সুন্দরবনের কুখ্যাত “ছোট রাজু” বাহিনীর আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চৌকসতায় দেশ নিরাপদে আছে

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ স্বরাস্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের স্থান হবে না। আমাদের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খুবই তৎপর। তাদের নিশানা কখনই ভুল হয় না। যে কারনে ইতিমধ্যেই আমরা দেশের জঙ্গি দমনে সার্থক হয়েছি। যা অন্যান্য দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও এত দ্রুত এবং অল্প সময়ের মধ্যে তা করে দেখাতে পারেনি। আর তাই আমাদের দেশ এবং দেশের মানুষ নিরাপদে থাকতে পারছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার নগরীর রূপাতলীতে র‌্যাব-৮ সদর দপ্তরে সুন্দরবনের ১০তম কুখ্যাত দস্যুবাহিনীর প্রধান ছোট রাজু সহ ১৫ সদর্স’র আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এসব কথা বলেছেন।
র‌্যাব-৮ এর অধিনায়ক লে. কর্ণেল আনোয়ার-উজ-জামান এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দস্যু বাহিনীর আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. কামাল উদ্দিম আহমেদ, র‌্যাব ফোর্সেস এর মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ- পিপিএম, বিপিএম।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, আমরা প্রত্যেকটি মানুষকে মানুষ বলেই মনে করি। সে হোক অপরাধী কিংবা বিপদগামী। তাই আমরা চাইনা আর কোন বিপদগামী মানুষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মারা পড়–ক। আমাদের কাজ দেশ এবং জনগনকে নিরাপদে রাখা। সেটা করতে গিয়ে যে কোন ধরনের চ্যালেঞ্চ মোকাবেলায় আমরা আমাদের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সদা প্রস্তুত রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, জলদস্যু-বনদস্যুদের একজনও এপথে ভালো নেই এবং ছিলেনও না। আমি মনে করি তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে। বিবেকের তাড়নায় তারা আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছে। আমরাও তাদের সম্মান প্রদর্শন করছি। যারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন তাদের পুণর্বাসন সহ সকল প্রকার সহযোগিতার ব্যবস্থা করব। তাই এখনো যারা আত্মসমর্পন করেনি সেইসব জলদস্যু-বনদস্যু সহ কুখ্যাত সন্ত্রাসীদের প্রতি আত্মসমর্পনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, আপনাদের মদদ দাতারাও রেহাই পাবে না আমাদের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাত থেকে। স্বাভাবিক জীবনে না ফিরলে আপনাদের নদী, খাল কিংবা জঙ্গলের মধ্যে পড়ে থাকতে হবে।
তিনি বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য দেশকে নিরাপদ রাখা। জননেত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে আজ বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছি। কিন্তু এর সবকিছুই অর্থহীন হয়ে যাবে, যদি জলদস্যু-বনদস্যু, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি। দেশের মানুষ প্রধানমন্ত্রীর ডাকে এক হয়ে আমাদের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করছেন। জনগনকে সাথে নিয়েই আমরা সব ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড নির্মূল করবো।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি র‌্যাব ফোর্সেস এর প্রধান মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ বলেন, সুন্দরবনে দস্যুবৃত্তি করতে দেয়া হবে না। এটা সাধারন মানুষের রুটি-রুজির স্থান। হাজার হাজার পরিবারের জীবীকা অর্জন হচ্ছে এখান থেকেই।
তিনি বলেন, এ পর্যন্ত আমাদের অভিযানের কারনে কোনঠাসা হয়ে পড়া ১০টি কুখ্যাত জলদুস্যু বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে। তারা সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে অঙ্গিকার করেছে। যারা ফিরে এসেছে তাদেরকে পূণঃরায় খারাপ পথে নেয়ার চেষ্টা করলে তাদের পরিনতি ভালো হবে না। পাশাপাশি সুন্দর বনের নতুন দুই দস্যু বাহিনীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনারাও খারাপের পথ ত্যাগ করুন। স্বাভাবীক জীবনে ফিরে আসুন। নয়তো আপনাদের পরিণতি হবে কঠিন ও ভয়াবহ।
