সুন্দরবনের কুখ্যাত শান্ত ও আলম বাহিনীর প্রধান সহ ১৪ জলদস্যুর আত্মসমর্পন

রুবেল খান ॥ সুন্দরবানের কুখ্যাত শান্ত বাহিনীর প্রধান মো. আব্দুল বারেক তালুকদার ওরফে শান্ত এবং আলম বাহিনীর প্রধান মো. আলম সরদার সহ ১৪ জন জলদস্যু র‌্যাব-৮ এর কাছে আত্মসমর্পন করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে র‌্যাব-৮ এর বরিশাল সদর দপ্তরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল-এমপি’র হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে আত্মসমর্পন করে তারা। এর আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর ভোর ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত টানা ১৭ ঘন্টা সুন্দর বনের সরণখোলা রেঞ্জের পৃথক দুটি স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে বরিশাল র‌্যাব-৮ এর অভিযানিক দল।
এর পূর্বে বরিশাল র‌্যাব-৮ এর অভিযানে আরো ২১ জন জলসদ্যু বিভিন্ন সময় অস্ত্র সহ আত্মসমর্পন করে। এদের জেলে প্রেরনের পরে বর্তমানে সবাই আদালতের মাধ্যমে জামিনে জেল থেকে বের হয়ে সুস্থ ও সাভাবিক জীবন যাপন করছে বলে র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ জানিয়েছেন।
এছাড়া গতকাল বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিক ভাবে আত্মসমর্পনকারী জলদস্যুদের মধ্যে রয়েছে শান্ত বাহিনীর প্রধান বাগেরহাট জেলার মোড়লগঞ্জ থানাধীন জামিল তলা গ্রামের মৃত ইসমাইল তালুকদারের ছেলে আব্দুল বারেক তালুকদার শান্ত (৪৮) সহ ১০ সদস্য। সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের পশুর নদী সংলগ্ন সুখপাড়া খালের জঙ্গে আত্মসমর্পনকারী জলদস্যু বাহিনীর সদস্যরা হলো- মো. মনির হোসেন, মো. দুলাল মোল্লা ভান্ডারী, মো. ফরিদ হাওলাদার, মো. আনিছুর রহমান মোল্লা, মো. বশির আহমেদ শেখ, মো. ফরিদ গাজী, মো. মোস্তফা শেখ, মো. নূরুল ইসলাম ও মো. খোরশেদ শেখ। এরা সকলে বাগেরহাট জেলাধীন মোড়লগঞ্জ, কচুয়া, মংলা এবং রামপাল থানা এলাকার বাসিন্দা।
অভিযান চালিয়ে উল্লেখিত সদস্যুদের কাছ থেকে দেশী-বিদেশী ১৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং সকল প্রকার অস্ত্রের ৬৫০ রাউন্ড তাজা গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। শান্ত বাহিনী পূর্ব সুন্দরবনের বঙ্গপসাগর সংলগ্ন উপক’লবতী অঞ্চলে অতি সক্রিয় একটি সলদস্যু বাহিনী হিসেবে পরিচিত ছিলো। বলেশ্বর নদী সংলগ্ন বিভিন্ন খাল ও শরণখোলা রেঞ্চের কটকা, কচিখালী, নারিকেল বাড়িয়া ও দুধমুখী সংলগ্ন অঞ্চলে তারা বনজীবী ও জলজীবীদের জিম্মি করে লাখ লাখ হাতিয়ে নেয়।
এছাড়া শরণখোলা রেঞ্জের খুনের খাল সংলগ্ন জঙ্গলে অভিযান চালালে র‌্যাবের কাছে আত্মসমর্পন করে দস্যু আলম বাহিনীর চার সদস্য। এসময় বাহিনীর প্রধান সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর থানাধীন মুন্সিগঞ্জের মো. আকবর সরদারের ছেলে মো. আলম সরদার (৩৪), সদস্য মো. হালিম গাজী, মো. আবু বক্কর সিদ্দিক ও আসাদুজ্জামানকে আটক করে। পরে তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী জঙ্গলে অভিযান চালিয়ে ৭টি দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৩৫৮ রাউন্ড গুলি তাঁজা গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
