সীমাহীন ভোগান্তিতে দক্ষিণের ক্যান্সার রোগীরা

রুবেল খান ॥ দক্ষিণাঞ্চলের ক্যান্সার রোগীদের শেষ ভরসা শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালের কোবাল সিক্সটি মেশিনটি। প্রতিদিন গড়ে ১৫/২০ জন ক্যান্সার রোগীকে থেরাপী দেয়া হতো যন্ত্রটির মাধ্যমে।
কিন্তু গত প্রায় ৯ মাস যাবত বিকল অবস্থায় পড়ে আছে অত্যাধুনিক এবং ব্যয়বহুল এই যন্ত্রটি। বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলে এই মেশিনের নেই কোন বিকল্প ব্যবস্থা। ফলে রোগীদের ক্যান্সার থেরাপীর জন্য ছুটতে হচ্ছে রাজধানীতে। এতে যেমন অর্থের গচ্ছা দিতে হচ্ছে তেমনি সীমাহীন ভোগান্তির শিকারও হচ্ছেন রোগীরা।
এদিকে দীর্ঘ প্রায় ২১ বছর পূর্বে সরবরাহকৃত কোবাল সিক্সটি মেশিনটির মেয়াদ কাল শেষ হয়ে যাওয়ায় এটিকে আর সচল করে তোলা সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি। তাই সেন্ট্রাল মেডিকেল হাসপাতাল ঢাকা (সিএমএইচডি) থেকে শেবাচিম হাসপাতালে নতুন একটি কোবাল সিক্সটি মেশিন প্রদানের আশ্বাস দেয়া হয়েছে।
তবে কবে নাগাদ এই মেশিনটি পাওয়া যাবে সে বিষয়ে নিশ্চিত না হলেও ক্যান্সার রোগীদের জন্য শেবাচিম হাসপাতালে নতুন সংযোজন হচ্ছে ব্রাকী থেরাপী নামক অপর একটি আধুনিক যন্ত্র। এটি স্থাপনের জন্য স্থান নির্ধারনও হয়ে গেছে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই মেশিনটি বরিশালে এসে পৌঁছাবে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক ডা. এসএম সিরাজুল ইসলাম।
এই মেশিনটির মাধ্যমে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের দুর্ভোগ অনেকাংশে লাঘব হবে বলেও আশাবাদী তিনি। শেবাচিম হাসপাতালের স্টোর শাখা সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ যাবত আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। আইসিইউ সেবা, হার্টে রিং স্থাপন, বার্ণ ইউনিট সহ বিভিন্ন সেবা চালু হয়েছে হাসপাতালটিতে। তবে অবহেলিত রয়ে গেছে হাসপাতালের ক্যান্সার বিভাগ।
বরিশাল অঞ্চলে অসংখ্য ক্যান্সার রোগী থাকলেও এদের জন্য নেই পর্যন্ত চিকিৎসক এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা। একজন সহযোগী অধ্যাপক এবং একজন রেডিওথেরাপিষ্ট ছাড়া ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য নেই স্বতন্ত্র ওয়ার্ড। তাছাড়া রোগীদের চিকিৎসার জন্য কোবাল সিক্সটি নামক একটি যন্ত্র থাকলেও তা বিকল হয়ে পড়ে আছে গত ৯ মাস ধরে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ১৯৯৫ সনে সিএমএইচডি থেকে সরবরাহ করা হয় কোবাল সিক্সটি নামক ক্যান্সার থেরাপীর এই যন্ত্রটি। হাসপাতালের পূর্ব পাশে পৃথক একটি কক্ষে স্থাপন করা হয় যন্ত্রটি। তবে স্থাপনের ৫ বছর পর অর্থাৎ ২০০০ সালে শুরু হয় মেশিনটির কার্যক্রম। সপ্তাহে পাঁচ দিন করে যন্ত্রটির মাধ্যমে ক্যান্সারের রোগীদের থেরাপী দিয়ে আসছিলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এ মেশিনটির মাধ্যমে ইতিপূর্বে ক্যান্সারে আক্রান্ত বহু মানুষ আরোগ্য লাভ করেছেন। মাঝে মধ্যে মেশিনটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলেও পরবর্তীতে তা জোরাতালি দিয়ে পুনরায় সচল করে তোলা হয়। তবে ব্যবহারের প্রায় ২০ বছরের শেষ দিকে এসে পুরোপুরি ভাবে বিকল হয়ে পড়েছে এই মেশিনটি।
এ বিষয়ে শেবাচিম এর রেডিওথেরাপী বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. তড়িৎ কুমার সমাদ্দার এর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে তাকে কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি। তবে রেডিওথেরাপী বিভাগের রেডিওথেরাপিষ্ট ডা. মহসীন হাওলাদার বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে একমাত্র শেবাচিম হাসপাতালেই রয়েছে ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসার যন্ত্র কোবাল সিক্সটি মেশিন। কিন্তু ২০১৫ সালের ২৯ নভেম্বর মেশিনটি তার কার্য শক্তি হারিয়ে বিকল হয়ে পড়ে। বর্তমানে ক্যান্সার রোগীদের থেরাপী দেয়ার আর কোন ব্যবস্থা নেই এই হাসপাতাল কিংবা বরিশালের কোন প্রাইভেট হাসপাতালেও। কোবাল সিক্সটি যন্ত্রটি থেকে সোর্স (ক্যান্সার নিয়ন্ত্রনে বিশেষ রেডিয়েশন) বের হচ্ছে না। যে কারনে মেশিন চালু হলেও এর কার্যকারী ক্ষমতা ফুরিয়ে গেছে। কোবাল সিক্সটি মেশিন পরিচালনার পদ্ধতি স্বরুপ ৫ বছর অন্তর অন্তর এর সোর্স পাল্টাতে হয়। কিন্তু এই যন্ত্রটি এক নাগারে ২০ বছর চললেও এর সোর্স পরিবর্তন করা হয়নি। যে কারনে মেশিনটি কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।
