সাত মাস পরে এমভি বাঙালী ঢাকায় ফিরলেও সার্ভে সনদ মেলেনি এখনো

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ সরকারি নিয়ম ভেঙে রাষ্ট্রীয় জাহাজ চলাচল প্রতিষ্ঠানের যাত্রীবাহী নৌযান ‘এমভি বাঙালী’ চট্টগ্রাম থেকে সাগর উপকূল পাড়ি দিয়ে প্রায় ৭ মাস পরে ঢাকায় ফিরলেও সার্ভে সনদের অভাবে এখনো তার বাণিজ্যিক পরিচালনা শুরু হয়নি। দুমাসের মেরামতের জন্য গত অক্টোবরের শেষভাগে বাঙালী’কে নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ওয়েষ্টার্ণ মেরিন শিপ বিল্ডার্স-এর চট্টগ্রাম ডকইয়ার্ডে পাঠানো হলেও প্রায় ৭মাস পরে নৌযানটি সংস্থার কাছে হস্তান্তর শেষে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছে। সেখানে নৌযানটির উপরি কাঠামোর কিছু পরিবর্তন সহ যাত্রী সুবিধা পুনর্বিন্যাস ও ডকিং করে তলা ও খোলের মেরামত করা হয়। তবে খোলের স্থায়িত্বের জন্য মেরিন পেইন্ট-এর কাজটি করা হয়নি।
২০১৪ সালের মার্চে এমভি বাঙালীকে বিআইডব্লিউটিসি’র কাছে হস্তান্তর করেছিল নির্মাণ প্রতিষ্ঠানটি। ঐবছরই ২৯ মার্চ এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। ৯ এপ্রিল নৌযানটি প্রথম বাণিজ্যিকভাবে ঢাকা-বরিশাল নৌপথে চলাচল শুরু করলেও যাত্রী বান্ধব না হওয়ায় তাতে ভ্রমনে আগ্রহ ছিলনা কারো। উপরন্তু অতিমাত্রায় জ্বালানী ব্যয়ের কারণে লোকসানের মাত্রা বৃদ্ধির পরেও ২০১৫-এর নভেম্বর থেকে ঢাকা-বরিশাল রুটটি বন্ধ করে নৌযানটি সপ্তাহে একদিন ঢাকা-বরিশালÑমোড়েলগঞ্জ রুটে পরিচালন শুরু করে লোকসানের মাত্রা আরো বৃদ্ধি করা হয়। এতে প্রতি ট্রিপে লোকসান ৩ লাখ টাকায় উন্নীত হলেও কর্তৃপক্ষ রহস্যজনক কারণে রয়েছে নিরব।
অপরদিকে চুক্তি নির্ধারিত সময়ের প্রায় দেড় বছর পরে গত বছর জুন-এর শেষভাগে এমভি মধুমতি’কে বিআইডব্লিউটিসি’র কাছে হস্তান্তর করা হয়। ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নৌযানটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
তবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের প্রায় ৫৫কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এমভি বাঙালীর মত এমভি মধুমতি’ও ‘লাভজনক বাণিজ্যিক পরিচালন’ সম্ভব নয় বলে মনে করছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআইডব্লিউটিসি’র দায়িত্বশীল মহল। সেক্ষেত্রে এসব নৌযান দীর্ঘ দূরত্বের পরিবর্তে স্বল্প দূরত্বে পরিচালনার পরামর্শ দিয়েছেন একাধীক ওয়াকিবাহল মহল। সাড়ে ৭শ যাত্রী বহনাক্ষম এসব নৌযানে প্রতি ঘন্টায় জ্বালানী ব্যয় প্রায় ২শ লিটার। অপরদিকে সংস্থার হাতে থাকা সাড়ে ৯শ যাত্রী বহনাক্ষম পুনর্বাসনকৃত ৪টি প্যাডেল জাহাজে জ্বালানী ব্যয় ঘন্টায় ১শ লিটারেরও কম। কিন্তু এর পরেও সংস্থাটির কারিগরি ও বাণিজ্য পরিদফতর ‘স্বেতহস্তি’ খ্যাত এসব ব্যয়বহুল নৌযান দূর পাল্লার রুট পরিচালনে অতিমাত্রায় আগ্রহী বলেও অভিযোগ রয়েছে। অথচ সংস্থাটির একাধীক দায়িত্বশীল মহলের মতে এসব নৌযান বসিয়ে রাখলেই লোকসানের ভয় কম। এমনকি নৌযানটি দুটি প্রকল্প নির্দিষ্ট ঢাকা-বরিশাল রুটের পরিবর্তে ঢাকা-মড়েলগঞ্জ রুটে পরিচালনের ফলে প্রতি ট্রিপে গড়ে ৩ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে জানা গেছে।
