স্বাস্থ্য মন্ত্রীর আশ্বাসেরও প্রতিফলন নেই ॥ শেবাচিম হাসপাতালের মর্ডানাইজেশন’র ভবন নির্মান কাজ ৯ বছরের শেষ হয়নি

রুবেল খান ॥ দক্ষিণাঞ্চলবাসীর চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সেবার একমাত্র প্রতিষ্ঠান পাঁচশ শয্যা বিশিষ্ট শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতাল। কিন্তু প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুই হাজার রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা গ্রহন করছে হাসপাতালটিতে। আর তাই ওয়ার্ড গুলোতে শয্যা তো দুরের কথা মেঝেতেও ঠাঁই হচ্ছে না রোগীদের। ওয়ার্ডের বারান্দা ও তৎসংলগ্ন খালি জায়গায় বেডশিট বিছিয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে তাদেরকে। দীর্ঘ বছর ধরে চলে আসা এই দুর্ভোগ লাঘবে হাসপাতালের মুল ভবনের পূর্ব পাশেই আরো একটি মর্ডানাইজেশন অব এক্সটেনশন’র জন্য বহুতল ভবনের নির্মান কাজ শুরু হয়। ২৭ মাস কার্যদিবসের মধ্যে নির্মান কাজ শেষ করার চুক্তিতে ঢাকার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আজাদ কন্সট্রাকশন কাজ শুরু করলেও গত ৯ বছরের অধিক সময়েও শেষ হয়নি হাসপাতাল ভবন নির্মান কাজ। নানা জটিলতার কারনে ভনটি এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। সেখানে আস্তানা গেড়েছে মাদক ব্যবসায়ী সহ বিভিন্ন অপরাধী চক্র। সর্বশেষ স্বাস্থ্য মন্ত্রী বরিশাল সফরে এসে ছয় মাসের মধ্যে ভবনটিতে চিকিৎসা কার্যক্রম শুরুর আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই আশ্বাসের বাস্তবায়ন আদৌ ঘটেনি। এর ফলে রোগীদের ভোগান্তিও সহসাই কাটছে না। তাই বিষয়টি নিয়ে হতাশাগ্রস্থ হচ্ছেন বরিশালবাসী।
গনপূর্ত বিভাগ ও শেবাচিম হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৮ সালে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তির কার্যক্রম শুরু হয়। এর কয়েক বছর পরেই কলেজের সামনে পাঁচতলা বিশিষ্ট বিশাল এলাকাজুড়ে গড়ে তোলা ভবনে পুরোদমে শুরু হয় রোগীদের চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম। সেই সাথে শিক্ষার্থীদের ক্লিনিক্যাল ক্লাসও হয়ে আসছে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে হাসপাতালটিতে বিভিন্ন বিভাগ স্থাপনের পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির সুচনা ঘটে। বর্তমানে ১৮টি বিভাগ সম্বলিত এই হাসপাতালে রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে দেদারছে। তাই তিন ধাপে হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে ৫শ শয্যায় উন্নীত করা হয়। কিন্তু বৃদ্ধি পায়নি ভবন কিংবা জায়গা। একটি পর্যায় হাসপাতালে রোগীদের চাপ সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় কর্তৃপক্ষের। সাই সাথে বাড়ে অব্যবস্থাপনার চিত্রও। এমন সমস্যা থেকে পরিত্রান পেতে সর্বশেষ ২০০৮ সালে হাসপাতালের মুল ভবনের পূর্ব পার্শ্বে ১০ তলা ভিতে ৭ তলা বিশিষ্ট মর্ডানাইজেশন অব এক্সটেনশন ভবন নির্মানের উদ্যোগ গ্রহন করে সরকার। ভবনের নির্মান কাজ চলাবস্থাতেই ২০১৩ সালে শেবাচিম হাসপাতালকে কাগজে কলমে এক হাজার শয্যায় উন্নীত করা হয়। কিন্তু সুযোগ-সুবিধা সেই ৫শত বেডেরই রয়ে গেছে।
এদিকে গনপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানাগেছে, ২০০৮ সালের মার্চ মাসে সরকার শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ১০ তলা ভিত বিশিষ্ট ৭ তলা ভবনের চুক্তি সম্পাদন করে। আনুসঙ্গিক কাজসহ হাসপাতাল ভবন নির্মানের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৩০ কোটি টাকা। ১৫ দশমিক ৮৫ ভাগ কমে নিম্ন দরদাতা হিসেবে ২৫ কোটি টাকায় কাজ পায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আজাদ কনস্ট্রাকশন নামক ঢাকার এক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।
