সাবেক পৌর চেয়ারম্যান গোলাম মাওলার ইন্তেকাল, জানাযায় মানুষের ঢল

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ দুনিয়ার মায়া ছেড়ে চিরতরে বিদায় নিলেন বরিশাল পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান, প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও বিশিষ্ট সমাজ সেবক আলহাজ্ব গোলাম মাওলা। গত বুধবার রাত সোয়া তিনটায় নগরীর আমানতগঞ্জ এলাকায় নিজ বাসভবন ‘আহম্মেদ ভিলায়’ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না নিল্লাহে…রাজেউন)। মৃত্যু কালে তার বয়স হয়েছিলো ৮৫ বছর। তিনি স্ত্রী, আট সন্তান, চার ভাই, দুই বোন ও নাতী নাতনি সহ অসংখ্য গুনগ্রাহী রেখে গেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার গোলাম মাওলার নামাজে জানাযা শেষে নগরীর মুসলিম গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে। এর পূর্বে জানাযা নামাজে দল-মত নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেয়। পরে মরহুমের কফিনে ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিভিন্ন সংগঠন, প্রতিষ্ঠান এবং এলাকার সাধারন মানুষ।
এদিকে আলহাজ্ব গোলাম মাওলার মৃত্যুতে তার পরিবার সহ আশপাশের এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। মরহুমের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান গুলোতে নেয়া হয়েছে শোক কর্মসূচী। এসব প্রতিষ্ঠান গুলোতে শোকের প্রতীক কালো পতাকা এবং কাল ব্যাচ ধারনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হবে মিলাদ ও দোয়া মোনাজাত। এছাড়াও শোক জানিয়ে বিবৃতী দিয়েছেন আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি সহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।
মরহুমের সন্তান রিয়াজুল কবির রিয়াজ জানান, দীর্ঘদিন যাবত তার বাবা আলহাজ্ব গোলাম মাওলা বার্ধক্য জনিত রোগে ভুগছিলেন। ইতোপূর্বে তাকে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন হাসপাতাল এবং ক্লিনিকে উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বুধবার রাত ৩টা ১৫ মিনিটে নিজ বাস ভবনে ইন্তেকাল করেন।
এদিকে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, সমাজ সেবক ও বরিশাল পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান এবং প্রশাসক আলহাজ্ব গোলাম মাওলার মৃত্যুর সংবাদে গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। রাতেই তার আত্মীয় স্বজন, বন্ধু, পাড়া-প্রতিবেশি, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা মরহুমের বাস ভবনে ছুটে যান। সকাল হওয়ার সাথে সাথে মরহুমের বাস ভবনে মৃত্যুর খবর শুনে ছুটে যান বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক ও বরিশাল-২ আসনের সংসদ সদস্য এ্যাড. তালুকদার মো. ইউনুস, জাতীয় পার্টি’র বরিশাল বিভাগের দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক মহসিন উল ইসলাম হাবুল, বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক আফজালুল করিম, বরিশাল সদর উপজেলা চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টু, মাহমুদুল হক খান মামুন, কীর্তনখোলা লঞ্চের মালিক মঞ্জুরুল আহসান ফেরদৌস সহ অসংখ্য নেতা-কর্মীরা।
এদিকে বেলা ১২টার দিকে মরহুমের মরদেহ নিয়ে আসা হয় তার চির চেনা দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করা বরিশালের সাবেক পৌরসভা বর্তমান সিটি কর্পোরেশনে। তৎকালীন পৌরসভার সফল চেয়ারম্যান এবং প্রশাসক আলহাজ্জ গোলাম মাওলার মৃত্যুতে সকাল থেকেই কোরআনখানি অনুষ্ঠিত হয় বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে। পরে লাশ নগর ভবনের সামনে নিয়ে আসা হলে সেখানে তাকে ফুলেল শ্রদ্ধা প্রদান করা হয়। বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আহসান হাবিব কামাল’র পক্ষে সর্ব প্রথম ফুলেল শ্রদ্ধায় সিক্ত করা হয় তাকে। পরে বিসিসি’র সাবেক দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়র আলহাজ্ব আলতাফ মাহমুদ সিকদার, মেয়র পুত্র রুপম, প্যানেল মেয়র মোশারেফ আলী খান বাদশা, শরিফ তাসলিমা কামাল পলি, কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান টিপু, মহিলা কাউন্সিলর কহিনুর বেগম, জাহান আরা বেগম, সেলিনা আক্তার, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মতিউর রহমান সহ বিসিসি’র বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। একই সময় মরহুমের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান বরিশাল মেট্রো পলিটন চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এর নেতৃবৃন্দ।
অপরদিকে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মরদেহ পূনরায় নিয়ে যাওয়া হয় তার নিজ বাস ভবনে। পরবর্তীতে বাদ আসর নগরীর আমানতগঞ্জ টিবি হাসপাতাল মাঠে মরহুমের নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। নামাজে জানাযায়, অংশ গ্রহন করেন বরিশাল জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক তালুকদার মো. ইউনিুস-এমপি, জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল আলম, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক সহ-সভাপতি আসাদুজ্জামান খসরু, মহানগর বিএনপি’র নগর যুগ্ম সম্পাদক আনোয়ারুল হক তারিন, মহানগর আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক এ্যাড. আফজালুল করিম, জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক মহসিন উল ইসলাম হাবুল, মহানগর সম্মেলন বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব বশির আহম্মেদ ঝুনু, জেলা আওয়ামীলীগ নেতা সৈয়দ আনিস, বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ্যাড. আনিস উদ্দিন আহম্মেদ শহীদ, সাবেক সম্পাদক এ্যাড. লস্কর নূরুল হক, বরিশাল সদর উপজেলা চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টু, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান শাহনেওয়াজ শাহিন, ছালমা শিপিং কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আহসান ফেরদৌস প্রমুখ।
জানাযা শেষে রাজনৈতিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ মরহুমের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে তার লাশ নিয়ে যাওয়া হয় নগরীর মুসলিম গোরস্থানে। সন্ধ্যার পূর্বে সেখানেই মরহুমের দাফন সম্পন্ন করা হয়।
মরহুম আলহাজ্জ গোলাম মাওলা সংক্ষিপ্ত জীবনীতে জানাগেছে, তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। সুরভী লঞ্চ, শিপিং লাইন্স, পেট্রোল পাম্প, চাঁদ-তারা ময়দা সহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিলেন তিনি। এছাড়া রাজনৈতিক জীবনে তিনি সর্ব প্রথম ছিলেন জাতীয় পার্টির ১৮ দফা বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি। এর পর জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘ বছর। জাতীয় পার্টিতে থাকা কালিন সময় তিনি বরিশাল পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বরিশাল পৌরসভার প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সনে তিনি তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ফুল দিয়ে বিএনপিতে যোগদান করেন। তবে দল পরিবর্তনের পর তিনি রাজনীতি থেকে নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নেন। এর পর থেকে তিনি কোন প্রকার সভা, সমাবেশ বা দলীয় কর্মসূচি অংশ গ্রহন করেননি। বরিশাল ইসলামিয়া কলেজের প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্জ গোলাম মাওলা। এছাড়াও বরিশালের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা এবং নৌ যান মালিক সমিতির নেতৃত্ব দিয়েছেন।