শ্রমিকের হতভাগ্যের কথা বলতে গেলে চোখের সামনে চলে আসে অর্থনৈতিক কাঠামো। অর্থনৈতিক কাঠামো নারীর জীবনে এক বড় ধরনের ভূমিকা রাখে। অথচ সব অর্থনৈতিক কাঠামোর সামনে চলে আসে নারী-পুরুষের লিঙ্গভিত্তিক শ্রম বিভাজন। মূলত এই বিভাজন সামাজিক শ্রম বিভাজন বলেও চিহ্নিত হয়ে থাকে।
আজও এই বিভাজনের প্রচলন দেখা যায় প্রায় জায়গায় ফলে নারীরা অথর্নৈতিকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। শ্রমিক নিরাপত্তা এবং এঁদের ন্যূনতম মজুরির বিষয়টি আজও কেন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকবে সবার কাছে?
এই প্রশ্নটি পিছিয়ে পড়া নারীদের আরও একধাপ পিছিয়ে নিয়ে যায়।
দেশের গার্মেন্টস শিল্পে শ্রমিকদের দামি শ্রমের কারণে বিপুল পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্বের দরবারে আজ বাংলাদেশকে নিয়ে যাচ্ছে এক সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে অথচ সেই শ্রমিকদের দামি শ্রম সস্তা মজুরিতে বিক্রি করতে হয়।
রানা প্লাজার আগেও অনেকবার দূর্ঘটনা ঘটেছে তারপরও শ্রমিকদের নানামুখী দূর্ঘটনায়,ভবন ধস বা ভূমিকম্প ইত্যাদি বড় ধরনের বিপর্যয় মোকাবেলায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই দেশে। নেই বিপুল পরিমানে রড, কংক্রিট দ্রুত সরিয়ে উদ্ধারকাজ চালানোর মত অত্যাধুনিক সরঞ্জাম। ফলে উদ্ধারকারীদের অসহায়ত্বেরর শিকার হতে হয়েছে বারবার। রানা প্লাজার ধ্বংসস্তুপের নিচে বিপুল সংখ্যক মানুষ চাপা পড়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারনে রানা প্লাজায় লাশের সংখ্যা বেড়েছিল। মানবতার কারণে তাৎক্ষণিক ছুটে আসা এলাকার মানুষসহ হাজার হাজার দর্শকের সর্বত্তম আচরনের বিস্ময়কর চিত্ররুপ মনে পড়লে আজও হৃদপিন্ডটি বেহাগরাগে বেজে ওঠে। তাঁদের নিজেদের প্রিয় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মৃত্যুকূপে ঝাপিয়ে পড়া প্রশিক্ষণহীন সাধারণ মানুষের মহৎ ও দুঃসাহসিক উদ্ধার অভিযান বিশ্বের দরবারে একটি দৃষ্টান্ত রাখবে। তাঁদের দেশ প্রেমের শানিত অস্ত্র নিয়ে তাঁরা যেভাবে নিজেদের নিয়োজিত করেছেন আর্তমানবতাকে উদ্ধারের জীবন-মরণ যুদ্ধে, তাঁদের রক্তদান, খাবার পানি পান করানসহ যে সকল ডা.-নার্স নিঃস্বার্থভাবে সেবা দিয়েছেন তা সত্যিকারে দেশ প্রেমের এক বাস্তব চিত্র ফুঁটে ওঠেছে। দেশের চার দশকের ভবন ধসটি যেমন ইতিহাসের অন্যতম নেতিবাচক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হবে ঠিক মানুষের এই প্রাণের সহযোগীতাও ইতিবাচক একটি দিক হিসেবে বিবেকবান মানুষের হৃদপিন্ডটির মাঝে দাগ কাটবে।
রানা প্লাজার ঘটনা নিয়ে আমার লেখা একাধিক কলাম প্রকাশ হয়েছিল জাতীয় দৈনিকে। তারমধ্যে একজন মরিয়ের (৩০) ডান হাতটি কেটে ফেলার লোমহর্ষক জীবনের কথা তুলে ধরেছিলাম কলামে। কলামটি দৃষ্টিগোচর হয়েছিল নারীপক্ষের প্রকল্প ব্যবস্থাপক জনাব সামিয়া আফরিন। তিনি মরিয়মকে তিন লক্ষ টাকা নগদ প্রদাণ করেন।
