সাগর ও নদীতে “গুছ” প্রক্রিয়ায় চলছে জাটকা শিকার ও বিক্রি

রুবেল খান॥ নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সাগর ও নদীতে চলছে জাটকা ইলিশ শিকারের মহোৎসব। এমনকি প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে তা প্রতিনিয়ত পাচার হচ্ছে বরিশালের বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলে। মাঝে মধ্যে প্রশাসন তা জব্দ করলেও তারা খুঁজে পাচ্ছেন না জাটকা ইলিশ শিকার ও পাচার সিন্ডিকেটের সদস্যদের। তবে অভিযোগ উঠেছে মৎস বিভাগ এবং প্রশাসন ম্যানেজ করেই জাটকা শিকার ও পাচার করায় তাদের আটক করা হচ্ছে না।

জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানাগেছে, বর্তমান চলছে ইলিশের প্রজনন মৌসুম। তার মধ্যে আবার সম্প্রতি শুরু হয়েছে ইলিশ সংরক্ষন সপ্তাহ। এজন্য বঙ্গোপসাগর ও নদীর বিশেষ পয়েন্টে একশ কিলোমিটারের মধ্যে ইলিশ শিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিশেষ করে মেঘনা নদীর একশ কিলোমিটারের মধ্যে ইলিশের প্রজনন ঘটে।
এদিকে সরকারী ভাবে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্যেও তা মানা হচ্ছে না। প্রতিনিয়ত মেঘনা নদীর একশ কিলোমিটারের মধ্যেই চলছে মা এবং জাটকা ইলিশ শিকার কার্যক্রম। সরকারের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে নদী পথে নিয়মিত টহল দিচ্ছেন কোষ্ট গার্ড সদস্যরা। নৌ-পুলিশও রয়েছেন চতুর দৃষ্টিতে। মাঝে মধ্যে পাচারের সময় থানা পুলিশ ও কোষ্ট গার্ডের হাতে জব্দ হচ্ছে জাটকা ও জাল। তবে তারা আটক করতে পারছে না সিন্ডিকেট সদস্যদের। সম্প্রতি গৌরনদীতে জাটকা ও চাপিলা মাছের বিশাল চালান আটক করে পুলিশ। এছাড়াও বিভিন্ন সময় নদীতে অভিযান চালিয়ে জাটকা ও চাপিলা সহ জাল জব্দ করেছে কোষ্ট গার্ড সদস্যরা। কিন্তু এর পরেও বন্ধ করতে পারছে না জাটকা ও চাপিলা নিধন। বিশেষ করে পহেলা বৈশাখকে টার্গেট করে সিন্ডিকেটের তৎপরোতা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।
জেলেদের একাধিক সূত্র জানায়, ক্ষমতাসিন দলের ছত্রছায়ায় থেকে একটি মহল সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে জাতীয় সম্পদ ইলিশ শিকার করছে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিকার হচ্ছে চাপিলা মাছ। জেলেদের ভাষ্য মতে শিকার হওয়া চাপিলা আরো দু’মাস সময় পেলে গ্রেড সাইজের ইলিশে রূপান্তরিত হত।
একাধিক সূত্র জানায়, ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় থেকে কিছু দুস্কৃতিকারীরা সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। সাধারন জেলেরা মাছ শিকার না করলেও মৎস্য বিভাগ, কোষ্টগার্ড ও নৌ-পুলিশকে মোটা অংকের উৎকোচ দিয়ে প্রতিনিয়ত সিন্ডিকেট সদস্যরা জাতীয় সম্পদ ধ্বংস করছে। তারা আরো বলেন, মাঝে মধ্যে কোষ্টগার্ড লোক দেখানো অভিযান চালিয়ে জাটকা এবং চাপিলা সহ জেলেদের আটক করছে। অবৈধ ভাবে মাছ শিকারকারী সিন্ডিকেটের সাথে অর্থনৈতিক বুনিবনা না হওয়ায় লোক দেখানো অভিযান চলানো হয় বলে জানিয়েছেন সূত্রগুলো।
জেলেরা জানান, বঙ্গপসাগরের মোহনার পাশাপাশি মেঘনা নদীর বেশ কয়েকটি পয়েন্টে জাটকা শিকার করা হচ্ছে। এর মধ্যে মেহেন্দিগঞ্জ, হিজলা, মুলাদী ও বরিশাল সদর উপজেলার একাংশে গভির রাত পর্যন্ত জাটকা শিকার করা হচ্ছে। ভোর রাতে অবৈধ ভাবে শিকার করা জাটকা সদর উপজেলার তালতলি বাজার, চরমোনাই এবং হিজলার ট্যাক নামক স্থান থেকে সড়ক পথে পাঁচার করা হয়। তবে বিশাল একটি চক্র মেঘনা থেকে মাছ শিকার করে তা নিয়ে যাচ্ছে ভোলায়। এমনকি গভির রাতে অবৈধ ভাবে শিকার করা মাছ বিভিন্ন তেলের ট্যাংকারের মাধ্যমে পাঁচার করা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, এ পর্যন্ত পাচারকালে যেসব মাছ আটক হয়েছে তার বেশির ভাগই জব্দ করেছে থানা পুলিশ এবং কোষ্ট গার্ড। পরে তা হস্তান্তর করেছে মৎস্য বিভাগের কাছে। তবে এর পুরো সফলতাই হাতিয়ে নিচ্ছেন মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা। প্রকৃতপক্ষে ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞার পরে এ পর্যন্ত মৎস বিভাগের চোখে পড়ার মত কোন সফলাতাই দেখা যাচ্ছে না। তবে অবৈধ ভাবে শিকার হওয়া ইলিশ ও পাচারকারীদের আটকের পরে মোটা অংকের উৎকোচ গ্রহনের মাধ্যমে তা ছেড়ে দেয়ার একাধিক নজির রয়েছে মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের। অভিযোগ রয়েছে, নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে যেই সিন্ডিকেটটি জাটকা ও চাপিলা শিকার করছে সেই সিন্ডিকেটের সাথে মৎস অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বেশ ভালো যোগসাজস রয়েছে।
তবে জেলা ও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাদের সাথে বিভিন্ন সময় আলাপকালে তারা নিজেদের সফলতার বিষয়টি ঠিক রেখে বলেন, প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়েই তারা অভিযান চালাচ্ছেন। তবে অবৈধ ভাবে জাটকা শিকারের সাথে কোন সিন্ডিকেট জড়িত রয়েছে কিনা সে সম্পর্কে কিছু জানাতে না পারলেও অসচেতনতার কারনে কিছু সংখ্যক জেলেরা জাটকা শিকার করছে বলে তাদের দাবী।