পরবর্তীতে নির্মান কাজ চলাবস্থাতেই ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে ৭ম তলার স্থলে ৫ম তলা পর্যন্ত ভবনটি নির্মানের সিদ্ধান্ত হয়। সাড়ে ৮ কোটি টাকার কাজ বাকী থাকতেই ২০১২ সালের আগষ্ট মাসে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারনে ভবন নির্মানের চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়। সেই সাথে ঠিকাদারের জামানত বাজেয়াপ্ত করে গনপূর্ত বিভাগ। যে কারনে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। আর তাই এক পর্যায় ভবন নির্মানের কাজ পুরোপুরি ভাবেই স্থবির হয়ে পড়ে।
এদিকে আদালতে মামলার জটিলতা কাটিয়ে ২০১৪ সালে নতুন করে দরপত্রের মাধ্যমে অবশিষ্ট কাজ সমাপ্তের ব্যয় ধরা হয় ১৯ কোটি টাকা। কিন্তু নানান জটিলতায় দীর্ঘ প্রায় ৫ বছর ধরে ৫৯ ভাগ কাজ সম্পন্ন হওয়া ভবনটি পড়ে রয়েছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। আর নির্মান প্রক্রিয়ার শুরু থেকে ৯ বছর চলে গেলেও নতুন ভবনে যেতে পারেনি শেবাচিম হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। নতুন এই ভবনের কাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত মুল ভবনে রোগীদের ভোগান্তি কমানো সম্ভব নয় বলে দাবী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।
জরাজীর্ন অবস্থায় পড়ে থাকা পাঁচতলা বিশিষ্ট ভবনটিতে সরেজমিনে দেখা গেছে, মাদক ব্যবসায়ী এবং গরু-ছাগলের ভাগাড়ে পরিনত হয়েছে পুরো ভবনটি। রাতে ভবনের বিভিন্ন তলায় জমে মাদক সেবন’র এবং ব্যবসায়ীদের নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রে। অসামাজিক কার্যকলাপও ঘটছে অহরন। পুরো ভবন জুড়েই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্যাথিডিন, মরফিনের এ্যাম্পুল, রক্তমাখা সিরিঞ্জ, ফেন্সিডিলের বোতল সহ মাদক সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জামাদী। রয়েছে অনৈতিক কর্মের জিনিসপত্র। পাশাপাশি গরু-ছাগলের ভাগারও রয়েছে ভবনটির নিচ তলায়। এক প্রকার অপরাধ এবং অপরাধীতের নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্র গড়ে উঠেছে ভবনটি।
এদিকে মাস কয়েক পূর্বে শেবাচিম হাসপাতালের নতুন আইসিইউ ভবন উদ্বোধনের লক্ষে বরিশালে আসনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম সহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাদের আগমনকে ঘিরে দীর্ঘ দিন জরাজীর্ন অবস্থায় পড়ে থাকা ভবনটির ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে বলে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন বরিশালবাসী। ঠিক তেমনকি করেই সাংবাদিকদের দেয়া এক সাক্ষাতকারে ছয় মাসের মধ্যে তিনি ভবনের অবশিষ্ট কাজ শেষে রোগী ভর্তি কার্যক্রম শুরু হবে বলে আশ্বস্থ করেছিলেন। কিন্তু সেই আশ্বাসের বাস্তবায়ন আদৌ ঘটবে কিনা তা নিয়েও দেখা দিয়ে সংসয়। কেননা গেলো জুলাই মাসে ভবনটি’র অবশিষ্ট কাজ সমাপ্তের জন্য দরপত্র আহ্বানের কথা থাকলেও তা আদৌ হয়নি। দাপ্তরিক জটিলতার কারনে টেন্ডার কার্যক্রমে গতি নেই বলে জানিয়েছেন গনপূর্তের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
এ প্রসঙ্গে গনপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। তবে গনপূর্ত মেডিকেল উপ-বিভাগের একজন দায়িত্বশীল প্রকৌশলী জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী সকল কাগজপত্র তৈরী করে তা মন্ত্রনালয়ে প্রেরন করা হয়েছে। এখন শুধু অনুমোদনের অপেক্ষা। মন্ত্রনালয় থেকে অনুমতি পাওয়া গেলে নতুন করে দরপত্র আহ্বান পরবর্তী ভবনটির নির্মান কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।