জলদস্যু আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে বরিশাল রেঞ্জ এর ডিআইজি শেখ মো. মারুফ হাসান, বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার এসএম রুহুল আমিন, জেলার পুলিশ সুপার এসএম আক্তারুজ্জামান, র‌্যাব-৮ এর উপ-অধিনায়ক মেজর আদনান কবির সহ কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস সহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে বরিশাল র‌্যাব-৮ এর ধারাবাহিক অভিযানের অংশ হিসেবে গত বুধবার সুন্দরবনের শরনখোলা এবং চাঁদপাই রেঞ্জে র‌্যাবের বিশেষ অভিযানে ১০তম বাহিনী হিসেবে কুখ্যাত জলদস্যু ‘ছোট রাজু’ বাহিনীর প্রধান রাজু তার ১৫ সদস্য নিয়ে আত্মসমর্পন করে। এর পর গতকাল বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিক ভাবে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পন করে ১৫ সদস্যের এই দস্যু বাহিনী।
আত্মসমর্পনকারীরা হলো, ‘ছোট রাজু’ বাহিনীর প্রধান মোঃ রাজু মোল্লা ওরফে ছোট রাজু (৪৮), মনিরুল ইসলাম (৩৫), সিরাজুল ইসলাম গাজী (২৯), আলফাজ হোসেন (২৫), হারুন সরদার (৩৮), বিল্লাল গাজী ওরফে ম্যাজিক বিল্লাল (৩৬), খতিব গাজী (৩৭), মিকাইল গাজী (৩৮), কামরুল সরদার (৩৯), ফরহাদ সরদার (২৬), সালাম গাজী (৩৭), মিলন শেখ (২৫), ফরহাদ গাজী (৩২), সাব্বির শেখ (৪২) ও মনিরুল গাজী মনি (৩৯)। আত্মসমর্পনকৃতরা খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার বাসিন্দা ।
র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে, আত্মসমর্পনকারীদের কাছ থেকে ২১টি দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র এবং সকল প্রকার অস্ত্রের প্রায় এক হাজার ২৩৭ রাউন্ড তাজা গুলি উদ্ধার করা হয়। যার মধ্যে পাঁচটি বিদেশী একনালা বন্দুক, পাঁচটি বিদেশী দোনালা বন্দুক, পাঁচটি পয়েন্ট ২২ বোর বিদেশী এয়ার রাইফেল, দুইটি বিদেশী পয়েন্ট ২২ রাইফেল ও চারটি বিদেশী ওয়ান শ্যুটার।
বিষয়টি নিশ্চিত করে র‌্যাব-৮ এর উপ-অধিনায়ক মেজর আদনান কবির জানান, ‘ছোট রাজু’ বাহিনী সুন্দরবনের মংলা, হাড়বাড়িয়া, ভদ্রা এবং বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন উপকূলবর্তী অঞ্চলে সর্বাপেক্ষা সক্রিয় একটি জলদস্যু বাহিনী। পশুর নদী সংলগ্ন বিভিন্ন খাল ও চাঁদপাই রেঞ্জের ভদ্রা, মরাপশুর ও জুমরা সংলগ্ন অঞ্চলের বনজীবি ও জলজীবি সাধারণ মানুষ তাদের টার্গেট ছিলো। বিভিন্ন জলদস্যু ও ডাকাত বাহিনী র‌্যাব এর হাতে নিস্ক্রিয় হওয়ার পাশাপাশি র‌্যাব-৮ এর ক্রমাগত একাধিক কঠোর অভিযানের কারণে ছোট রাজু বাহিনী কোনঠাসা হয়ে আতংকিত হয়ে পরে। তারা অনুধাবন করে অধিক অর্থ উপার্জন ও কু-প্ররোচনার স্বীকার হয়ে তারা ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে। ২০১২ সাল থেকে ‘ছোট রাজু’ সুন্দরবনে জলদস্যুবৃত্তি করে আসছে।
উল্লেখ্য, র‌্যাবের কঠোর তৎপরতার কারণে ২০১৬ সালের ৩১ মে সুন্দরবনের কুখ্যাত জলদস্যু “মাস্টার বাহিনীর” ১০জন জলদস্যু ৫২টি দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র এবং প্রায় ৩ হাজার ৯০৪ রাউন্ড গোলাবারুদ এবং একই বছরের ১৪ জুলাই কুখ্যাত জলদস্যু “মজনু ও ইলিয়াস বাহিনীর” ১১জন জলদস্যু ২৫টি দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র এবং ১ হাজার ২০ রাউন্ড বিভিন্ন প্রকার গোলাবারুদসহ র‌্যাব-৮ এর কাছে আত্মসমর্পন করেন। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বর “আলম ও শান্ত বাহিনী” ১৪জন সদস্য ২০টি দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র এবং এক হাজার ৮ রাউন্ড বিভিন্ন প্রকার গোলাবারুদসহ এবং ১৯ অক্টোবর “সাগর বাহিনীর” ১৩জন সদস্য ২০টি দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৫৯৬ রাউন্ড বিভিন্ন প্রকার গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করেন। এরপর ২৭ নভেম্বর “খোকাবাবু বাহিনীর” ১২জন সদস্য ২২টি দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র এবং এক হাজার তিন রাউন্ড বিভিন্ন প্রকার গোলাবারুদসহ এবং চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি ২৫টি দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র ও সকল প্রকার অস্ত্রের প্রায় এক হাজার ১০৫ রাউন্ড বিভিন্ন প্রকার গোলাবারুদসহ “নোয়া বাহিনীর” ১২ সদস্য র‌্যাব-৮ এর কাছে আত্মসমর্পন করেছেন। চলতি বছরর ২৯ জানুয়ারী ৩১টি দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র এবং সকল প্রকার অস্ত্রের প্রায় এক হাজার ৫০৭ রাউন্ড বিভিন্ন প্রকার গোলাবারুদসহ ‘জাহাঙ্গীর বাহিনীর’ ২০সদস্য র‌্যাবের কাছে আত্মসমর্পন করেছে। বিগত ১০মাসে মোট নয়টি বাহিনীর ৯২ জন জলদস্যু ১৯৫টি অস্ত্র ও ১০ হাজার ১৪৩ রাউন্ড গোলাবারুদসহ র‌্যাব-৮ এর কাছে আত্মসমর্পন করেন।