মরিয়মরা ছোট ছোট সন্তানদের রেখে গার্মেন্টসে কাজ নেয় তখন, যখন অসহায়ত্বের সম্পুর্ণ দ্বার উন্মোচিত পেটের দায়ে পথে নামতে হয়। জীবনযুদ্ধে হেরে না গিয়ে সকালের সূর্য উদিত হবার আগেই দেশের অর্থনীতিতে মানবিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে গিয়ে ইট,বালি আর কংক্রিটের সাথে মিশে মরিয়মরা হয় বর্জ্য হয়ে যাবে অথবা হতভাগ্য শ্রমিকরা লাশের তালিকায় নাম পর্যন্ত লিখতে পারবেনা। দিনের পর দিন প্রমানের অপেক্ষায় লম্বা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে এতে শিল্পপতি বা রাষ্ট্রের কিছুই এসে যাবেনা। প্রিয় পরিবারের মানুষগুলো চার বছর ধরে অধীর আগ্রহে বসে আছে শুধুমাত্র একটি উপযুক্ত প্রমানের অপেক্ষা নিয়ে। প্রিয়জন হারা মানুষগুলো জানেনা উপযুক্ত প্রমান প্রমানিত করতে কত বছর সময় লাগবে ! তবে কি ধূসর মলাটে বন্দি হয়ে থাকবে হতভাগ্য শ্রমিকদের পরিচয়?রানা প্লাজার অবিস্মরণীয় ঘটনা দিনের পর দিন মাসের পর মাস অন্তরাল হয়েই রইল। নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিচয় মিললে প্রিয় পরিবারের জন্য বা ক্ষতিগ্রস্থ্য শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ ও চাকরির ব্যবস্থা হতো বা মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ফান্ডে পড়ে থাকতনা। পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকার কারণে বিতরণ করা সম্ভব হচ্ছেনা। প্রিয় পরিবার ক্ষতিপূরণ পেয়ে হয়তো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারতো কিন্তু তাও জুটলনা চার বছর অতিবাহিত হবার পরেও।
আসলে পৃথিবীতে অনেক কিছুই আকস্মিকভাবে ঘটে যায়। প্রকৃতি প্রায়ই মানুষকে সঠিক সময়ে সঠিকভাবে সতর্ক করেনা, অথচ রানা প্লাজা ধ্বংসযজ্ঞের আগে অবশ্যই সতর্ক সংকেত ছিল কিন্তু স্বার্থন্বেসী মহল হতভাগ্য শ্রমিকদের ভাগ্যে ভাল কিছুই ঘটতে দিলনা। শ্রমিকের দামি শ্রমকে মর্যাদা দিয়ে নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবার পাবে ক্ষতিপূরণ আর সুনাগরিকের মর্যাদা নিয়ে চোখের জলে ভাসবেনা “সন্ধান চাই” র দাবি নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় কষ্টের মিছিল দিতে হবেনা। সেই আশায় পথ চেয়ে আছে সোনার বাংলার সোনার মানুষগুলো
ঘাতক সোহেল রানা, সহযোগী সহ গার্মেন্টস মালিকদের গ্রেফতার ও রিমান্ডের মাঝে আমরা শান্তনা খুঁজে পেয়েছিলাম কিন্তু বিচারের দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষা আমাদের অনেকটাই হতাশ করে ফেলে। তারপরও বাংলার মানুষ বিশ্বাস করে আইনের কোন ফাঁকফোকর দিয়ে এই অর্থলোভী গণহত্যাকারীরা পার পাবেনা। অপরাধীরা যতই শক্তিশালী হোক না কেন অপরাধীরা চিরকাল অপরাধী। সকল অপরাধীদের মৃত্যুদ- দিয়ে হতভাগ্য শ্রমিকদের সর্বোচ্চ সম্মানটুকু দিবেন সরকার এটাই আমাদের প্রাণের আবেদন। অপরাধীদের বিচার করে আমাদের দেশ বিশ্বের কাছে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আবার শ্রমিকদের হত্যার অপরাধের বিচার করে শিক্ষা দিবে সব অবৈধ অর্থলোভী ভবন মালিকদের। আর রানা প্লাজা হচ্ছে এক ভয়াবহ মৃত্যু কূপের নাম তাই ধ্বংস যজ্ঞ সীমানাটুকুই হোক স্মৃতি বিজরিত একটি বদ্ধভূমি।