সাক্ষীদের নিয়ে বাণিজ্য মামলার জট বাড়ছে

ওয়াহিদ রাসেল ॥ মামলার বিচারের জন্য সাক্ষ্য দিতে আসা সাক্ষীদের নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। এই কারনে আদালতের বিচার কাজ বিলম্বিত হচ্ছে। আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসা ব্যক্তিরা অভিযোগ করেছেন, বিচার কাজ প্রভাবিত করতে হয় আইনজীবী নয়তো পুলিশরা তাদের মতো করে ব্যবহারের চেষ্টা করে। এতে রাজী না হলে তাদেরকে হয়রানির শিকার হতে হয়।
সামাজিক দায়বদ্ধতার কারনে নিজের সময় ও অর্থ ব্যয় করে সাক্ষী দিতে এসে জীবনসহ পরিবারকেও হুমকির মধ্যে পড়তে হয়। তবুও অপরাধীরা বা মামলার আসামীদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে এলে সরকারী কৌশলী ও পুলিশ টাকা দাবি করে বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও তাদের মনেরমতো সাক্ষ্য দিতে রাজি না হলে কুট কৌশলে সাক্ষ্য দিতে দেরী করিয়ে দেয়। তাদেরকে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত আদালত পাড়ায় থাকতে বাধ্য করে। এভাবে একাধিকবার যাওয়া আসা করে সাক্ষ্য দেয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে তারা।
যার প্রভাব পড়ছে বিচারকার্যে। বিঘিœত হচ্ছে আদালতের বিচারকার্য। সঠিক সময়ে নিস্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে না মামলাগুলো। যেখানে দ্রুত মামলা নিস্পত্তি করার জন্য বিচারকরা কঠোর পরিশ্রম করে সেখানে সাক্ষ্য গ্রহণ করতে না পারায় দিনের পর দিন মামলার পাহাড় জমছে। বিচারপ্রার্থীদের সাথে সাথে ভোগান্তি বাড়ছে বিচারকদেরও।
সূত্র মতে বরিশালে প্রায় ৫০টি আদালত রয়েছে। আদালতগুলোতে প্রায় ৩০ হাজার মামলা রয়েছে। আদালত সূত্র জানায়, এই মামলাগুলোর মধ্যে প্রায় ৫ হাজারের অধিক মামলা সাক্ষীদের কারনে ঝুলে রয়েছে। ধার্য তারিখে সাক্ষীরা নিজ থেকে বা পুলিশ তাদের হাজির করতে না পারায় পিছিয়ে যাচ্ছে মামলার তারিখ। সাক্ষী দিতে না আসা এই ৫ হাজারের অধিক মামলার মধ্যে কিছু আদালতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মামলা রয়েছে। এর মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে রয়েছে প্রায় দেড় হাজার, জেলা ও দায়রা জজ ১ম অতিরিক্ত আদালতে আছে ৫৪৩টি, ২য় অতিরিক্ত আদালতে রয়েছে দেড় শতাধিক, ৩য় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে ৫০০টি। এছাড়াও সদর সিনিয়র সহকারি জজ আদালতে আছে ৪’শ, বিদ্যুৎ আদালতে ৫৯৩, টিএন্ডটি আদালতে ২৮১টিসহ প্রত্যেক বিচার বিভাগীয় আদালতে এ ধরনের কিছু মামলা রয়েছে। আদালতগুলোর বেঞ্চ সহকারীরা জানায়, মামলায় উল্লেখিত সাক্ষীরা না আসার কারনে সঠিক সময়ে মামলা নিস্পত্তি করা সম্ভব হয় না। সাক্ষীদের উপস্থিত করার জন্য বারবার পুলিশদের বলা হলে এবং সাক্ষী ওয়ারেন্ট দেয়া হলেও তারা সাক্ষী হাজির করতে ব্যার্থ হয়। এছাড়াও বাদীরা মামলা করার পর থেকেই নিজেদের দায়িত্ব শেষ মনে করে। তারা সাক্ষী হাজিরের পিছনে