তিনি বলেন, সপ্তাহের পাঁচ দিন যন্ত্রটির সাহায্যে ক্যান্সারের রোগীদের থেরাপী দেয়া হতো। প্রতিদিন সর্বনিম্ন ৩০ থেকে ৪০ জন রোগী সরকার নির্ধারিত মূল্যে থেরাপী নিতে পারত। এক একজন ক্যান্সারের রোগীকে সর্বনিম্ন এক থেকে দেড় মাস পর্যন্ত থেরাপী দেয়া হতো। এতে করে রোগী অনেকটা আরোগ্য লাভ করতো। বিনিময়ে তার সর্বসাকুল্যে খরচ হতো ৩ হাজার টাকা। কিন্তু বাহিরে কোন বেসরকারী হাসপাতালে এই থেরাপী দিতে সর্বনিম্ন ১০ থেকে ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। অথচ গত প্রায় ৯ মাস যাবত মেশিনটি বিকল অবস্থায় পড়ে থাকায় এর সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের রোগীরা।
ডা. মহসীন হাওলাদার আরো বলেন, ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী আসলে আমরা তাদের সরকারী ভাবে শেবাচিম হাসপাতালে থেরাপী দিতে পারছি না। রোগীদের থেরাপী দেয়ার জন্য ঢাকায় প্রেরন করছি। এতে করে রোগীদের যেমন খরচ কয়েকগুন বেড়ে যাচ্ছে তেমনি ভোগান্তির শিকারও হতে হচ্ছেন তারা। কিন্তু এর পরেও শেবাচিমে মেশিনটির বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারছে না কর্তৃপক্ষ।
তবে তিনি জানিয়েছেন, মেশিনটি বিকল হয়ে পড়ার পরে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার মন্ত্রনালয় এবং মেশিন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়েছেন যন্ত্রটি সচল করে তোলার জন্য। মেশিন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কৌশলীরা এখানে এসে মেশিনটি’র সমস্যা চিহ্নিত করে গেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে এ বিষয়ে আর কোন দিক নির্দেশনা তারা পাননি। তাছাড়া মেশিনটি সচল করে তুললেও এর মাধ্যমে থেরাপী দিলে রোগীদের ক্ষতি হবে। ক্যান্সার থেরাপী তেমন কার্যকর না হওয়ার পাশাপাশী রোগীদের শরীরের ভালো সেল গুলোও নষ্ট হয়ে যাবে। তাই এটা সচল করে তোলার থেকে না করাটাই ভালো।
এ প্রসঙ্গে বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ডা. এস.এম সিরাজুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ বছর পূর্বে সরবরাহকৃত এই মেশিনটি’র কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। একটি বেসরকারী কোম্পানি মেশিনটি সচল করে তোলার জন্য ৪৪ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারন করেছিলেন। কিন্তু সিএমএইচডি কিংবা মন্ত্রনালয় থেকে মেশিনটি মেরামতের অনুমতি মেলেনি। কারন মেশিনটির যে সমস্যা দেখা দিয়েছে তা সারিয়ে তুলে এর মাধ্যমে থেরাপী দিলে রোগীরা আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তিনি বলেন, মন্ত্রনালয় থেকে শেবাচিম হাসপাতালে একটি নতুন কোবাল সিক্সটি মেশিন সরবরাহের জন্য সিএমএইচডিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সিএমএইচডি থেকেও আরেকটি মেশিন সরবরাহের আশ্বাস পেয়েছেন। তবে কবে নাগাদ এই মেশিনটি সরবরাহ করা হবে সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কিছু জানা যায়নি।
তবে দক্ষিণাঞ্চলের ক্যান্সার রোগীদের জন্য প্রায় ৪ কোটি টাকা মূল্যের অপর একটি থেরাপী যন্ত্র শেবাচিম হাসপাতালের রেডিও থেরাপী বিভাগে সংযোজন হতে যাচ্ছে। ব্রাকী থেরাপী নামক এই যন্ত্রনটি হাসপাতালের জন্য বরাদ্দও হয়েছে। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারনে সিএমএইচডি থেকে যন্ত্রটি বরিশালে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। আবহাওয়ার উন্নতি ঘটলেই মেশিনটি সড়ক পথে বরিশালে পৌছবে বলে জানিয়েছেন পরিচালক ডা. এসএম সিরাজুল ইসলাম।
ব্রাকী থেরাপী নামক যন্ত্রের কার্যকারিতা সম্পর্কে রেডিওথেরাপীষ্ট ডা. মহসীন হাওলাদার বলেন, ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসার জন্য এটি একটি অত্যাধুনিক যন্ত্র। মেশিনটি স্থাপনের জন্য একটি স্বতন্ত্র কক্ষ তৈরী করা হয়েছে। তবে কবে নাগাদ মেশিনটি স্থাপন হবে তা জানা নেই।
তিনি বলেন, কোবাল সিক্সটির মাধ্যমে ক্যান্সার রোগীদের দূর থেকে রেডিওথেরাপী দেয়া হয়। আর ব্রাকী থেরাপীকে বলা হয়ে থাকে টেলি থেরাপী পদ্ধতি। এটির মাধ্যমে রোগীর খুব কাছ থেকে থেরাপী দেয়া হয় বিধায় একে টেলি থেরাপী বলা হয়। তাছাড়া টেলি থেরাপী সংযোজন দক্ষিণাঞ্চলের চিকিৎসা সেবার মান আরো বৃদ্ধি করবে বলেও মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।