দুটি অভিযানে উদ্ধার হওয়া মোট আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ৯টি বিদেশী একনালা বন্ধুক, ২টি বিদেশী দোনালা বন্দুক, ৫টি পয়েন্ট টুটু বোর বিদেশী এয়ার রাইফেল, ২টি ওয়ান শুটার গান, ২টি কাটা রাইফেলসহ মোট ২০টি দেশী বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র এবং এক হাজার ৮ রাউন্ড তাজা গোলাবারুদ।
আলম বাহিনীর সৃষ্টি কুখ্যাত জলদস্যু মজনু বাহিনীর মাধ্যমে। এই বাহিনী সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় বহু ডাকাতির ঘটনা ঘটিয়েছে। চলতি বছরের ১৪ জুলাই মজনু বাহিনী অস্ত্র সহ র‌্যাবের কাছে আত্মসমর্পন করায় আলম বাহিনীও তার সদস্যদের নিয়ে আত্মসমর্পনে উৎসাহী হয়।
এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার সুন্দরবনের কুখ্যাত দুই জলদস্যু বাহিনীর আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল-এমপি। প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি বলেন, র‌্যাব দেশের অপরাধ দমনে একের পর এক সফলতা দেখিয়ে বিশ্বের কাছে আস্থা এবং বিশ্বাস অর্জন করে নিয়েছে। তাই র‌্যাবকে আরো শক্তিশালী করে গড়ে তোলার জন্য সরকার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। শুধু র‌্যাবই নয়, বাংলাদেশের অন্যান্য বাহিনী পুলিশ, কোষ্টগার্ড, নৌবাহিনী সহ দেশের সকল নিরাপত্তা ও শান্তি রক্ষা বাহিনীকে শক্তিশালী এবং দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আমরা যা করার প্রয়োজন করবো।
তিনি বলেন, নৌপথে অপরাধীদের পিছু ছুটতে র‌্যাব এবং কোষ্টগার্ডের আরো দ্রুত গতির জলযান দরকার। আর তাই খুব শিঘ্রই কোষ্টগার্ডের জন্য চারটি ফাষ্ট এ্যাট্যাক বোর্ড সরবরাহ করছি। যার মধ্যে দুটি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এবং বাকি দুটি আগামী জানুয়ারীতেই সরবরাহ হবে।
স্বারাষ্টমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল আরো বলেন, জলদস্যুদের আত্মসমর্পন প্রমান করে যে দেশ শান্তির পথেই এগোচ্ছে। যেসব জলদস্যুরা আত্মসমর্পন করেছে তাদের শাস্তি কমিয়ে আনতে সরকারের কাছে আহ্বান জানানো হবে। আইনের বিধান মেনেই আত্মসমর্পনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। তাছাড়া যারা শান্তির পথে ফিরে এসেছে তাদেরকে সরকারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ভাবে পূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূূনর্বাসন করে দেয়া হবে। তারা যাতে সমাজে ছোট এবং অবহেলার পাত্র না হয়ে থাকে সে জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনকে নজর রাখার আহ্বান জানান তিনি।
মন্ত্রী আরো বলেন, শুধু জলদস্যু এবং ডাকাতরাই নয়। ভুল করে যারা জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন তারাও শান্তির পথে ফিরে আসুন। জননেত্রী শেখ হাসিনার ঘোষনা অনুযায়ী যারা হত্যা এবং ধর্ষনের মত অন্যায় করেননি তাদের ভালো এবং শান্তির পথ ফিরিয়ে দিতে সরকার সহযোগিতা করবে।
জলসদুস্যদের আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন র‌্যাবের মহা-পরিচালক বেনজির আহম্মেদ- পিপিএম বার। তিনি তার বক্তৃতায় বলেন, সামান্য কিছু অস্ত্র নিয়ে র‌্যাবের সঙ্গে মোকাবেলা করার কথা ভাবাটা বোকামির কাজ। কেননা বাংলাদেশের নিরাপত্তা রক্ষি বাহিনীর কাছে যেসব অত্যাধুনিক অস্ত্র রয়েছে তার কাছে ঐসব অস্ত্র কিছুই নয়।