যাত্রী সুবিধা পুনর্বিন্যাস সহ নানা ত্রুটি দূর করতে দু মাস সময় নির্দিষ্ট করে গত বছর ২৮ অক্টোবর ‘এমভি বাঙালী’কে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, চট্টগ্রামের ওয়েষ্টার্ণ মেরিন শিপ বিল্ডার্স-এর ডকইয়ার্ডে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু নৌযানটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌছানোর একমাস পরে ২৯ নভেম্বর তা ডকিং করা হয়। তলা ও খোলের কিছু সংস্কার কাজ সম্পন্ন করে একমাসের মধ্যে তা পুনরায় কর্ণফুলী নদীতে ভাসানোর কথা থাকলেও সে কাজটি করতে প্রায় ৩ মাস অতিক্রান্ত হয়। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বাঙালীকে আনডক করা হলেও তা ঢাকায় নিয়ে আসতে সময় লেগে যায় আরো ৩ মাস। গত ১৫ মার্চ থেকে সাগর উপকূলে ‘অশান্ত মৌসুম’ শুরু হয়ে যায়। ফলে এসময় কোন অভ্যন্তরীণ নৌযান চট্টগ্রামের কর্ণফুলী মোহনা থেকে সন্দ্বীপ-হাতিয়া চ্যানেল অতিক্রম করে ভাটি মেঘনা পাড়ি দেয়ায় নিষেধাজ্ঞা জারী করে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর। কিন্তু সে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়েই গত ১১মে সাগর উপকূল অতিক্রম করে বাঙালী’কে ঢাকায় আনা হয়। সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধীক কর্মকর্তার মতে ঐ কাজটি ছিল সম্পূর্ণ বেআইনী।
এদিকে নির্মাণ পরবর্তি নানা সংস্কার কাজে ওয়েষ্টার্ন মেরিন আরো প্রায় সোয়া ২ কোটি টাকা দাবী করছে। অপরদিকে ভ্যাট পরিশোধ না করায় গত দু বছরেও সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর এমভি বাঙালী’র সার্ভে সনদ প্রদান করেনি। ফলে সরকারি নৌ বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের এ নৌযানটি ইতোপূর্বে অনেকটা অবৈধভাবেই চলাচল করেছে। অথচ চুক্তি অনুযায়ী সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে সার্ভে সনদ সংগ্রহের দায়িত্ব ছিল নির্মাণ প্রতিষ্ঠানেরই। তবে ইতোমধ্যে একাজে অনেকটাই অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের জরিপ কারক নৌযানটি পরিদর্শন করেছেন। আজ কালের মধ্যেই নৌযানটির মাষ্টার কর্মকর্তা ও ইঞ্জিন কর্মকর্তার সাক্ষাতকার গ্রহণ শেষে সার্ভে সনদ প্রদানের চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে জানা গেছে।
তবে এমভি বাঙালী ও এমভি মধুমতি’র লোকসান হ্রাসে কি ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে সে বিষয়ে বিআইডব্লিউটিসি’র দায়িত্বশীল মহল সুস্পষ্ট কোন কিছু বলতে পারছেন না এখনো। সংস্থাটির জিএম বাণিজ্য এনএসএম সাহাদাত আলী জানিয়েছেন, লোকসান এড়াতে সব বিকল্প ভাবনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের। সে ক্ষেত্রে বর্তমান দীর্ঘ নৌপথ পাড়ি দিয়ে ট্রিপে ৩ লাখ টাকা লোকসানের পরিবর্তে নৌযানটি প্রকল্প নির্ধারিত ঢাকা-বরিশাল নৌপথে পরিচালন-এর বিষয়টিও বিবেচনা করা হতে পারে বলে তিনি আভাস দিয়েছেন তিনি।