দায়সারা ভাব প্রকাশ করে কোন খোজখবর রাখে না। যার ফলে সাক্ষীরাও উদাসীন ভাব প্রকাশ করে। এ বিষয়ে পুলিশের ব্যার্থতার কারন সম্বন্ধে জানতে চাইলে কিছু পুলিশ কর্মকর্তা জানান, একটি মামলা হওয়ার পর বিচারকার্য পর্যন্ত যেতে প্রায় এক থেকে দেড় বছর বা এর বেশি সময় লাগে। এরপর সাক্ষীর জন্য নেয়া হলে দেখা যায় সাক্ষীরা ঠিকানা বদল করে চলে গেছে। কেউ বা ওই স্থানের বাসিন্দা হলেও বর্তমানে অন্য স্থানে থাকে। আবার যথা সময়ে তাদেরকে পাওয়া যায় না। কেউ কেউ সাক্ষ্য দিতেও অস্বীকৃতি জানায়। এসব বিভিন্ন কারনে সাক্ষ্য দিতে অনেকাংশে হাজির করা সম্ভব হয়না। মামলায় সাক্ষ্য দিতে আসা সাক্ষীরা জানান, মামলায় সাক্ষ্য দিতে আসা হলে এমন “যেন নিজের খেয়ে বনের মহিষ তাড়ানো”। এই বনের মহিষ তাড়াতে এসে নানা রকম বিপদের সম্মুখীন হতে হয় তাদের। মামলার আসামীরা বিভিন্ন সময় তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করে। এমনকি মামলার তদন্তে আসা পুলিশ অনেক সময় তাদেরকে আসামীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য না দেয়ার জন্য হুমকি দেয়। তাদের কোন নিরাপত্তা নেই। এরপরও যদি সাক্ষ্য দিতে আসে তাদের কাছে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য টাকা দাবী করেও বলে অভিযোগ রয়েছে। টাকা না দিলে তারা সাক্ষ্য নেয় না। এছাড়াও সাক্ষ্য যদি তাদের মনঃপূত না হয় তাহলে সাক্ষীদের মারধরের হুমকি দেয়া হয়। এসব কারন উল্লেখ করে তারা সাক্ষ্য দিতে আসতে অনীহা প্রকাশ করে। এ প্রসঙ্গে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এ্যাডঃ গিয়াস উদ্দিন কাবুল জানান, মামলা করার পর বাদীর উদাসীনতার কারনে অনেক সময় সাক্ষী হাজির হয় না। আসামী পক্ষের প্রভাব বিস্তার ও নিরাপত্তার কারনে তাদের আদালতে হাজির হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। এছাড়াও অনেক আদালতের বিচারক না থাকার কারনে যে বিচারকরা উপস্থিত আছে তাদের উপর অতিরিক্ত দায়িত্ব থাকে। যার ফলে তারাও ঠিকভাবে সাক্ষ্য নিতে পারে না। পুলিশের ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, সাক্ষী হাজির করার দায়িত্ব থাকে পুলিশের উপর। কিন্তু তারা সেই কাজটা করতে ব্যর্থ হয়। এ সময় আইনজীবীদের সাক্ষ্য নিতে টাকা চাওয়া ও হুমকির সম্বন্ধে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, এমন কোন অভিযোগ এখনও তার কাছে আসেনি। তবে এমন কোন ঘটনার অভিযোগ যদি তার কাছে আসে তারা অবশ্যই তদন্ত করবেন এবং তদন্তে প্রমাণ হলে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এছাড়া অনেক সময় সাক্ষীরা আসামী পক্ষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসে। এ সময় সাক্ষ্য নিলে মামলার বা রাষ্ট্র পক্ষের ক্ষতি হতে পারে। এ কারনে অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষী নেয়া হয় না। তবে বর্তমানে সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে আসছে বলেও জানান তিনি।