তিনি আরো বলেন, র‌্যাব দক্ষিণাঞ্চলে জলদস্যু-বনদস্যু ডাকাতদের প্রতিহত করতে নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে র‌্যাবকে চ্যালেঞ্জ করতে গিয়ে মারাও পড়েছে বহু জলদস্যু। এখন পর্যন্ত র‌্যাবের অভিযানে সুন্দরবনে ৮৯টি বন্ধুক যুদ্ধে ১৪১ জন ডাকাত নিহত হয়েছে। এছাড়া অভিযান পরিচালিত হয়েছে ১৫৬টি। উদ্ধার করা হয়েছে ৬১২টি বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র এবং ১৬ হাজার রাউন্ড গুলি। এসকল ঘটনায় র‌্যাব বাদী হয়ে মামলা করেছে ১৭২টি।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দেশের মানুষকে শান্তিতে রাখতে চায়। জেলেরা যাতে নির্বিঘেœ সাগরে মাছ ধরতে পারে সে জন্য র‌্যাব তাদের সহযোগিতা করে আসছে। এই অঞ্চলে আমরা কোন জলদস্যুকে অপতৎপরতা চালাতে দেবনা। তাই এখনো যারা আত্মসমর্পন করেননি তারা শান্তির পথে ফিরে আসুন। আত্মসমর্পন করুন। নইলে র‌্যাবের হাত থেকে আপনারা বাঁচতে পারবেন না। কারন র‌্যাব খুবই শাক্তিশালী একটি বাহিনী। র‌্যাবের বুলেট কখনো মিস হয় না। ঘাতকদের বুক বিদ্ধ করবেই।
এদিকে বক্তৃতার পূর্বে সদ্যুরা আনুষ্ঠানিক ভাবে আত্মসমর্পন করেন। এসময় তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এর নিকট আগ্নেয়াস্ত্র তুলে দিয়ে আত্মসমর্পন করেন। একই সঙ্গে তারা শান্তির পথে ফিরে যেতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং র‌্যাবের মহাপরিচালক এর মাধ্যমে সরকারের কাছে অনুরোধ জানান।
আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন র‌্যাব-৮ এর কমান্ডিং অফিসার লে.ক. মো. ইফতেখারুল মাবুদ-পিএসসি। অন্যান্যদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন বরিশাল-২ আসনের সাংসদ এ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস, বরিশাল-৩ আসনের সাংসদ এ্যাডভোকেট শেখ মো. টিপু সুলতান, র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) আনোয়ার লতিফ খান, বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার এস.এম রুহুল আমিন, অতিরিক্ত ডিআইজি আকরাম হোসেন, বরিশাল জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান, জেলার পুলিশ সুপার এসএম আক্তারুজ্জামান, র‌্যাবের লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া উইং এর পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান (ট্যাজ), বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার সায়েদুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আবুল কালাম আজাদ ছাড়াও ডিজিএফআই’র বরিশাল শাখার কর্ণেল জিএস মো. মিজানুর রহমান, কোষ্টগার্ড সহ বিভিন্ন পর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে এর পূর্বে চলতি বছরের ২১ মে ১০ জন সহযোগী নিয়ে র‌্যাবের কাছে আত্মসমর্পন করেছিলো সুন্দরবনের কুখ্যাত জলদস্যু মাষ্টার বাহিনী। এসময় তারা ৫২টি দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র এবং সাড়ে ৪ হাজার রাউন্ড তাঁজা গুলি উদ্ধার করে র‌্যাব-৮। এছাড়া ১৪ জুলাই ১১ জন সদস্য সহ র‌্যাব-৮ এর কাছে আত্মসমর্পন করেছে জলদস্যু মজনু ও ইলিয়াস বাহিনী। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিলো ২৫টি দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র ও এক হাজার ২০ রাউন্ড বিভিন্ন প্রকারের গোলাবারুদ।